চালচিত্র-অমঙ্গলের পদধ্বনি, জামায়াতের রোডমার্চ ছিনতাই by শুভ রহমান

কটা ধুন্ধুমার লড়াই বেধে গেল রোডমার্চকে কেন্দ্র করে জামায়াত-বিএনপি আধিপত্য বিস্তারের। এমনিতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রবিবারের চতুর্থ দফা রোডমার্চ নিয়ে নতুন করে লেখার কিছু ছিল না। দেশের বিভিন্ন দিকে গত অক্টোবর থেকে এর আগে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে তিনটি রোডমার্চ বা লংমার্চ একরকম শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে।


শাসক মহাজোটের বিভিন্ন ব্যর্থতাকে পুঁজি করে অতীতের আওয়ামী কায়দাতেই বিরোধী দলের এসব রোডমার্চ একরকম সরকারি সহায়তার মধ্য দিয়েই অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিবারই রোডমার্চের আগে বিএনপি এর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বাধা দানের পরিণতি ভয়াবহ হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিল। অন্যদিকে সরকারি তরফ থেকে এতে কোনো রকম বাধা না দেওয়ার আশ্বাসই দেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ চট্টগ্রাম অভিমুখে পরিচালিত রোডমার্চটিসহ সব কয়টি মার্চেই সরকার কোনো রকম বিঘ্ন সৃষ্টি করতে যায়নি। সরকারের শীর্ষ পদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পদে সমাসীন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিএনপির রোডমার্চকে 'গাড়িমার্চ' বলে অভিহিত করেন, 'রোডমার্চ না করে সংসদমার্চ করা উচিত' বলে টিপ্পনী কেটে, 'এত গাড়ি কোত্থেকে এলো, গাড়ির নম্বর রাখা হচ্ছে' বলে এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেও বস্তুত যথেষ্ট ধৈর্য ও সহনশীলতার এবং গণতান্ত্রিক মনোভাবেরই পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু তার পরও দেখা গেল, চতুর্থ বা শেষবারে এসে বিএনপি নিজেই তাদের রাজনৈতিক মিত্র ও চারদলীয় জোটসঙ্গী জামায়াত-শিবির ও নিজেদের দলের ভেতরকার প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও ন্যক্কারজনক অসহিষ্ণুতা, হামলা, হানাহানি, জুতা, চেয়ার, ইটপাটকেল ছোড়াছুড়ি, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হাতাহাতি-মারামারির মধ্যে জড়িয়ে গেল। এর জন্য অবশ্যই বিএনপির অন্য কাউকে দোষারোপ করার কোনো উপায় থাকল না। প্রতিটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর সচিত্র প্রতিবেদনই যথেষ্ট প্রাঞ্জলভাবে এই শেষবারের রোডমার্চের অগ্রভাগে আধিপত্য বিস্তার ও কয়েকটি জায়গায় পথসভার মঞ্চ ও মঞ্চের সামনে বসার জায়গা দখল নিয়ে বিএনপির দুই গ্রুপ এবং বিএনপি আর জামায়াত-শিবিরের তুমুল সংঘর্ষ বেধে যাওয়ার দৃশ্য তুলে ধরেছে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে একই সময়ে ফেনীতে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আওয়াল মিন্টুর ওপর অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীদের হামলার খবর তুলে ধরে কোনো কোনো পত্রিকায় এটি ছাত্রলীগের কাজ বলে অভিযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কুমিল্লা, চৌদ্দগ্রাম আর ফেনীতে বিএনপির এই রোডমার্চকে কেন্দ্র করে বিএনপি-বিএনপি এবং বিএনপি-জামায়াত আধিপত্য বিস্তারের লড়াই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে বিশেষ এক তাৎপর্য বহন করে। অনেক বিশ্লেষক এর মধ্যে আগামী দিনের রাজনীতিতে একটা অমঙ্গলের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন।
কেন আধিপত্য বিস্তার
কুমিল্লার পদুয়াবাজার ও চৌদ্দগ্রামে_এই দুই জায়গার পথসভায় বিএনপির দুই গ্রুপের মধ্যে যে সংঘর্ষ হয়েছে, তাকে মূলত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে বিজয়ী মেয়র সাক্কুর নেতৃত্বাধীন গ্রুপের সঙ্গে নমিনেশন-বঞ্চিত বিএনপির জেলা সভাপতি ইয়াছিনের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের সংঘর্ষ বলেই প্রতীয়মান হবে। দলের মধ্যে কোন গ্রুপের শক্তি ও প্রাধান্য বেশি, সম্ভবত তারই মহড়া দিতে গিয়ে দুই গ্রুপ এই সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং এতে দুই জায়গায় একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী মোট ৪৫ জন নেতা-কর্মী আহত হন। এ সংঘর্ষ আগামী দিনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব-বিরোধ তীব্রতর হওয়ারই আভাস দেয়।
