একজন শারমীন এবং উদ্বেগের নানা মাত্রা by ড. নিয়াজ আহম্মেদ
বখাটের দ্বারা বরিশালের আগৈলঝাড়ার স্কুলশিক্ষিকা শারমীন জাহানের নির্মমভাবে খুন হওয়ার ঘটনা পত্রপত্রিকায় ফলাও করে প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত নির্মম এবং অন্যান্য ঘটনার মতো এর কারণগুলোও প্রায় একই ধরনের। প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললেই এ ধরনের ঘটনা আমাদের চোখে পড়ে। প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, কারণ ও ফলাফলও প্রায় একই ধরনের। একটি ঘটনার সঙ্গে অন্যটির অমিল খুব কমই খুঁজে পাওয়া যায়। শুধু ঘটনার প্রেক্ষাপট, কারণ ও ফলাফলই নয়; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও প্রায় একই ধরনের।
তবে ফতোয়ার ঘটনার সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার একটি বিষয়ে অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। তা হলো ফতোয়ার ক্ষেত্রে বেশি মাত্রায় যুক্ত থাকে ধর্মান্ধ, মৌলবাদী ও মাদ্রাসাশিক্ষক আর উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বড় মাত্রার সংশ্লিষ্টতা লক্ষ করা যায়। প্রতিটি ঘটনার কমবেশি পরিসমাপ্তি ঘটে হত্যার মাধ্যমে। ঘটনার শুরু ও শেষের মধ্যে একটি সময় অতিবাহিত হয়। উত্ত্যক্ত করার প্রথম দিনই হত্যা করা হয় না। মোটামুটি একটি সময় অতিবাহিত হয়। এ সময়টা ভুক্তভোগীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের। প্রতিকারের জন্য তাদের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াতে হয়। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা সবাই কমবেশি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর সুবিধাও বেশি_রাতারাতি যেমন অর্থবিত্তের মালিক হওয়া যায়, তেমনি প্রচণ্ড শক্তি ও সামর্থ্য নিয়ে বীরদর্পে চলাফেরা করা যায়। নিজের ব্যক্তিগত সাহস অনেক বেড়ে যায়। অনেকটা ধরাকে সরাজ্ঞান না করার মতো অবস্থা। নিজের কাছে প্রতিদিন বিভিন্ন কাজ নিয়ে মানুষ আসে_তাতে আনন্দ অনুভব করাটাই স্বাভাবিক। মজার বিষয় হলো, আমরা ছোটখাটো বিষয়ের ক্ষেত্রেও রাজনীতি ভুলে থাকতে পারি না। আপনি কার কাছে যাবেন? কে প্রভাবশালী? স্থানীয় সরকার, নাকি গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা, নাকি পুলিশ ও প্রশাসন, নাকি রাজনৈতিক ব্যক্তিরা? এদের মধ্যে পাল্লা ভারী স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের। মানুষ তাঁদেরই বেশি দ্বারস্থ হয়। কেননা তাঁরা সব কিছু না হলেও অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এমনকি অন্যদেরও অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করেন। রাষ্ট্রযন্ত্রটিও ঠিক এমন। আমরা এ থেকে বের হয়ে আসতে পারছি না।
প্রতিটি ঘটনার কারণ প্রায় একই ধরনের। গ্রামের উঠতি বয়সের ছেলে হয়তো বখাটে; কাজ নেই, আছে আর্থিক প্রণোদনা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা। আমি যদিও এদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে বেশি মাত্রায় উল্লেখ করছি, কিন্তু এর অন্য আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনীতির একটি গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। কাজটি করা প্রচণ্ড সাহসের। আর সাহসটা রাজনীতি ও অর্থবিত্ত থেকে উৎপন্ন হয়। কখনো কখনো পারিপাশ্বর্িক অবস্থা উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গ্রামের নিভৃত পল্লী কিংবা কম বসতিপূর্ণ এলাকা উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। এ ধরনের ঘটনার ফলাফল গতানুগতিক এবং একই রকম। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমনটি পাওয়া দুষ্কর। বরং অনেক ক্ষেত্রে উত্ত্যক্ততার শিকার পরিবারের হয় নিদারুণ পরিণতি। মামলা তুলে নেওয়া অথবা হুমকি প্রদান এবং হয়রানিও করা হয়। এমনকি এর চেয়ে করুণ পরিণতিও অনেককে বরণ করতে হয়। বারবার অপরাধ করে মানুষ যখন উপযুক্ত শাস্তি পায় না, তখন সে আরো বেশি বেশি অপরাধ করতে শুরু করে, যা অন্যকেও অপরাধ করতে উৎসাহী করে। পরিসংখ্যানে অপরাধের সংখ্যা বড় হতে থাকে। যে ঘটনাটি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, তার নায়ক একজন রাজনৈতিক নেতার