আপন শক্তিতেই অবাঞ্ছিত ঘটনার মোকাবিলা সম্ভব by আহমদ রফিক

কুশ শতকের আধুনিকতার মধ্যেও এ পৃথিবীটা বড় অমানবিক থেকে গেল। এক মিসরীয় প্রহরী খুনের অপরাধে আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ। পত্রপত্রিকায় এ বর্বরতার প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু লেখা ছাপা হয়েছে। বেশির ভাগ লেখায় ওই প্রাচীন নীতির উল্লেখ_'চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত ('অ্যান আই ফর অ্যান আই অ্যান্ড অ্যা টুথ ফর অ্যা টুথ'), যা নাকি প্রাচীন ইহুদি ধর্মগ্রন্থে (ওল্ড টেস্টামেন্টে) উলি্লখিত। অর্থাৎ খুনের বদলা খুন। আধুনিক যুগে ইহুদিরা অবশ্য এক খুনের বদলে দশ খুন করে বদলা নিচ্ছে।


ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতি তাদের আচরণে এমন অমানবিকতার প্রকাশ ঘটে চলেছে এবং সেটা দীর্ঘকাল যাবৎ। আসলে এসব ক্ষেত্রে 'অমানবিকতা' শব্দটি আধুনিক সমাজের রীতিনীতি ও মূল্যবোধের পরিপ্রক্ষিতে যথেষ্ট নম্র ও পরিশীলিত প্রকৃতির। বরং 'বর্বরতাই' বোধ হয় এ ক্ষেত্রে সঠিক শব্দ। এ ঘটনাটির অনেক কয়টি মাত্রা। প্রথমত, প্রকাশ্য দিবালোকে অর্থাৎ দিনদুপুরে এ ধরনের শিরশ্ছেদ মধ্যযুগীয় বর্বরতার শামিল, যে সময়টা তখন ধর্মীয় শাসনের। প্রচলিত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সত্য বলাও ছিল মৃত্যুদণ্ডতুল্য অপরাধ। বিজ্ঞানের সত্য প্রকাশ করার অপরাধে বিজ্ঞানী ব্রুনো, মাইকেল সার্ভেটাস প্রমুখের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় আগুনে পুড়িয়ে। যেমন_ফ্রান্সের জোয়ান অব আর্ক। এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে বলা হয় 'মধ্যযুগীয় বর্বরতা' এবং জনসমক্ষে ধারালো তরবারির আঘাতে শিরশ্ছেদ অনুরূপ বর্বরতা হিসেবে বিবেচ্য।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো এক খুনের বদলা হিসেবে আটজনের শিরশ্ছেদ অর্থাৎ এই আট খুন সভ্যযুগে, আধুনিক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের যুগে কতটা গ্রহণযোগ্য। মধ্যযুগীয় রাজতন্ত্রী বিচারেও বোধ হয় এক খুনের জন্য আটজনের গর্দান নেওয়া হতো না। কিন্তু আধুনিক সৌদি রাজতন্ত্রী শাসনে এমনটাই ঘটে চলেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে চলছে।
তার পরও প্রশ্ন থাকে যে কথিত অপরাধীদের পক্ষে নামকাওয়াস্তে আইনজীবী দেওয়া হলেও ঘটনার বিবরণে যতটা জানা যায়, অভিযুক্তদের যথাযথভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সব রকম সুবিধা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া রয়েছে ভাষাগত অসুবিধা ও জটিলতা। বলতে হয় শিরশ্ছেদের রায় হয়েছে একতরফা। এর পরও যা বলার থাকে তা হলো মানবিক পর্যায়ের। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ক্ষমা প্রদর্শনের অনুরোধ খারিজ করে দিয়েছে সর্বোচ্চ সৌদি কর্তৃপক্ষ। বরং বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের মতে, রায় এবং তা কার্যকর করা পদ্ধতিগত দিক থেকে সঠিক হয়েছে। আমরা অবাক হই যে আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর এ বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নিতে পারেনি। বরং তাদের হাবভাবে সৌদি রাষ্ট্রদূতের মনোভাবই প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে হয়। শোনা যাচ্ছে, এ বর্বর শিরশ্ছেদের মিছিলে নাকি আরো পাঁচজনের নাম রয়েছে, যাদের হয়তো একই পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
