লক্ষ্যাপারের মূর্ছনা by বুশরা নাজরীন

ট্রেনটা ছাড়তে ২০ মিনিট দেরি করেছিল। না হলে ঠিক সময়েই নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে পেঁৗছে যেতে পারতাম। ৫ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টায় হাজির হয়ে প্রথম পর্বের লেজটা পেলাম বরাতজোরেই। তবলাচার্য মদন গোপাল দাসকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছিল তখন। লক্ষ্যাপারের এটা তৃতীয় বার্ষিক শাস্ত্রীয় সংগীত সম্মিলন। মদন গোপাল দাস জন্মেছেন ১৯৩৯ সালে ঢাকায়। ১৯৬০ সাল থেকে পরের ১১ বছর তিনি রামপুর ঘরানার ওস্তাদ সাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে তালিম নেন।


পরে ফুল মোহাম্মদ, বারীণ মজুমদার ও মীর কাশেম খানের কাছে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি বিটিভির সূচনালগ্ন থেকেই ছিলেন, এখনো আছেন বিশেষ শ্রেণীর শিল্পী হিসেবে। সম্মাননা নেওয়ার পর মদন গোপাল দাস সম্মিলনের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। প্রদীপ হাতে নিয়ে ছেলেমেয়ের দল উদ্বোধনী নৃত্য পরিবেশন করে। মঞ্চে বসা শিল্পীরা 'তা না না না' ধুন দিয়ে নৃত্যের আবহসংগীতটি শুরু করেন, শেষ করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'প্রথম আদি তব শক্তি...' দিয়ে।
নৃত্য শেষ হলে আমাদের স্বাধীনতার ৪০ বছর উপলক্ষে শ্রদ্ধা জানালেন পণ্ডিত রবিশংকর আর জর্জ হ্যারিসনকে। হারাধন-সুখেন প্রণোদনা বৃত্তিও দেওয়া হলো উচ্চাঙ্গের নবীন শিক্ষার্থীদের। রাত সোয়া ৯টার দিকে ড. ইশরাত জাহান রাগ হংসধ্বনি দিয়ে গানের আসরের সূচনা করেন। এর পরই পারমিতা ধরলেন রাগ শুদ্ধ কল্যাণ। প্রায় এক ঘণ্টার এ পরিবেশনা ছিল হৃদয়গ্রাহী। তবলায় সংগত করেছেন পিনুসেন দাশ। দুজন মিলে দারুণ লহরা তুলেছিলেন।
পারমিতার জন্ম বাংলাদেশে হলেও থাকেন নিউ ইয়র্কে। মাতামহ পণ্ডিত রামকানাই দাশের কাছে তাঁর হাতেখড়ি। এখন শিখছেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর কাছে। এরপর বেহালা নিয়ে মঞ্চে আসেন ভারতের ছত্তিশগড়ের ছেলে কে রোহন নাইডু। বারানসি ঘরানার পণ্ডিত দেবাশীষ দে তাঁর প্রথম সংগীতগুরু। এখন শিখছেন ভূপালের পণ্ডিত বসন্ত শেওলিকার কাছে। রোহন ধরলেন রাগ যোগ। শ্রোতাদের জন্য এটি ছিল মনোমুঙ্কর অভিজ্ঞতা। এই ১৯ বছর বয়সেই রোহন অর্জন করেছেন অনন্য বাদনশৈলী। বারানসি ঘরানার একটি দাদরাও শোনালেন তিনি, যার কথা ছিল এমন_'প্রিয়া কেন আসছে না, মেঘ তো নেই আকাশে'। এরপর গেয়েছেন ছায়ানটের উচ্চাঙ্গসংগীত গুরু অনুপ বড়ুয়া। তিনি ধরেছিলেন রাগ মালকোষ। কণ্ঠটি তাঁর অমূল্য সম্পদ আর খুব চর্চিত। তাই যতক্ষণ গেয়েছেন শুনতে ভালো লেগেছে।
রাত দেড়টায় ছিল নৈশ ভোজ। ঘিঢালা খিচুড়ি আর সবজিতে বেশ আয়েশ হয়েছিল। আলোকচিত্রী ইমরান গিয়েছিলেন পাঁচজনের এক দল নিয়ে। খাওয়ার সময় আলাপ জমে গিয়েছিল বেশি করে শিলুয়ার সঙ্গে। ওরা ছবি আঁকার ছাত্র বলে শিল্পকলাই ছিল আলাপের বিষয়। এর মধ্যে চলচ্চিত্র নির্মাতা মসিউদ্দিন শাকের ও তাঁর স্ত্রী জেবুন নেসার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। যা-ই হোক, খাবার পর্ব শেষ হলে গান ধরলেন আরশাদ আলী। তাঁকে ভারতে বলা হয় ছোটে ওস্তাদ। বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে জন্মেছেন। কিরানা ঘরানার শিল্পী তিনি। সারেঙ্গীর সুরস্রষ্টা ওস্তাদ শাকুর খানের নাতি তিনি। শিখেছেন মামা ওস্তাদ মশকুর আলী ও মুবারক আলীর কাছে। ধরলেন রাগ ললিত। তারপর সন্তুর বাজিয়েছেন শুদ্ধশীল চ্যাটার্জি। সন্তুর যন্ত্রটাই মন টানা। শুদ্ধশীল ধরেছিলেন বিলাসখানি টোঁরি। তারপর রাগ সরস্বতী গেয়েছিলেন শায়লা তাসমীন। এরপর সেতার নিয়ে মঞ্চে আসেন নিশিত দে। তিনি বাজিয়েছেন টোঁরি। আসর শেষ হয়েছিল সুরবন্ধু অশোক চৌধুরীর পরিবেশনা দিয়ে। তিনি গেয়েছিলেন আহির ভৈরব। হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর উদ্দেশে নিবেদন ছিল সে গানে। বেশ একটা পবিত্র আবেশ ছড়িয়ে পড়েছিল সে বৃষ্টিভেজা ভোরে।

No comments

Powered by Blogger.