জনদাবির জয় by হারুন-অর-রশীদ
স্বাধীনতার চার দশক পর দেশবাসীর অন্যতম প্রধান একটি আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটল ১১ জানুয়ারি, ২০১২ তারিখে_ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গোলাম আযমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যেমন ছিল আনন্দ ও গৌরবের, তেমনি বিষাদের। সাড়ে সাত কোটি বাঙালি লড়েছে বীরের মতো, তাদের অসম সাহস বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। মাতৃভূমি স্বাধীন করার জন্য ত্রিশ লাখ বাঙালি আত্মাহুতি দিয়েছে।
লাখ লাখ নারী ধর্ষিত-লাঞ্ছিত হয়েছে। এক কোটি নারী-পুরুষ-শিশুকে দেশান্তরী হতে হয়েছে। অন্যদিকে, সে সময়ে দেশের ভেতরে থাকা কোটি কোটি মানুষ প্রতি মুহূর্তে ছিল মৃত্যুভয়ে শঙ্কিত। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসররা যে কোনো ব্যক্তিকে যখন-তখন নৃশংস উপায়ে খুন করেছে। বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে। সম্পদ বিনষ্ট করেছে।
দখলদার বাহিনী এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশের মানুষ এবং পরিবেশ ও পথঘাট ছিল তাদের অচেনা। এরপরও তারা প্রায় ৯ মাস ধরে নৃশংসতা চালাতে পেরেছে এখানের কিছু কুলাঙ্গারের সহযোগিতার কারণে। তারা মুক্তিবাহিনীর অবস্থান হানাদার বাহিনীকে জানিয়ে দিত। মুক্তিবাহিনীতে যারা যোগ দিয়েছেন তাদের বাড়িঘর তারা চিনিয়ে দিত এবং তাদের বাড়িঘরে হামলা-অগি্নসংযোগ চালাতে প্ররোচনা দিত। মেয়েদের ধরে ধরে তুলে দিয়ে আসত পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পগুলোতে। এই অপশক্তিকে সংগঠিত করেছে জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দল এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ। গোলাম আযম ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রাদেশিক আমির এবং মতিউর রহমান নিজামী ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা। জামায়াতে ইসলামীর প্ররোচনাতেই পাকিস্তানি সরকার রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠন করে। কেন্দ্রীয় ও জেলা-থানা-গ্রাম পর্যায়ে শান্তি কমিটি গঠনেও উদ্যোগী ছিল এ রাজনৈতিক দলটি। তাদের সহচর ছিল মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামে ইসলামের মতো রাজনৈতিক দল। তাদের এ ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষমা নেই। স্বাধীনতার পর তাদের বিচারকাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি করে দালাল আইন বাতিল করা হয়। সেই সময় থেকেই দেশবাসী একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামী এবং তাদের সহযোগীদের বিচার দাবি করে আসছে। সাড়ে তিন দশক আমরা এ জন্য রাজপথে থেকেছি। হানাদার বাহিনীর দোসরদের দম্ভোক্তি ছিল, কেউ তাদের কিছু করতে পারবে না। কিন্তু ১০ জানুয়ারি আমরা দেখতে পেলাম, জনমতের ওপরে কিছু নেই। বাঙালি জাতি স্বাধীনতা যেমন আদায় করে ছেড়েছে, তেমনি সে সময়ে যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা দমন করার জন্য হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে তাদের বিচারের প্রশ্নেও ছিল দৃঢ়সংকল্প। আমরা অবশ্যই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। গোলাম আযমসহ সব আলবদর-রাজাকারের পাণ্ডাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। গোলাম আযম গ্রেফতার হওয়ায় বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হিসেবে আমরা যারা বেঁচে আছি সবাই স্বস্তি পাব। আমাদের দাবি, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে যারা এখনও সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক। এ বিচারকাজে ইতিমধ্যে অনেক বিলম্ব ঘটেছে। এ কারণে আমাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হোক। রাজধানী ঢাকায় দুটি এবং প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এ জন্য যেমন বাজেট বরাদ্দ চাই, তেমনি লোকবলের জোগান দিতে হবে। তদন্ত দলকেও শক্তিশালী করতে হবে। গবেষণা কাজ জোরদার করতে হবে। অপরাধীরা জঘন্য প্রকৃতির এবং তারা বিচার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেছে। এ কারণে সাক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজও জরুরি। বিচারকাজ যেন সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে সে জন্য জনগণকে সদা সতর্ক থাকার জন্যও আমি আবেদন জানাব। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জনদাবির কারণেই আজ একাত্তরের ঘাতকরা বিচারের সম্মুখীন। তারা নিজেদের বাঁচাতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। দেশ-বিদেশে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। তাদের মোকাবেলা করার জন্য সরকারের পাশাপাশি আপামর দেশবাসীকে সক্রিয় থাকতে হবে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারুন-অর-রশীদ, বীরপ্রতীক : সাবেক সেনাপ্রধান এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।