এখানে আরো একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় প্রশ্নের মতোই আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। আর তা হলো অভিযুক্তরা নিম্নবর্ণ শ্রেণীর মানুষ; অর্থাৎ শ্রমিক হওয়ার কারণে কি সৌদি আভিজাত্যের এতটা নির্বিকার নির্মমতা! এক বা একাধিক আভিজাত্যের ক্ষেত্রে হয়তো এতটা নিষ্ঠুরতা প্রকাশ পেত না। সেখানে ক্ষমার প্রশ্নটাও বিবেচনায় আসত। আইনের নীতিগত দিকটা তখন নমনীয় হতো। যেমন_২০০১ সালে খুন ও গোয়েন্দাগিরির অপরাধে অভিযুক্ত ব্রিটিশ কানাডিয়ান নাগরিক উইলিয়াম স্যাম্পসনকে সদলবলে মুক্তি দেওয়া হয় গুয়ানতানামো বে কারাগারে আটক পাঁচ সৌদি বন্দির মুক্তির বিনিময়ে। এটা কি অনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো নয়? এর মূল কারণ তাদের গাত্রবর্ণ ও নাগরিকত্ব। স্যাম্পসন ঠিকই বলেছেন, 'আমার জন্ম এবং আমার পাসপোর্ট আমাকে রক্ষা করেছে। আমার মুক্তির পরিণাম হলো রাজনৈতিক ফায়দা। এমনকি আমার মুক্তিতে সৌদি বিচারব্যবস্থার দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতির আসল রূপ বেরিয়ে এসেছে' (কালের কণ্ঠ, ১৬-১০-২০১১)। স্যাম্পসন বরং পাল্টা অভিযোগ তোলেন এই বলে যে সৌদি আরবে বিদেশি কর্মী যারা ভুয়া বিচার ও জেলে নির্যাতনের শিকার, তাদের পক্ষে ক্ষমা পাওয়ার আশা একেবারে ভুল। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সোমালিয়া প্রভৃতি দেশ থেকে আসা দরিদ্র কর্মীরা একবার অভিযুক্ত হলে 'কোতল' হওয়া তাদের ভবিতব্য। স্যাম্পসনের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য হয়েছে হতভাগ্য আট বাংলাদেশির ক্ষেত্রে।
এক ঘটনায় আট বাংলাদেশির শিরশ্ছেদ আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে রোমান সভ্যতার বর্বরতম দিকগুলোর কথা_যেখানে অভিজাত শ্রেণী আরাম-আয়েশে বসে পানীয়ে চুমুক দিতে দিতে ষাঁড়ের লড়াই বা বাঘ-মোষের লড়াই নয়, বাছাই করা শক্তিমান দাসদের লড়াই (গ্ল্যাডিয়েটোরিয়াল কম্ব্যাট) উপভোগ করত এবং পরাজিতের শিরশ্ছেদটা তাদের কাছে আরো বিশেষ উপভোগের কারণ হয়ে উঠত। পাঠক এ ক্ষেত্রে মনে করতে পারেন হাওয়ার্ড ফাস্টের দাসবিদ্রোহভিত্তিক উপন্যাস 'স্পার্টাকাসে'র কিছু কাহিনীচিত্র। আধুনিক যুগে পেঁৗছে আমরা জেনেছি বর্বরতার যুগগুলো বিশ্বসভ্যতা অনেক দিন আগেই পেরিয়ে এসেছে। কিন্তু সৌদি রাজতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা ওই বর্বরতার যুগ যে ধরে রেখেছে, তা শুধু সম্প্রতি আট দরিদ্র বাংলাদেশি শ্রমিকের শিরশ্ছেদেই নয়, এর আগেও প্রায় একই ধরনের ঘটনায় তার প্রমাণ মেলে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দেশে দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলে, ব্যক্তি