আত্মীয় বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হত্যার শিকার একজন শিক্ষিত স্কুলশিক্ষিকা। তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। এটিও হত্যাকারীর ভয়ের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। সাধারণত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকজনকে মানুষ একটু ভিন্ন চোখে দেখে। কিন্তু এখন সময় পাল্টে যাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে উত্ত্যক্তকারীর পরিবার তাদের কাছেই গিয়েছিল, যারা তাদের সাহায্য করতে পারবে বলে মনে হয়েছিল। ঘটনাটির সুরাহাও হয়েছিল। জুতাপেটা করা হয়েছিল উত্ত্যক্তকারীকে। এতে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে হত্যার কাজটি সেরে ফেলে।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, এখানে কি কিছুই করার ছিল না? এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু পূর্বসচেতন ছিলাম? আমরা কি আরো কতকগুলো পদক্ষেপ নিতে পারতাম না, যা ওই শিক্ষিকাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারত? অবশ্যই পারতাম। কিন্তু তাও বা কতটুকু কাজে লাগত, সেটা ভাবনার বিষয়। হয়তো আদৌ কোনো কাজ হতো না। কেননা যারা এ ধরনের কাজ করে তারা হিংস্র, জানোয়ার। তাদের কাছ থেকে রক্ষা পাওয়া নিতান্তই কঠিন। ইতিহাস তা-ই বলে। সীমা, পুতুল, মীরাসহ অনেকেই এদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি। রক্ষা পাওয়ার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা আমরা নিতে পারছি কি? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব সহজ নয়। প্রতিটি সরকার প্রয়োজনের ভিত্তিতে নারীদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ ও কল্যাণে বহু আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য সমাজকাঠামো ও উপরিকাঠামোর মধ্যে যে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং এর জন্য বাস্তবভিত্তিক যে পদক্ষেপ দরকার, তা তারা ভুলে যায়। আমাদের যার যার অবস্থা পরিষ্কার করা দরকার নয় কি? রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায় পুলিশ বাহিনীর পরিবর্তে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের থাকা উচিত কি? বিকল্প বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন নয় কি? সর্বোপরি শিশু যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং বড় হয়, সেই পরিবারের দায়িত্ব নয় কি তাদের ভালোভাবে গড়ে তোলা? মা-বাবাও কি দায়িত্ব এড়াতে পারেন? এ বিষয়গুলো আমাদের ভালোভাবে ভাবতে হবে। আমাদের সৌভাগ্য, স্কুলশিক্ষিকার হত্যাকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আমরা জানি না সে তার পাপের শাস্তি পাবে কি না। হয়তো একদিন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে সে মুক্তি পাবে। কিন্তু আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় শাস্তি দাবি করেই যাব। রাজনৈতিক নেতারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত না করে ঘরে না ফেরার বাসনা পোষণ করেন, কিন্তু এ কথা কখনো বলেন না যে সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার-নির্যাতন দূর না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ঘরে ফিরে যাবেন না। এ কথা বললে আমরা হয়তো স্বস্তি পেতাম; রক্ষা পেতেন শারমীন জাহানের মতো স্কুলশিক্ষিকারা।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিটি ঘটনার কারণ প্রায় একই ধরনের। গ্রামের উঠতি বয়সের ছেলে হয়তো বখাটে; কাজ নেই, আছে আর্থিক প্রণোদনা এবং রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা। আমি যদিও এদের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাকে বেশি মাত্রায় উল্লেখ করছি, কিন্তু এর অন্য আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে পুরো প্রক্রিয়ায় রাজনীতির একটি গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়। কাজটি করা প্রচণ্ড সাহসের। আর সাহসটা রাজনীতি ও অর্থবিত্ত থেকে উৎপন্ন হয়। কখনো কখনো পারিপাশ্বর্িক অবস্থা উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। গ্রামের নিভৃত পল্লী কিংবা কম বসতিপূর্ণ এলাকা উত্ত্যক্ত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। এ ধরনের ঘটনার ফলাফল গতানুগতিক এবং একই রকম। