চরাচর-অকুতোভয় বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেন by তামান্না ইসলাম অলি

ভারতের স্বাধীনতার জন্য যেসব দেশপ্রেমিক জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের নাম অন্তরের অন্তরতম প্রদেশে লিখে রেখো। আর সংগঠনের মধ্যে কোনো বিভেদ এনো না। আমার শেষ বাণী, আদর্শ ও একতা। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে এক সহযোদ্ধাকে জেল থেকে এ কথা লিখেছিলেন তিনি। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও তিনি স্বাধীন ভারতের স্বপ্ন দেখতেন সব সময়। জেলের কড়া পাহারায় নির্জন কুঠরিতে বসেও চালিয়েছেন তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড।


তাঁকে সবাই বলে লড়াকু বিপ্লবী। আমরা চিনি মাস্টারদা নামে। তিনি দেশের সূর্যসন্তান। নামটাও সূর্যের নামে। মাস্টারদা সূর্য সেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা। মাস্টারদার পুরো নাম সূর্য কুমার সেন। ডাকনাম কালু। ১৮৯৪ সালের ২২ মার্চ চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নোয়াপাড়া এলাকায় জন্ম তাঁর। বাবা রাজমণি সেন। মা শশীবালা সেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সূর্য চতুর্থ। তাঁর স্কুলজীবন শুরু হয় রাউজানের দয়াময়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯১২ সালে চট্টগ্রাম নন্দনকানন হরিশ দত্ত ন্যাশনাল স্কুল থেকে এন্ট্রাস পাস করেন।
এফএ-তে ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে। ১৯১৮ সালে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এরপর চট্টগ্রামে ফিরে আচার্য হরিশ দত্তের জাতীয় স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অসহযোগ আন্দোলনের কারণে স্কুলটি বন্ধ করে দেয় ব্রিটিশ সরকার। পরে আইনজীবী অন্নদা চৌধুরীর উমাতারা উচ্চ ইংরেজি স্কুলে অঙ্কের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন সূর্য সেন। ১৯২৩ সালের দিকে সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয় তুমুল ব্রিটিশবিরোধী কর্মকাণ্ড। এর মধ্যে ১৩ ডিসেম্বর টাইগারপাস এলাকায় ট্রেজারির টাকা লুটের ঘটনা অন্যতম। এ ঘটনার দুই সপ্তাহ পর নাগরখানা পাহাড়ের বিপ্লবী আস্তানা থেকে প্রথমবারের মতো অম্বিকা চক্রবর্তীকে নিয়ে আটক হন সূর্য সেন। অবশ্য কিছুদিনের মধ্যে ছাড়া পেয়ে যান। তাঁদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে পুলিশ কমিশনারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বিপ্লবীরা। এ ঘটনা ফাঁস হয়ে গেলে ১৯২৪ সালের ২৫ অক্টোবর কয়েকজন বিপ্লবীকে আটক করে ব্রিটিশ পুলিশ। বারবার পুলিশের চোখে ধুলা দিয়ে অবশেষে দ্বিতীরবারের মতো ধারা পড়েন সূর্য সেন ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর। এ যাত্রায়ও তিনি এক বছরের মধ্যেই ছাড়া পেয়ে যান।
১৯২৯ সালে সূর্য সেন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরে চট্টগ্রামের বিপ্লবী দলগুলোকে একত্র করে আইরিশ বিপ্লবের আদলে বিপ্লবী দলের নাম দেন ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক বাহিনী চট্টগ্রাম শাখা। এই বাহিনীর প্রধান ছিলেন সূর্য সেন। বিপ্লবীদের পুলিশি পাহারা বাড়ানো হয়। ছয়জন বিপ্লবীর জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় ১১ জন গোয়েন্দা এবং ২৪ জন পুলিশ।
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রথমে তাঁকে জেলা গোয়েন্দা সদর দপ্তর, পরে চট্টগ্রাম জেলে নেওয়া হয়। এরপর বিপ্লবীরা সূর্য সেনকে মুক্ত করার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেন। তবে প্রতিবারই তাঁদের পরিকল্পনা ফাঁস হওয়ার কারণে ব্যর্থ হয় সব কিছু। ১৯৩৩ সালের ১৪ আগস্ট এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সূর্য সেনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
তামান্না ইসলাম অলি

No comments

Powered by Blogger.