স্বাধীনতার পূর্ণতার জন্য by নাদীম কাদির
এক যুগ পর আমরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ লে. কর্নেল কাদিরের সন্তানরা ঢাকায় একত্র হয়েছি। আমাদের সবার জন্য এ সময়টা এমনিতেই আনন্দের ছিল। এ সময়েই খবর এলো গোলাম আযমকে কারাগারে প্রেরণের। আমাদের চার দশকের প্রত্যাশা পূরণ হলো। লাখ লাখ শহীদের রক্তভেজা মাটিতে রাজাকার-আলবদররা ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে। তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা অশ্রুসিক্ত হয়েছি। প্রতিবাদে মুখর হয়েছি।
তরুণ প্রজন্মের সদস্যরা ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করেছে। গোলাম আযমের গ্রেফতারের ঘটনায় রক্তঋণ শোধ করার দৃঢ় সংকল্প নিয়ে অবিরাম পথচলায় আমরা সবাই স্বস্তি পেয়েছি। এখন দাবি, বিচার কাজ দ্রুত সম্পন্ন হোক। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য কঠিন দণ্ড হোক।
আমাদের মা হাসনা হেনা কাদির এমন একটি দিনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরও ২৮ বছর বেঁচেছিলেন। ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন একাত্ম। প্রকৃতপক্ষে এ দাবি আদায়ে নবপর্যায়ে সংঘবদ্ধ আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে যারা সক্রিয় ছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের সামনের সারিতে। শুধু ঢাকা বা অন্য শহরে নয়, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল।
সবকিছু মানুষ ভোলে না। সব অপরাধের ক্ষমা মেলে না। গণহত্যার কোনো ক্ষমা নেই। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সহায়তা প্রদান করেন। তাকে পাকিস্তানি বাহিনী এপ্রিলে (১৯৭১) হত্যা করে। এর পক্ষে হয়তো যুক্তি দিয়ে কেউ বলবেন, পাকিস্তানি আর্মি ও তিনি ছিলেন মুখোমুখি। যারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়েছে তাদের মৃত্যুর জন্যও হয়তো যুক্তি দেওয়া যায়। কিন্তু লাখ লাখ নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশুকে প্রতিদিন সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার যুক্তি কোথায়? যেভাবে মা-বোনদের ধর্ষণ-লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তার তো ক্ষমা হতে পারে না।
আমার বয়স ছিল সে সময়ে দশ বছরেরও কম। আমার চোখের সামনে প্রতিদিন দেখেছি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সন্তানদের নিয়ে আমার মায়ের কষ্টের শেষ ছিল না। আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য এখান থেকে সেখানে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন। আমাদের মতো যারা শত্রুর সরাসরি টার্গেট হওয়ার কথা নয়, তারাও প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর শঙ্কাতে ছিলেন।
পাকিস্তানি বাহিনীতে এ জঘন্য অপরাধ সংঘটনে সক্রিয় সহায়তা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে তারা রাজাকার-আলবদর বাহিনী গড়ে তুলেছিল। জামায়াতে ইসলামী হানাদারদের গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে। নিজেরাও তাতে অংশ নিয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী ছিল মুখ্য ভূমিকায়।
গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে কারাগারে প্রেরণের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের একটি প্রধান দাবি পূরণ হয়েছে। এখন বিচার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা চাই। তবে সংশয় রয়েছে, সরকার পরিবর্তন ঘটলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিঘি্নত হতে পারে। সংসদে মহাজোট সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাদের এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে যাতে এ কাজে কোনোভাবেই বিঘ্ন সৃষ্টি করা না যায়। বিচার কাজ অবশ্যই সুচারুরূপে সম্পন্ন করা চাই। অভিযুক্তরা দেশ-বিদেশে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো কোনো মহল চাপ সৃষ্টি করছে বিচার কাজ থেকে সরে আসার জন্য। আমাদের প্রত্যাশা আজ, কোনো চাপের কাছে যেন নত না হই, মানবেতিহাসের ঘৃণ্য অপরাধে যুক্তদের বিচার কাজ থেকে সরে না আসি। আমাদের এ সংগ্রামে জিততেই হবে স্বাধীনতার পূর্ণতার জন্য। আমার মা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, নিশ্চিতভাবেই তিনি শামিল হতেন রাজপথের কর্মসূচিতে। মাকে বলি, আমরা তো আছি!
আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্যালুট জানাই_বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে দৃঢ়পণে চলার জন্য। যারা বলে চলেছে, বিচার কাজ লোক দেখানো, আসুন তাদের ভুল প্রমাণ
করে দিই।
নাদীম কাদির : শহীদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাদিরের পুত্র এবং সাংবাদিক
আমাদের মা হাসনা হেনা কাদির এমন একটি দিনের জন্য মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরও ২৮ বছর বেঁচেছিলেন। ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি আদায়ের আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন একাত্ম। প্রকৃতপক্ষে এ দাবি আদায়ে নবপর্যায়ে সংঘবদ্ধ আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে যারা সক্রিয় ছিলেন, তিনি ছিলেন তাদের সামনের সারিতে। শুধু ঢাকা বা অন্য শহরে নয়, গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল।
সবকিছু মানুষ ভোলে না। সব অপরাধের ক্ষমা মেলে না। গণহত্যার কোনো ক্ষমা নেই। আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সূচনাপর্বে মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয় সহায়তা প্রদান করেন। তাকে পাকিস্তানি বাহিনী এপ্রিলে (১৯৭১) হত্যা করে। এর পক্ষে হয়তো যুক্তি দিয়ে কেউ বলবেন, পাকিস্তানি আর্মি ও তিনি ছিলেন মুখোমুখি। যারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়েছে তাদের মৃত্যুর জন্যও হয়তো যুক্তি দেওয়া যায়। কিন্তু লাখ লাখ নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশুকে প্রতিদিন সুপরিকল্পিতভাবে হত্যার যুক্তি কোথায়? যেভাবে মা-বোনদের ধর্ষণ-লাঞ্ছিত করা হয়েছে, তার তো ক্ষমা হতে পারে না।
আমার বয়স ছিল সে সময়ে দশ বছরেরও কম। আমার চোখের সামনে প্রতিদিন দেখেছি নৃশংস হত্যাকাণ্ড। সন্তানদের নিয়ে আমার মায়ের কষ্টের শেষ ছিল না। আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য এখান থেকে সেখানে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে বেড়িয়েছেন। আমাদের মতো যারা শত্রুর সরাসরি টার্গেট হওয়ার কথা নয়, তারাও প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুর শঙ্কাতে ছিলেন।
পাকিস্তানি বাহিনীতে এ জঘন্য অপরাধ সংঘটনে সক্রিয় সহায়তা দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে তারা রাজাকার-আলবদর বাহিনী গড়ে তুলেছিল। জামায়াতে ইসলামী হানাদারদের গণহত্যায় সহযোগিতা করেছে। নিজেরাও তাতে অংশ নিয়েছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জামায়াতে ইসলামী ছিল মুখ্য ভূমিকায়।
গোলাম আযমকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে কারাগারে প্রেরণের মধ্য দিয়ে এ আন্দোলনের একটি প্রধান দাবি পূরণ হয়েছে। এখন বিচার কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা চাই। তবে সংশয় রয়েছে, সরকার পরিবর্তন ঘটলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বিঘি্নত হতে পারে। সংসদে মহাজোট সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাদের এমন আইন প্রণয়ন করতে হবে যাতে এ কাজে কোনোভাবেই বিঘ্ন সৃষ্টি করা না যায়। বিচার কাজ অবশ্যই সুচারুরূপে সম্পন্ন করা চাই। অভিযুক্তরা দেশ-বিদেশে নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো কোনো মহল চাপ সৃষ্টি করছে বিচার কাজ থেকে সরে আসার জন্য। আমাদের প্রত্যাশা আজ, কোনো চাপের কাছে যেন নত না হই, মানবেতিহাসের ঘৃণ্য অপরাধে যুক্তদের বিচার কাজ থেকে সরে না আসি। আমাদের এ সংগ্রামে জিততেই হবে স্বাধীনতার পূর্ণতার জন্য। আমার মা যদি আজ বেঁচে থাকতেন, নিশ্চিতভাবেই তিনি শামিল হতেন রাজপথের কর্মসূচিতে। মাকে বলি, আমরা তো আছি!
আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে স্যালুট জানাই_বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে দৃঢ়পণে চলার জন্য। যারা বলে চলেছে, বিচার কাজ লোক দেখানো, আসুন তাদের ভুল প্রমাণ
করে দিই।
নাদীম কাদির : শহীদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাদিরের পুত্র এবং সাংবাদিক
No comments