গানে গানে হাসন রাজা লোক উৎসব by সেজুল হোসেন

সুনামগঞ্জে মরমি গানের কলতানে শেষ হলো তিন দিনব্যাপী হাসন রাজা লোক উৎসব। শনিবার মধ্যরাতে হাসন রাজাসহ ভাটি অঞ্চলের মরমি বাউল সাধকদের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় উৎসব। উৎসবের শেষ দিন উৎসর্গ করা হয় প্রয়াত কবি ও পৌর চেয়ারম্যান মমিনুল মউজদীনকে। হাসন রাজা স্মৃতি ট্রাস্টের সভাপতি দেওয়ান শমসের রাজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে শেষ দিনের আলোচনায় অংশ নেন লোক-গবেষকরা।


আলোচনা পর্ব শেষে মধ্যরাত অবধি চলে গান। হাসন রাজা পরিষদের আয়োজনে বেসরকারি মোবাইল ফোন কম্পানি বাংলালিংকের পৃষ্ঠপোষকতায় বৃহস্পতিবার বিকেলে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মতিউর রহমান উৎসবের উদ্বোধন করেন।
উৎসবের প্রথম দিন প্রধান অতিথি শিল্পকলা একাডেমীর সাবেক মহাপরিচালক কামাল লোহানী, বিশেষ অতিথি মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সালেহ্ চৌধুরী হাসন রাজার গানের দর্শন নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তারা হাসন রাজার গানের দর্শনকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুর্ক্তির দাবি জানান। পরে শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল পর্ব। হাসন রাজার গানের উত্তাপে নড়েচড়ে বসেন মাঠভর্তি শীতার্ত মানুষ। হাসন রাজার গান নিয়ে একে একে মঞ্চে আসেন শিল্পী সেলিম চৌধুরী, হিমাংশু বিশ্বাস, আকরামুল ইসলাম, মরিয়ম বেগম সুরমাসহ সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিশিষ্ট বাউল শিল্পীরা।
হাসন রাজা পরিষদের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির জাহানুর বলেন, 'সুনামগঞ্জে এমন উৎসব কতটা প্রাসঙ্গিক ছিল, দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষের উপস্থিতিই তা প্রমাণ করে।' বাংলালিংক কর্মকর্তারা জানান, দেশীয় সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে তাঁদের এ উদ্যোগ সব সময় থাকবে।
দ্বিতীয় দিনের উৎসব শুরু হয় আগের নির্ধারিত আলোচনা সভা দিয়ে। এ সময় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনের সভাপতিত্বে হাসন রাজার গান ও জীবন দর্শন নিয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ওস্তাদ রাম কানাই দাশ। বক্তারা বলেন, 'হাসন রাজা শুধু মরমি কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের দার্শনিক। হাসন রাজা আমাদের লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি আমাদের জন্য গবেষণার অনেক খোরাক দিয়ে গেছেন। তাঁর সৃষ্টি ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের মধ্যে সঠিকভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।'
এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের সংগীতানুষ্ঠান। মধ্যরাত পর্যন্ত চলে হাসন রাজার গান। দেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের পাশাপাশি গান পরিবেশন করেন সিলেট বিভাগের সব জেলার বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা।
১৮৫৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সুনামগঞ্জ শহরের এক ধনাঢ্য জমিদার পরিবারে জন্ম নেন মরমি সাধক হাসন রাজা। তাঁর গানে সহজ-সরল স্বাভাবিক ভাষায় মানবতার চিরন্তন বাণী উচ্চারিত হয়। সব ধর্মের বিভেদ অতিক্রম করে তিনি গেয়েছেন মাটি ও মানুষের গান। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ১৯২৫ সালে কলকাতায় এবং ১৯৩৩ সালে লন্ডনে হিবার্ট বক্তৃতায় হাসন রাজার গানের প্রশংসা করেছিলেন।

No comments

Powered by Blogger.