মিউচুয়াল ফান্ড খাতে এসইসির তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ by সুজয় মহাজন

দেশের শেয়ারবাজারের মিউচুয়াল ফান্ড খাতে স্বচ্ছতা আনতে এ খাতের ওপর নজরদারি ও তদারকি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এর মাধ্যমে এ খাতের বিপুল পরিমাণ অর্থের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে মনে করে এসইসি। ফান্ডের বা তহবিলে টাকার ব্যবহারকে এখন নিয়মিত তদারকির আওতায় আনতে এসইসি এ-সংক্রান্ত একটি নির্দেশনা জারি করেছে।


তাতে বলা হয়েছে, এখন থেকে মিউচুয়াল ফান্ডের সব লেনদেনের তথ্য দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক, ত্রৈমাসিক ও ষাণ্মাসিক ভিত্তিতে এসইসিকে জানাতে হবে। এসব তথ্য জানানোর জন্য কমিশন একটি ছকও নির্ধারণ করে দিয়েছে।
এসইসির নির্ধারিত ছকে লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য জানানোর নির্দেশনা এরই মধ্যে ফান্ড পরিচালনাকারী সব সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। এতে শেয়ারবাজারে ফান্ডের বিনিয়োগের পরিমাণ, বিনিয়োগকৃত শেয়ারের ক্রয়মূল্য, বাজারমূল্য ও ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছে।
কমিশন সূত্র জানায়, সম্প্রতি কমিশন বেশ কয়েকটি মিউচুয়াল ফান্ডের টাকার অপব্যবহার বা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের তথ্য পেয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোধ করতে এসইসি এই উদ্যোগ নিয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা অনুযায়ী, মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ কেবল স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ, প্রাথমিক সিকিউরিটিজ এবং অর্থবাজারে হস্তান্তরযোগ্য সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করা যাবে। এর মধ্যে তহবিলের ৭৫ শতাংশ অর্থ অবশ্যই পুঁজিবাজারের সিকিউরিটিজে বিনিয়োগ করতে হবে। আবার এই ৭৫ শতাংশের অর্ধেক অর্থই বিনিয়োগ করতে হবে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে।
কিন্তু কোনো কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান বিধি ভঙ্গ করে ২৫ ভাগের বেশি অর্থ মুদ্রাবাজারে বিনিয়োগ করেছে—এমন তথ্য-প্রমাণ মিলেছে এসইসির কাছে। অর্থের অপব্যবহারের বেশ কিছু দৃষ্টান্তও একাধিক সূত্রে পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে নিয়মবহির্ভূত সমঝোতার ভিত্তিতে ফান্ডের নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা স্থায়ী আমানত হিসেবে ব্যাংকে জমা রাখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যাংককে দিয়ে একই সম্পদ ব্যবস্থাপকের অন্য কোনো ফান্ডে বিনিয়োগ করানো হচ্ছে। এভাবে মিউচুয়াল ফান্ডের আইপিওতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করছে সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা।
মিউচুয়াল ফান্ডের আইনে অবশ্য এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। আর এই আইনি দুর্বলতার সুযোগে সম্পদ ব্যবস্থাপকেরা সাধারণ বিনিয়োগকারীর অর্থের অব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
যোগাযোগ করা হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও এসইসির সাবেক চেয়ারম্যান মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই খাতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কমিশন তদারকি বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি ঠিকই আছে। কিন্তু তথ্য সংগ্রহ করলেই হবে না, সেসব তথ্য যথাযথ ও নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।’
মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, এই মুহূর্তে মিউচুয়াল ফান্ডের দৈনিক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা বা যাচাই-বাছাই করার মতো জনবল এসইসির রয়েছে কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। যদি সেটি করা না হয়, তাহলে তদারকি বাড়ানোর এই উদ্যোগের সুফল পাওয়া যাবে না।
মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডের বিধিমালায় ব্লক ট্রেড বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর জন্য আলাদা করে কোনো সীমা বেঁধে দেওয়া নেই। কিন্তু সময় এসেছে এ ক্ষেত্রে সীমা আরোপ করার। তা না হলে দেখা যাবে, গুটিকয় ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের হাতেই মিউচুয়াল ফান্ডের বেশির ভাগ টাকা চলে যাবে। সে ক্ষেত্রে প্রতিদিনের লেনদেনে ফান্ডগুলোর অংশগ্রহণও কমে যাবে।
জানতে চাইলে সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠান প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মঈন আল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিউচুয়াল ফান্ড আমাদের দেশে এখনো পর্যন্ত একটি বিকাশমান খাত। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ খাতে কিছুটা স্বচ্ছতা বা দক্ষতার অভাব রয়েছে। এ কারণে কোনো কোনো সম্পদ ব্যবস্থাপক যথাযথভাবে তাদের ভূমিকা পালন করতে পারছে না।’ এই বাস্তবতায় এসইসির উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে ৩৭টি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এসব ফান্ডের বিনিয়োগযোগ্য অর্থের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে বাংলাদেশ ফান্ডসহ আরও কয়েকটি তহবিল রয়েছে, যেগুলো বাজারে তালিকাভুক্ত নয়। এগুলোর বিনিয়োগযোগ্য অর্থসহ এই মুহূর্তে এই খাত প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার একটি শিল্প।

No comments

Powered by Blogger.