মাদকের ভয়াবহতা রোধে জনসচেতনতা প্রয়োজন by ডা. মো. ফজলুল হক

মাদক যে একটি আত্মঘাতী সমস্যা এবং ক্যান্সার সমতুল্য, তা সবাইকে স্ব-স্ব স্থান থেকে অনুধাবন করতে হবে। প্রবাদ সংযোজন করা যায়, যেমন হত্যাকারীর চেয়ে হত্যার আদেশদাতা বড় অপরাধী, তেমনি মাদকসেবীর চেয়ে মাদক প্রস্তুতকারক, বিক্রেতা ও সরবরাহকারী অধিক অপরাধী। এ অপরাধের শেষ কোথায়? আমাদের সবাইকে দলমত-নির্বিশেষে এগিয়ে আসতে হবে মাদকের বিরুদ্ধে। ইয়াবা এতই ভয়াবহ যে সমাজ রক্ষার জন্য থাইল্যান্ড সরকার তিন হাজারেরও বেশি ইয়াবা বিক্রেতা ও সেবীকে ক্রসফায়ার দেয়। মালায়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট ড. মাহাথির মোহাম্মদের শাসনামলে মাদক ব্যবসায়ীদের সরাসরি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

বর্তমান বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ লোক মারা যায় ধূমপানজনিত ক্যান্সারে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক 'ড্রাগস ইনফরমেশন'-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ইয়াবা হেরোইনের চেয়ে ভয়াবহ এবং আত্মঘাতী। চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবা সেবনের পর যেকোনো সময় মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে যেতে পারে। যার ফলে স্ট্রোক ও রক্তক্ষরণ হতে পারে এবং হৃৎপিণ্ডের গতি ও রক্তচাপ বাড়বে, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের আগমন-নির্গমন হওয়ার কারণে ফুসফুস কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলবে। আর এর ধারাবাহিকতা চলতে থাকলে মৃত্যু অবধারিত। মাদকাসক্তির প্রাথমিক উপসর্গগুলো হচ্ছে বেলা করে ঘুম থেকে ওঠা, চড়া মেজাজ, টাকা চেয়ে না পেয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর করা, অধিক রাত জাগা এবং ক্ষুধামান্দ্য ইত্যাদি। পরবর্তী সময়ে কিডনি, লিভার ও ফুসফুস বিকল হয়ে ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে সরকার। ফলে মাদকদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং মাদকের ব্যবহার কমবে। এটি বলা যাবে না, তবে মাদকের টাকা সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং খুনের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। শুধু এটিই যথেষ্ট নয় মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য। জনসচেতনতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে এর উৎপাদন, সরবরাহ ও এর অপব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং কঠিন শাস্তি, যেমন_মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যেহেতু মাদক আন্তর্জাতিক সমস্যা।
মাদকের অপব্যবহার তরুণদের মেধা ও মননকে শেষ করে দেয়, বিনষ্ট করে সুপ্ত প্রতিভা ও সুস্থ চিন্তা। মাদক গ্রহণের ফলে শরীরের স্নায়বিক ভারসাম্য ভেঙে পড়ে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মস্তিষ্ক। বিশ্বস্ত সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরে ০.৬৩ শতাংশ মানুষ মাদকাসক্ত। মাদকাসক্তের মধ্যে ৮৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। ২০০৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জরিপে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪৬ লাখের বেশি। অন্য সূত্রমতে, এই সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি। এদের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ কিশোর ও যুবক এবং নারীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। প্রতিবছর মাদকের পেছনে অপচয় হয় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১ শতাংশ খরচ হয় ধূমপানের পেছনে। তা ছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা আনার প্রধান রুট নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান), উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার নাফ নদী-তীরবর্তী অঞ্চল। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে মাদক ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত ও মিয়ানমার থেকে অবাধে মাদকদ্রব্য নিয়ে আসে এ দেশে। বিভিন্ন কৌশলে বিক্রি করে বোকা লোকদের কাছে, যারা নিজের জীবন সম্পর্কে উদাসীন। এরা সমাজে বখাটে নামে পরিচিত। এ ছাড়া নগরীর শতাধিক বস্তি অপরাধের উৎপত্তিস্থল, যেখানে ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ, ইয়াবা বিক্রি হয় নির্দ্বিধায়, এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যেদের আশপাশেও। ইয়াবা ছোট আকারের হওয়ায় চুলের খোঁপায়, ভ্যানিটি ব্যাগ ও ছায়ার পকেটে করে সরবরাহ করা সহজ ব্যাপার, যা কয়েকটি পত্রিকায় ইতিপূর্বেই প্রকাশিত হয়েছে। সীমান্তবর্তী ট্রেন মাদকদ্রব্য পাচারের প্রধান বাহন। ১৯৯০ সালে আমাদের দেশে 'মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন' করা