নয়া শতাব্দী by জিনাত রিপা

জাঁকিয়ে পড়া শীতের সন্ধ্যায় উত্তরার 'সুলতানা মহল'-এ চলছিল পরিচালক অম্লান বিশ্বাসের ধারাবাহিক 'চোরকাঁটা'র শুটিং। সদর দরজা পেরোতেই শতাব্দীর দেখা মিলল। ফিসফিস করে কার সঙ্গে যেন কথা বলছেন। কণ্ঠস্বর নিচে থাকার কারণটা গোপনীয়তা নয়, তা বোঝা গেল ভেতরের ঘরে পরিচালকের কণ্ঠে 'অ্যাকশন' শুনে। আরো মিনিট পাঁচেক চলল তাঁর ফিসফিসানি। কথা শেষ করে নিজেই দুই কাপ চা নিয়ে এলেন।


আড্ডা শুরু হলো ধোঁয়া তোলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে। নিজেকে 'সরকারি মাল' দাবি করেন শতাব্দী। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে জন্ম, গ্রিনরোড স্টাফ কোয়ার্টারে বেড়ে ওঠা, ধানমণ্ডি গভর্নমেন্ট বয়েজ স্কুল, তিতুমীর কলেজ হয়ে মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন_সব মিলিয়ে 'সরকারি' তকমাটা গায়ে সেঁটেছেন তিনি। একটু থেমে, 'সরি, বসিয়ে রাখলাম কিছুটা সময়। কী করব বলুন, ছেলেটা নতুন কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। প্রথম কাজে আমাকেই তার চাই।' খানিকটা লাজুক হেসে বললেন শতাব্দী। প্রসঙ্গ ধরেই জানতে চাইলাম, আপনার প্রথম কাজ নুরুল আলম আতিকের 'সাইকেলের ডানা' তো ওই পরিচালকেরও প্রথম কাজ ছিল, তাই না? কণ্ঠে হঠাৎ প্রথম পাওয়ার উচ্ছ্বাস নিয়ে বললেন, 'জানেন, সে এক মজার অভিজ্ঞতা। একে তো প্রথম, তার ওপর ইউনিটের সবাই যে যার জায়গায় নিজের সেরাটা দিতে প্রস্তুত। সালটা ১৯৯৯ কী ২০০০ হবে। কুষ্টিয়ায় টানা ১৪ দিন শুটিং হলো।' প্রথম কাজ বলে কি নিজেকে প্রমাণের তাগিদ ছিল? 'তা নয়। আসলে তখন মাথায় কাজ করেছে, যে সুযোগটা পেয়েছি, একে হাতছাড়া করা যাবে না। আইডেনটিটি ক্রিয়েট করতে হবে। তাই নিজের সবটুকু দিয়ে কাজটা করেছিলাম। ইউনিটের সবাই তাই করেছিল। প্রমাণের কথা বললে বলব, নিজেকে প্রমাণের সময় বরং এখন এসেছে, যখন মানুষ আমাকে চিনতে শুরু করেছে। এখন যদি আমি একটা সাবস্ট্যান্ডার্ড কাজ করি, সেটাই আমার আইডেনটিটির বিপক্ষে চলে যাবে। দর্শক তখন বিভ্রান্ত হয়। নিজেকে প্রমাণের বিষয়টা তাই অহর্নিশ চলতেই থাকে।'
'পারেন নিজেকে ঠিকঠাক প্রমাণ করতে?'