অধিকার ও ন্যায়বিচারের কথা বলে, অগণতান্ত্রিক শাসন উচ্ছেদের কথা বলে; কিন্তু মজার বিষয় হলো তারা মধ্যপ্রাচ্যের মানবতাবিরোধী রাজতন্ত্রী শাসন পরিবর্তনের কথা বলে না। পাথর ছুড়ে মানুষ মারার মতো পাশবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় না। তাদের এ দ্বিমাত্রিক আচরণের কারণ যে গণতন্ত্রকে বলি দিয়েও স্বার্থর্ উদ্ধার, তা বিশ্ববাসীর অজানা নেই। কিন্তু পরাশক্তির স্বৈরাচারী আচরণের বিরুদ্ধে সচেতন মানুষ প্রতিবাদ জানালেও দুর্বল রাষ্ট্রশক্তিগুলোর সাহস নেই কার্যকর প্রতিবাদী ভূমিকা নেওয়ার। কিছুদিন আগে তিউনিসিয়া ও মিসরের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যখন গণজাগরণ শুরু হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র বড় একটা রা কাড়েনি। কিন্তু যেই লিবিয়ায় গাদ্দাফির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়, তখন ইউরো-মার্কিন আধিপত্যবাদী শক্তি ন্যাটোর সামরিক শক্তি নিয়ে গাদ্দাফির বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে লিবিয়ার তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। সে কাজে তারা অনেকটাই সফল। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।
যে স্বৈরশাসন গাদ্দাফির জন্য অপরাধ, একই রকম শাসন সৌদি বাদশাহদের জন্য জায়েজ। সেখানে সুসভ্য আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা অপ্রয়োজনীয়। কারণ সৌদি স্বৈরাচার মার্কিন স্বার্থ তৈলসিক্ত করে রাখছে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পক্ষে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে। কাজেই সৌদি শাসনতন্ত্রের অমানবিকতা ও মানবতাবিরোধী কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনায় ঢেউ তোলে না। যুক্তরাষ্ট্রের একচেটিয়া করপোরেট পুঁজির সমরাস্ত্র বাণিজ্যনির্ভর ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রেরও নিম্ন-আয় মানুষের স্বার্থবিরোধী। নানা কৌশলী ব্যবস্থার উপশমক প্রলেপ সত্ত্বেও সম্প্রতি হঠাৎ করেই খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধনকুবেরবিরোধী যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, সে আগুন ছড়িয়ে গেছে ইউরোপেরও কোনো কোনো শহরে। এর পরিণাম কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা দেখার জন্য শান্তিবাদী মানুষ অপেক্ষায় রয়েছে। তারা আরো দেখতে চাইছে, ইয়েমেন থেকে গণবিদ্রোহ কবে সৌদি রাজপথ দখল করবে। আরো একটি বিষয় যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী চরিত্রের পরিচয় তুলে ধরে। যে জঙ্গি তালেবান শক্তির অনাধুনিক শরিয়া আইনের বিরুদ্ধে ইউরো-মার্কিন গণতন্ত্র সোচ্চার, তাদের কট্টর ধর্মীয় আইনের বিরোধী সৌদি আরবে সেই একই মানবধর্মবিরোধী আইনের সংস্কার বা পরিবর্তনের পক্ষে ইউরো-মার্কিন গণতন্ত্রকে দৃঢ় অবস্থান নিতে দেখা যায় না। এদের শক্ত খুঁটির জোরেই টিকে আছে সৌদি রাজতন্ত্রের মানবতাবিরোধী আইনকানুন, যা কখনো কখনো আদিম বর্বরতার প্রকাশ ঘটায়।
অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল বাংলাদেশ, সৌদি আরবে বিপুল জনশক্তি রপ্তানিনির্ভরতার দায়ে সেখানকার অমানবিক ঘটনারও প্রতিবাদ জানাতে ভয় পায়। জাতীয় স্বার্থেও জোর গলায় কথা বলতে পারে না, বরং চলে পাল্টা তোয়াজ, দিন এসে গেছে বেতসবৃত্তি রাজনীতির অবসান ঘটানোর। দরকার যুক্তিসঙ্গত রাজনৈতিক দৃঢ়তা দেখানো। ভারতের সঙ্গে যদি সৌদি আরবের এমন চুক্তি হতে পারে, সেখানে কর্মরত ভারতীয় নাগরিকদের যেকোনো অপরাধের বিচার ভারতের মাটিতে ভারতীয় আইনে হবে, তাহলে বাংলাদেশ সৌদি আরবের সঙ্গে অনুরূপ চুক্তি করতে পারবে না কেন? আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা ভেবে দেখবেন কি? প্রসঙ্গত, আরো একটি বিষয়ের দিকে আমাদের শাসকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। অভিযোগ উঠছে যে ওই হতভাগ্য, গরিব বাংলাদেশি শ্রমিকদের শিরশ্ছেদ ঠেকাতে বাংলাদেশি দূতাবাস পর্যাপ্ত তৎপরতা দেখাতে পারেনি। এ অভিযোগ সত্য হলে বলতে হয়, ওই হতভাগ্যরা দরিদ্র শ্রমিক বলেই কি তাদের পক্ষে কার্যকর কূটনৈতিক সমর্থন মেলেনি? অথচ ভারত বা পাকিস্তানের ক্ষেত্রে বিষয়টা অন্য রকম হতো। এদিক থেকে স্বদেশিদের রক্ষায় শক্তিমান ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় ইউরো-মার্কিন রাষ্ট্রগুলোকে। ইসরায়েল তো এদিক থেকে সবার সেরা। উদাহরণ, একজন বন্দি ইহুদি সৈনিককে ফিলিস্তিনিদের কবজা থেকে ফিরে পেতে ৪৭৭ ফিলিস্তিনি বন্দিকে ছেড়ে দিতে হয়েছে ইসরায়েলকে। এগুলো অনেক উদাহরণের দু-একটি। আমাদের দূতাবাস সময়মতো তৎপর হয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ করলে হয়তোবা কথিত অপরাধের পুনর্বিচার কিছুটা হলেও ঘটনার পরিণাম পাল্টে দিতে পারত। কিন্তু আমাদের স্বাদেশিকতা অন্যদের দেখেও শেখে না। আবারও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাই এদিকে একটু নজর দিতে, প্রয়োজনে দক্ষ কূটনীতিকদের দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসগুলো ঢেলে সাজাতে।
সবশেষে একটি কথা, তাও রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য উদ্ধৃত করে যে_'শক্তির সঙ্গে শক্তির মোকাবিলা'য় কিছু অর্জন সম্ভব। সে জন্য তোষামুদে রাজনীতি-কূটনীতির পরিবর্তে শপথ নেওয়া দরকার আপন অর্থনৈতিক শক্তি বাড়িয়ে তোলার। ঋণ করে ঘি খাওয়ার বদলে কৃচ্ছ্রসাধনের পথে দরকার আত্মশক্তির বিকাশ ঘটানো, যেমন ব্যক্তিক মানসিকতার ক্ষেত্রে, তেমনি রাষ্ট্রিক-অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। সে জন্য দরকার দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও শাসনব্যবস্থা। ভুলে যেন না যাই যে শক্তিমানও শক্তিকে সমীহ করে চলে। তাই আমাদের নৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তির ভিতটা শক্ত করে গড়ে তুলতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক পরিসরে আমাদের অস্তিত্ব জানান দিতে দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।

লেখক : ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক
কবি ও প্রাবন্ধিক

No comments

Powered by Blogger.