স্বপ্ন বেঁচে থাকুক আজীবন

ব্বইয়ের দশকের গান যাঁরা শোনেন বা শুনতেন তাঁদের কাছে নিয়াজ আহ্মেদ অংশু পরিচিত নাম। গানের ভাষায় কখনো 'সুইসাইড নোট' কিংবা 'নিষিদ্ধ ইতিহাস', প্রচ্ছদের ভাষার 'দুঃখিনী দুঃখ কোরো না' কিংবা 'হৃদয়পুর'_শ্রোতার কাছে কখনো গীতিকার, কখনো অ্যালবাম প্রচ্ছদ শিল্পী। ২০০৪ সালে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হন তিনি। সম্প্রতি অবসর কাটাতে দেশে ফিরেছেন অংশু।


তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় মজেছেন এ সময়ের গীতিকার শাহান কবন্ধ বিকেলের আলো বুড়ো হয়ে সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। ব্যস্ত শাহবাগ। আজিজ মার্কেটের দক্ষিণের বারান্দা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আলাপ। আলাপ নব্বইয়ের দশকের গান নিয়ে। সে সময়ের কাজের পরিবেশ, গানের সঙ্গে অংশুর পরিচয় কিভাবে?
আমি যখন অষ্টম শ্রেণীতে, খোকা চাচা (তৎকালীন ফিডব্যাকের বেজ গিটারিস্ট) আমাকে ফিডব্যাকের 'উল্লাস' অ্যালবামটা দেন। আমি গানগুলো শুনি। আর সেই থেকে গানের জন্য স্বপ্ন বাঁধা। চোখের ভেতর আশা ভারী হতে থাকে, একজন গানের মানুষ হওয়ার। আমি মফস্বলের ছেলে। এলআরবির অ্যালবাম কিনতে অনেক দূর হাঁটতে হতো। সব দোকানে ব্যান্ডের অ্যালবাম রাখত না। অনেক দূর হেঁটে যখন অ্যালবামটা হাতে পেতাম, সে কী আনন্দ! ১৯৯৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হই। তার কিছু দিন পর এক বন্ধুর মাধ্যমে বাচ্চু ভাইয়ের (আইয়ুব বাচ্চু) সঙ্গে পরিচয়। তখন বাচ্চু ভাইয়ের অ্যালবামের কাজ শেষ। বাচ্চু ভাই আমার গান পছন্দ করলেন। বললেন, পরের অ্যালবামে কাজ করবেন। সেই শুরু। এলআরবির 'স্বপ্ন' অ্যালবামে কাজ করলাম, 'ডবল' অ্যালবামে ছয়টা গান লিখলাম। গান বের হলো 'ক্যাপসুল' অ্যালবামে 'সুইসাইড নোট', 'ষোল আনা' প্রভৃতি। 'তুমিহীনা সারাবেলা' অ্যালবামের সব গান আমি লিখলাম। আরো অনেক গান, এভাবে বলতে গেলে মনে আসে না।
আপনার 'দাঁড়ারে' অ্যালবামটি ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল?
হ্যাঁ, 'দাঁড়ারে' আমার লিরিক, টিউন ও কম্পোজিশনের প্রথম অ্যালবাম। তখন মোবাইল ফোন ছিল না। সব শিল্পীর সঙ্গে যোগাযোগ করে অ্যালবামের কাজ করা থেকে শুরু করে রিলিজ হওয়া পর্যন্ত অনেক ঝামেলা হতো। কম্পানি আমাকে দিয়ে এই কঠিন কাজগুলো করাত। 'দাঁড়ারে' অ্যালবামের গানের ভেতর আমি একটু ফোক ধাঁচের কাজ করার চেষ্টা করেছি।
আপনি তো একজন চিত্রশিল্পী। গানের পাশাপাশি সেই সময়ের বিখ্যাত অনেক অ্যালবামের প্রচ্ছদ করেছেন। সে সম্পর্কে কিছু বলুন।
পড়াশোনার দিক দিয়ে ডিজাইনের ওপর আমার দক্ষতা ছিল। জেমসের 'দুঃখিনী দুঃখ করো না', 'দুষ্টু ছেলের দল', বাপ্পা মজুমদারের 'রাতের ট্রেন', 'ধুলোপড়া চিঠি', 'কদিন পরে ছুটি', ফিলিংসের 'নগর বাউল', দলছুটের 'হৃদয়পুর'সহ আরো অনেক অ্যালবামের প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছি। এটা আমার খুব প্রিয় একটি কাজ।
[আলোচনা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। একজন গীতিকার হিসেবে আরো অনেক কিছু জানার ছিল। সেই অনেক কিছু যে কত কিছু, তার সংজ্ঞা ভক্তকুল মাত্র বুঝবে।]
কেন দেশ ছেড়ে, প্রিয় গানগুলো ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায়?
অ্যাডভার্টাইজিংয়ের ওপর পড়তে গিয়েছিলাম। পড়া শেষে দেখলাম, এই বিদ্যা দিয়ে দেশে ফিরে পেশাগত কোনো সাফল্য জুটবে না। তাই থেকে যাওয়া। আর গান তো শখেই লিখতাম। পেশাদার গীতিকার হতে পারিনি। সত্যি কথা বলতে কী, সেই সুযোগ আমাদের দেশে আজও তৈরি হয়নি।
[ঘড়ির কাঁটা ৮টায়। আজিজ মার্কেট বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় বেরিয়ে দুজন একই স্বপ্নের মানুষ পাশাপাশি হেঁটে এগোচ্ছি। আমার চোখে একজন নিয়াজ আহ্মেদ অংশু হওয়ার স্বপ্ন। আর অংশুর চোখে নিজের স্বপ্নগুলো বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন। দুই স্বপ্ন এক হয়ে স্বপ্নগুলা বেঁচে থাকুক। আজীবন।]

No comments

Powered by Blogger.