একটু ভেবে বলেন, 'সেটা তো দর্শক ভালো বলতে পারবেন। একটা মজার অভিজ্ঞতা বলি। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে অনিমেষ আইচের টেলিফিল্ম 'বৃহন্নলা'য় মিসির আলী চরিত্রে অভিনয় করলাম, তখন আমার কাছে শুধু ওই ধরনের চরিত্রই আসতে শুরু করল, রহস্য, রোমাঞ্চ, গোয়েন্দা টাইপ চরিত্র। অন্য কেউ হলে হয়তো 'টাইপড' হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় একই ধরনের চরিত্রগুলো এড়িয়ে যেতেন। শঙ্কা আমারও ছিল, তবে আমি এড়িয়ে যাইনি। এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিলাম। একই চরিত্রে কত ধরনের ডাইমেনশন আনা সম্ভব সেটা নিয়ে হোমওয়ার্ক করলাম। কতটা পেরেছি সেটা সামনেই দেখতে পাবেন দর্শক, স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের 'শার্লক হোমস'-এর ছায়া অবলম্বনে আরিফ আহনাফ পরিচালিত দীর্ঘ ধারাবাহিকে। এখানে যেমন গোয়েন্দা চরিত্র আমার, ঠিক তেমনি জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের মূল গল্পে অসীম গোমেজের পরিচালনায় ধারাবাহিক 'রেড লাইন'-এর চরিত্রও তাই। বলা যায়, একই চরিত্রে 'টাইপড' না হয়ে চরিত্র ভাঙার কাজটা শিখতে চাইছি। যদি বলেন, ছকে পড়ে যাচ্ছি, তো আমি বলব, ওই ছক থেকে বেরিয়ে আসার দায়িত্ব আমারই।'
ভিন্ন কিছু চরিত্রের কথা উঠলেই দর্শকের সামনে শতাব্দী ওয়াদুদের চেহারা ওঠে, কেন? "আমার প্রতি দর্শকের ভালোবাসা, আমার নিজের চেষ্টা আর ভাগ্য তো বটেই। মানুষের মনোজগৎ পর্দায় দেখানো ভীষণ কঠিন। ভাগ্যক্রমে তেমন কিছু নাটকের অভিযাত্রায় আমি যুক্ত হতে পেরেছি। হাবিবুর রহমান হাবিবের 'ধনেশ পাখির ঠোঁট' কিংবা অঞ্জন আইচের 'সনাতন বাবু ও তার স্বপ্নের প্রজাপতিগুলো' এমন কিছু নাটক সেখানে ঘটনার চেয়ে মনন প্রাধান্য পেয়েছে। দুটি নাটকে আমার সহশিল্পী জয়া আহসান ও বিদ্যা সিনহা মীমকেও কৃতিত্ব ও কৃতজ্ঞতার ভাগ দিতে চাই।' বললেন শতাব্দী।
জয়ার সঙ্গে আপনার কেমিস্ট্রি তাহলে দারুণই বলতে হয়! 'গেরিলা' চলচ্চিত্রেও আমরা তাই দেখেছি_"সত্যি বলতে, আমাদের দুজনের জার্নিটা অসাধারণ হয়। কেউ কাউকে কাজের জায়গায় ছাড় দিতে প্রস্তুত নই আমরা। আর 'গেরিলা'র অভিজ্ঞতা এককথায় রোমাঞ্চকর। ঘটনা যদি হয় মুক্তিযুদ্ধ আর পরিচালক যদি হন মুক্তিযোদ্ধা তবে আমাদের মূল্যবোধে তা নাড়া দিতে বাধ্য।"
কথা বলতে বলতেই বেরিয়ে পড়েছি আমরা। গাড়ি ধরার আগে শেষ প্রশ্নটা করি, 'আর স্বপ্ন?'
যা পারিনি তা নিয়ে আফসোস না করে যা করছি সেই অভিনয়টা ঠিকঠাক করে যেতে চাই। আমার সাত মাস বয়সী ছেলে শ্রেয়ান যেন বড় হয়ে আমার পরিচয়টা মানুষের মুখে পায়_স্বপ্ন এখন এটাই। শতাব্দীর শেষ কথাগুলোর উত্তাপ পৌষের শীতকে খানিকটা উড়িয়েই দিল যেন!

No comments

Powered by Blogger.