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়েছে এমনটি পাওয়া দুষ্কর। বরং অনেক ক্ষেত্রে উত্ত্যক্ততার শিকার পরিবারের হয় নিদারুণ পরিণতি। মামলা তুলে নেওয়া অথবা হুমকি প্রদান এবং হয়রানিও করা হয়। এমনকি এর চেয়ে করুণ পরিণতিও অনেককে বরণ করতে হয়। বারবার অপরাধ করে মানুষ যখন উপযুক্ত শাস্তি পায় না, তখন সে আরো বেশি বেশি অপরাধ করতে শুরু করে, যা অন্যকেও অপরাধ করতে উৎসাহী করে। পরিসংখ্যানে অপরাধের সংখ্যা বড় হতে থাকে। যে ঘটনাটি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি, তার নায়ক একজন রাজনৈতিক নেতার আত্মীয় বলে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। হত্যার শিকার একজন শিক্ষিত স্কুলশিক্ষিকা। তাঁর স্বামী সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। এটিও হত্যাকারীর ভয়ের কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। সাধারণত পুলিশ ও সেনাবাহিনীর লোকজনকে মানুষ একটু ভিন্ন চোখে দেখে। কিন্তু এখন সময় পাল্টে যাচ্ছে। নিরুপায় হয়ে উত্ত্যক্তকারীর পরিবার তাদের কাছেই গিয়েছিল, যারা তাদের সাহায্য করতে পারবে বলে মনে হয়েছিল। ঘটনাটির সুরাহাও হয়েছিল। জুতাপেটা করা হয়েছিল উত্ত্যক্তকারীকে। এতে সে আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অপমানের প্রতিশোধ হিসেবে হত্যার কাজটি সেরে ফেলে।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, এখানে কি কিছুই করার ছিল না? এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা কতটুকু পূর্বসচেতন ছিলাম? আমরা কি আরো কতকগুলো পদক্ষেপ নিতে পারতাম না, যা ওই শিক্ষিকাকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারত? অবশ্যই পারতাম। কিন্তু তাও বা কতটুকু কাজে লাগত, সেটা ভাবনার বিষয়। হয়তো আদৌ কোনো কাজ হতো না। কেননা যারা এ ধরনের কাজ করে তারা হিংস্র, জানোয়ার। তাদের কাছ থেকে রক্ষা পাওয়া নিতান্তই কঠিন। ইতিহাস তা-ই বলে। সীমা, পুতুল, মীরাসহ অনেকেই এদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি। রক্ষা পাওয়ার জন্য যে ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, তা আমরা নিতে পারছি কি? প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব সহজ নয়। প্রতিটি সরকার প্রয়োজনের ভিত্তিতে নারীদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ ও কল্যাণে বহু আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু তা বাস্তবায়নের জন্য সমাজকাঠামো ও উপরিকাঠামোর মধ্যে যে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন এবং এর জন্য বাস্তবভিত্তিক যে পদক্ষেপ দরকার, তা তারা ভুলে যায়। আমাদের যার যার অবস্থা পরিষ্কার করা দরকার নয় কি? রাষ্ট্রের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায় পুলিশ বাহিনীর পরিবর্তে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের থাকা উচিত কি? বিকল্প বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন নয় কি? সর্বোপরি শিশু যে পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এবং বড় হয়, সেই পরিবারের দায়িত্ব নয় কি তাদের ভালোভাবে গড়ে তোলা? মা-বাবাও কি দায়িত্ব এড়াতে পারেন? এ বিষয়গুলো আমাদের ভালোভাবে ভাবতে হবে। আমাদের সৌভাগ্য, স্কুলশিক্ষিকার হত্যাকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আমরা জানি না সে তার পাপের শাস্তি পাবে কি না। হয়তো একদিন আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে সে মুক্তি পাবে। কিন্তু আমরা তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনায় শাস্তি দাবি করেই যাব। রাজনৈতিক নেতারা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত না করে ঘরে না ফেরার বাসনা পোষণ করেন, কিন্তু এ কথা কখনো বলেন না যে সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার-নির্যাতন দূর না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ঘরে ফিরে যাবেন না। এ কথা বললে আমরা হয়তো স্বস্তি পেতাম; রক্ষা পেতেন শারমীন জাহানের মতো স্কুলশিক্ষিকারা।
লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
No comments