অন্যদিকে ফেনীতে বিএনপির এই সর্বশেষ রোডমার্চ উপলক্ষে আয়োজিত পথসভায় মঞ্চ ও মঞ্চের সামনে বসার জায়গা দখল নিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে জামায়াত-শিবিরের আগে থেকে প্রস্তুত হয়ে আসা নেতা-কর্মীরা যে বিএনপির ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হটিয়ে দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যই বিএনপির চেয়ারপারসন ও সভাকে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়েছিল, তা স্পষ্ট। জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীদের হাতে হাতে ছিল আটক যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিসংবলিত ফেস্টুন, ব্যানার। আশপাশের সব এলাকা থেকে জামায়াত-শিবিরের এই নেতা-কর্মীরা পত্রিকায় রিপোর্ট অনুযায়ী, অনেক আগে থেকেই, সম্ভবত ভোররাতেই চিঁড়া-গুড় বেঁধে নিয়ে এসে সভার মাঠ ও মঞ্চ দখল করে বসেন এবং বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা পরে সেখানে এসে অবস্থান নিতে চাইলে তাঁদের ওপর হামলা করে তাঁদের হটিয়ে দিতে চেষ্টা করেন। এতে হাজার হাজার জামায়াত-শিবিরকর্মী, বিএনপি ও ছাত্রদলকর্মী আর পুলিশ দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ইটপাটকেল-জুতা নিক্ষেপ, ফেস্টুন ও লাঠি নিয়ে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। প্রচণ্ড এ সংঘর্ষে পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, দুই শতাধিক আহত হয় এবং অনেককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
আধিপত্য বিস্তারের উপযুক্ত সময়
লক্ষণীয় যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে সময়ে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রসিকিউশনের অভিযোগনামার ওপর ট্রাইব্যুনালের আদেশ দেওয়ার কথা, ঠিক সেই সময়েই ফেনীতে এই শোডাউন করার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নিয়েছে জামায়াত-শিবির। বিএনপির রোডমার্চ ও পথসভাকে তারা পুরোপুরি দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা চালায়। পক্ষান্তরে আগে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতে বিএনপি চেয়ারপারসনসহ বিভিন্ন নেতা-কর্মী অল্পবিস্তর মুখ খুললেও এখন তাকে আর প্রধান ইস্যু করতে চাইছেন না বলেই এবারের রোডমার্চ, পথসভা ও জনসভায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিএনপি মূলত এখন তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিটিকেই সামনে তুলে ধরতে চাইছে এবং এর ভিত্তিতেই আগামী ১২ মার্চের 'চলো চলো ঢাকা চলো' তথা ঢাকা অবরোধ ও মহাসমাবেশের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দিয়েছে। রোডমার্চ শেষে চট্টগ্রামের জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন অতীতের তুলনায় নমনীয় ভাষাতেই সরকারের ব্যর্থতার বেশ কিছু গঠনমূলক সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণ পন্থায়ই ক্ষমতা দখলের অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন। তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচন করলে সরকার ভুল করবে, এমন নমনীয় বক্তব্য দিয়েছেন খালেদা জিয়া। শুধু তা-ই নয়, অতীতে দেশ পরিচালনায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটও ভুল-ত্রুটি করে থাকতে পারে এবং তা থেকে তারা শিক্ষা নেবে বলে ব্যতিক্রমধর্মী এবং আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য রাখতেও খালেদা জিয়া পিছপা হননি। একে বিশ্লেষকরা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড় পরিবর্তন বলেই মূল্যায়ন করছেন। অন্যদিকে সাজানো ব্যাপার বলে দোষারোপ করলেও রাষ্ট্রপতির সংলাপ উদ্যোগেও বিএনপি শামিল হয়ে গঠনমূলক প্রস্তাব রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে বুধবার সংলাপে গেছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই। এরপর সংলাপ সফল হয়েছে বলেও খালেদা জিয়া মন্তব্য করেছেন।