হলেও এখন পর্যন্ত তা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। আইনে সমাজের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। পাবলিক প্লেসে ধূমপান নিষিদ্ধ করা হলেও এ আইনের পুরোপুরি বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তবে শিক্ষিত সমাজ অনেকাংশে ধূমপান থেকে বিরত রয়েছে। সাধারণত মাদক দিবসকে কেন্দ্র করে মাদক নিয়ে আমাদের দেশে সভা-সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জনসচেতনতা তৈরিতে ধর্মীয় জ্ঞানদান। এ শিক্ষাটি গ্রহণ করার মোক্ষম সময় শিশুকাল, যা পরিবার ও প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে গ্রহণ করা সম্ভব। গোয়েন্দা সূত্র মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর এবং শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে মাদক পাচারের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে। তা ছাড়া কুমিল্লা-চান্দিনা রুট, আখাউড়া রেলওয়ে জংশন, বেনাপোল স্থলবন্দর, শেরপুর সীমান্তপথ, সাতক্ষীরা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার সীমান্তপথ, বুড়িমারী-বাংলাবান্ধা-হিলি বন্দর, দিনাজপুর সীমান্তপথ, টেকনাফ, উখিয়া ও কঙ্বাজার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাজধানীকে কেন্দ্র করে ভারত-বাংলাদেশের মাদক ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে, যারা সীমান্তবর্তী ফেনসিডিল উৎপাদন কারখানা থেকে সংগ্রহ করে। সেখান থেকে উভয় দেশের কিছু অসৎ সীমান্তরক্ষী সদস্যের সহায়তায় বাংলাদেশের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় মজুদ করে। সেখান থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে থাকে মাদক ব্যবসায়ীরা। বিগত দিনগুলোতে পার্বত্য এলাকায় গভীর জঙ্গলে মাদকসহ অস্ত্র আটকের ঘটনায় সাধারণ মানুষ অনেকটা আশার আলো দেখলেও নিয়মিত ঘটনাবলির কারণে নিরাশ হতে বাধ্য। তবে র‌্যাব সদস্যদের প্রতি রয়েছে মানুষের আস্থা ও গভীর ভালোবাসা। তাদের সাঁড়াশি অভিযান ও তৎপরতা বাড়ানোর পক্ষে রয়েছে সাধারণ মানুষের আত্মবিশ্বাস। গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, নগরীর ১১০টি বস্তি মাদক বিক্রেতা, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের অভয়ারণ্য। এরাই নগরীর বিভিন্ন অপকর্ম ও বেআইনি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশের বস্তিগুলোতেই এর ব্যবসা চলে বেশি। প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে। এ ঘটনা অহরহই ঘটছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? উল্লেখ্য, মৃত প্রাণীর গন্ধ থেকে পরিত্রাণের ক্ষেত্রে নাক বন্ধের চেয়ে মৃত প্রাণীর সৎকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি মাদকদ্রব্য বিস্তার রোধকল্পে উৎস, আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের চিহ্নিত করে শক্ত হাতে তা দমন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ ও বাস্তবায়নকারীদের সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এর ব্যতিক্রম হলে হাতের লাঠিও এ থেকে রেহাই পাবে না। আগে মাদকাসক্তের কারণগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে বিরত রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। তবে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে এবং মনে করতে হবে, এ বিষ সবার ঘরেই প্রবেশ করতে পারে, যদি সবাই এ ব্যপারে তৎপর না হই। মাত্র গুটিকয়েক মাদকসেবী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও ঘুষখোরকে শক্ত হাতে দমনের জন্য সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে সোচ্চার হতে হবে। মাদকাসক্তের মূল কারণগুলো হচ্ছে_ধূমপান করা, মাদকাসক্তদের সঙ্গে সঙ্গ দেওয়া, ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব, বেকারত্ব ও হতাশা, মাদকদ্রব্যের সহজপ্রাপ্যতা, অবৈধ উপার্জন (ঘুষ, দুর্নীতি), অল্প বয়সে বেশি টাকা খরচের সুযোগ পাওয়া ইত্যাদি। অনেক সময় মা-বাবা বাধ্য হয়ে প্রিয় সন্তানটিকে মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে থানা হাজতে পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়। সবাইকে বুঝতে হবে, এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জন্ম একবারই। সুতরাং মাদক ব্যবহার করে এ সুন্দর জীবনটাকে কেন ধ্বংস করছি? ধর্মীয় জ্ঞান আহরণ করুন, স্বাস্থ্যের প্রতি নজর রাখুন, সুস্থভাবে নিজে বাঁচুন, অন্যকে বাঁচতে সাহায্য করুন, মাদককে 'না' বলুন_এটাই হোক সবার প্রত্যাশা।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান, মেডিসিন, সার্জারি অ্যান্ড অবসট্রেট্রিঙ্ বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর
fhoquehstu@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.