দখলদার বাহিনী এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। বাংলাদেশের মানুষ এবং পরিবেশ ও পথঘাট ছিল তাদের অচেনা। এরপরও তারা প্রায় ৯ মাস ধরে নৃশংসতা চালাতে পেরেছে এখানের কিছু কুলাঙ্গারের সহযোগিতার কারণে। তারা মুক্তিবাহিনীর অবস্থান হানাদার বাহিনীকে জানিয়ে দিত। মুক্তিবাহিনীতে যারা যোগ দিয়েছেন তাদের বাড়িঘর তারা চিনিয়ে দিত এবং তাদের বাড়িঘরে হামলা-অগি্নসংযোগ চালাতে প্ররোচনা দিত। মেয়েদের ধরে ধরে তুলে দিয়ে আসত পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পগুলোতে। এই অপশক্তিকে সংগঠিত করেছে জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দল এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘ। গোলাম আযম ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রাদেশিক আমির এবং মতিউর রহমান নিজামী ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা। জামায়াতে ইসলামীর প্ররোচনাতেই পাকিস্তানি সরকার রাজাকার ও আলবদর বাহিনী গঠন করে। কেন্দ্রীয় ও জেলা-থানা-গ্রাম পর্যায়ে শান্তি কমিটি গঠনেও উদ্যোগী ছিল এ রাজনৈতিক দলটি। তাদের সহচর ছিল মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামে ইসলামের মতো রাজনৈতিক দল। তাদের এ ঘৃণ্য অপরাধের ক্ষমা নেই। স্বাধীনতার পর তাদের বিচারকাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি করে দালাল আইন বাতিল করা হয়। সেই সময় থেকেই দেশবাসী একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামী এবং তাদের সহযোগীদের বিচার দাবি করে আসছে। সাড়ে তিন দশক আমরা এ জন্য রাজপথে থেকেছি। হানাদার বাহিনীর দোসরদের দম্ভোক্তি ছিল, কেউ তাদের কিছু করতে পারবে না। কিন্তু ১০ জানুয়ারি আমরা দেখতে পেলাম, জনমতের ওপরে কিছু নেই। বাঙালি জাতি স্বাধীনতা যেমন আদায় করে ছেড়েছে, তেমনি সে সময়ে যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা দমন করার জন্য হানাদার বাহিনীকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে তাদের বিচারের প্রশ্নেও ছিল দৃঢ়সংকল্প। আমরা অবশ্যই আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। গোলাম আযমসহ সব আলবদর-রাজাকারের পাণ্ডাদের অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। গোলাম আযম গ্রেফতার হওয়ায় বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হিসেবে আমরা যারা বেঁচে আছি সবাই স্বস্তি পাব। আমাদের দাবি, একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ করে যারা এখনও সদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক। এ বিচারকাজে ইতিমধ্যে অনেক বিলম্ব ঘটেছে। এ কারণে আমাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়ানো হোক। রাজধানী ঢাকায় দুটি এবং প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে হবে। এ জন্য যেমন বাজেট বরাদ্দ চাই, তেমনি লোকবলের জোগান দিতে হবে। তদন্ত দলকেও শক্তিশালী করতে হবে। গবেষণা কাজ জোরদার করতে হবে। অপরাধীরা জঘন্য প্রকৃতির এবং তারা বিচার প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের নানাভাবে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেছে। এ কারণে সাক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের কাজও জরুরি। বিচারকাজ যেন সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে সে জন্য জনগণকে সদা সতর্ক থাকার জন্যও আমি আবেদন জানাব। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জনদাবির কারণেই আজ একাত্তরের ঘাতকরা বিচারের সম্মুখীন। তারা নিজেদের বাঁচাতে নানাভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। দেশ-বিদেশে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে। তাদের মোকাবেলা করার জন্য সরকারের পাশাপাশি আপামর দেশবাসীকে সক্রিয় থাকতে হবে।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল হারুন-অর-রশীদ, বীরপ্রতীক : সাবেক সেনাপ্রধান এবং সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।
No comments