জামায়াত-শিবির মরিয়া
জামায়াত-শিবির এদিকে তাদের বিচারাধীন নেতাদের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হওয়া ও অভিযোগের শুনানির দিন আসন্ন ও অনিবার্য হওয়ার মুখে প্রায় মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং বিএনপির বিশেষ করে, চেয়ারপারসনের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে দলীয় নেতাদের মুক্ত করানোর শেষ চেষ্টায় মেতেছে। তারা বিএনপি তথা চারদলীয় জোটকে এ প্রশ্নে সহিংস রাজনীতির দিকেই ঠেলে দিতে চায়_যা বিএনপি কার্যত প্রত্যাখ্যানই করছে। ইতিমধ্যে বুধবার সকালে ট্রাইব্যুনালে আগের দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী গোলাম আযমকে হাজির করা হলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন এবং তাঁকে জেলে পাঠান।
উল্লেখ্য, এর আগেও রাজধানীর কাকরাইল মোড়ে ও অন্যান্য স্থানে বিএনপির মিছিল এবং সমাবেশকে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা কমান্ডো কায়দায় 'হাইজ্যাক' করে উসকানিমূলকভাবে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধিয়ে বিএনপিকে নিজেদের কব্জায় আনার প্রয়াস পেয়েছে। চট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচনের আগেও ঢাকায় পল্টন ময়দানে একই সময়ে স্বেচ্ছাসেবক লীগের পাল্টা জনসভা করার চেষ্টা করতে গিয়ে জামায়াত রাজনীতিতে সহিংসতার উপাদান ঢুকিয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সহিংস বিরোধ-সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তারপর থেকে বিভিন্ন সময় বিরোধী দলের আহূত হরতাল-বিক্ষোভে প্রধানত জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরাই পুলিশের ভ্যানসহ গাড়ি জ্বালানো ও ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, জামায়াত-শিবিরের এ ধ্বংসাত্মক রাজনীতি আগামী দিনে আটক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের শুনানি ও রায় ঘোষণার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করতে আরো জোরদার হয়ে উঠতে পারে এবং সে জন্য বিএনপি সে ব্যাপারে আগে থেকেই সতর্কতা অবলম্বন করে নিজেদের সংযত ও শান্তিপূর্ণ রাখতে চেষ্টা করছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, জামায়াতের প্ররোচনায় তারা নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির বলয়ের বাইরে যাবে না। বিএনপির এ সময়োপযোগী ও পরিপক্ব রাজনৈতিক বিবেচনা শুধু তার নিজের সংগঠনকেই নয়, সামগ্রিকভাবে দেশের সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারাকেই রক্ষায় সহায়ক হবে।
চট্টগ্রামের জনসভা
জামায়াত-শিবিরের ফাঁদে পা না দিয়ে বিএনপি বরং অনেক বেশি সাংগঠনিক বিস্তার ঘটানোর মাধ্যমে আগামী দিনের আন্দোলনকে ব্যাপকভিত্তিক রূপ দিতে চাইছে বলেই রোডমার্চ শেষে চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ডের জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসনের বক্তৃতা থেকে দেশবাসীর ধারণা জন্মেছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিককালে টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসনের অগ্রণী হয়ে হাত বাড়িয়ে দেওয়া, চট্টগ্রামের জনসভায় প্রতিবেশী ভারতের 'করদরাজ্যে' পরিণত না হয়ে সমমর্যাদার ভিত্তিতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার আহ্বান জানানো, বিভিন্ন দাবি আদায়ে অতীতের ধারায় হরতাল, বিক্ষোভ, সহিংসতার পথ ছেড়ে শান্তিপূর্ণ পথ গ্রহণের সংকল্প_এসব গণতান্ত্রিক আচরণকে দেশবাসী আন্তরিকভাবেই স্বাগত জানাচ্ছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়েই মৌলবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক যুদ্ধাপরাধী অপশক্তি জামায়াত-শিবিরকে যে ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের মাধ্যমেই প্রতিহত করতে হবে_বিএনপির মধ্যে এই নবচেতনার উন্মেষ ঘটছে বলেও দেশের আশাবাদী ও সচেতন গণতান্ত্রিক মহলের বিশ্বাস।

১১.০১.২০১২

No comments

Powered by Blogger.