গোপালপুর গণহত্যা :রক্তে লাল বর্ষা by রুদ্র মাসুদ

কাত্তরে নোয়াখালীতে সবচেয়ে বর্বরোচিত গণহত্যা সংঘটিত হয় বেগমগঞ্জের গোপালপুর বাজারে। ১৯ আগস্ট সকালে স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় ৫৪ জন নিরীহ মানুষকে খালপাড়ে লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানি আর্মিরা। হত্যাযজ্ঞ শেষে পাক আর্মি ও রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর স্বজনরা তাদের লাশ নিয়ে যান। তাদের ২৪ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের নামসহ স্বাধীনতার ১৭ বছর পর গোপালপুর বাজারে স্থাপিত হয় স্মৃতিস্তম্ভ।


স্থানীয় জনতা ক্লাবের উদ্যোগে নির্মিত এই স্মৃতিস্তম্ভটিই এখন সেই বর্বরোচিত লোমহর্ষক গণহত্যার একমাত্র নিদর্শন। চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর সড়কের বাংলাবাজার থেকে উত্তরে বেগমগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর বাজার। ১৯৭১ সালে এই বাজার ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম রিক্রুটিং ও ট্রেনিং সেন্টার। সুবেদার লুৎফর রহমানের নেতৃত্বে সেখানে চলত মুক্তিসেনাদের প্রশিক্ষণ। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে এ খবর চলে যায় পাকিস্তানি আর্মিদের কাছে।
বেগমগঞ্জ কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়ে স্থাপিত পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্প থেকে অনতিদূরে মুক্তিযোদ্ধাদের এই শক্ত ঘাঁটিতে আক্রমণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে পাক আর্মি। গোপালপুর আক্রমণের লক্ষ্যে স্থানীয় দালালদের নিয়োগ করে তারা। প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শোনা যেত পাকিস্তানিরা আসছে। এ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে কিছুটা আতঙ্ক, উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯ আগস্ট ভোরে পাকিস্তানি আর্মির বিশাল বহর অবস্থান নেয় বাংলাবাজারের সামছুন্নাহার উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে গোপালপুর বাজারে প্রবেশ করে পাক আর্মি। বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে একটি দল এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে আরেকটি দল প্রবেশ করে। তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকার নেছার, আবদুল মতিন, বাতেন, আবু বকর ছিদ্দিক, ইসমাইল, মফিজ উল্লা। এ সময় তারা গোটা বাজার ঘিরে ফেলে।
বিভিন্ন অপারেশনে যাওয়ার কারণে গোপালপুর বাজারে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ডা. আনিছসহ মাত্র কয়েকজন ছিলেন। তারপরও মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানিদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন। পাক আর্মি বাজারে আক্রমণ করতে আসার খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের গোপনে সহায়তাকারী মুসলিম লীগ নেতা মাহবুবুল হক চৌধুরী (নসা মিয়া) যে কোনো ধরনের হত্যাযজ্ঞ এবং অগি্নসংযোগ এড়াতে ভোরে বাজারে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের সরে যেতে বলেন। পাশাপাশি বাজারের ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষকেও দ্রুত বাজার ত্যাগ করতে বলেন। ডা. আনিছসহ মুক্তিযোদ্ধারা বাজার থেকে সরে যাওয়ায় পাক সেনারা পেঁৗছে কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে পায়নি। এতে ক্ষিপ্ত হয় তারা। তখনও বাজারে দুই-আড়াইশ' লোক অবস্থান করছিল।
সকাল ৮টার দিকে মুুসলিম লীগ নেতা নসা মিয়া পাকিস্তানি আর্মিকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এখানে মুক্তিযোদ্ধারা থাকেন না এবং কোনো ট্রেনিং সেন্টারও সেখানে নেই। তার ধারণা ছিল তিনি যেহেতু মুসলিম লীগ করেন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তার জানাশোনা ছিল তাই তার কথায় হয়তো পাক সেনারা মানুষের ওপর অত্যাচার, হত্যা কিংবা বাড়িঘরে আগুন দেবে না। কিন্তু রাজাকারদের ইন্ধন এবং প্ররোচণায় নসা মিয়ার কথা কানেই তোলেনি আর্মিরা। এরপর পাকিস্তানি সেনা এবং রাজাকাররা শুরু করে তল্লাশি। এ সময় নসা মিয়াদের গদির (ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) পাশে একটি ঘর (কিছুক্ষণ আগেও মুক্তিযোদ্ধারা ছিলেন সেখানে) থেকে গুলির খোসা এবং মোহাম্মদ উল্লার টেইলারিং দোকান থেকে একটি বাংলাদেশের পতাকা পেয়ে পাক সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। এরই মধ্যে বিভিন্ন দোকান থেকে লোকজনকে ধরে এনে বর্তমানে ব্যাংকের পূর্ব পাশের খালি জায়গায় জড়ো করতে থাকে। উন্মত্ত পাক আর্মি এ সময় ইউপি সদস্য দীন ইসলাম, ব্যবসায়ী ছিদ্দিক উল্যা, তার দোকানের কর্মচারী হাবিব উল্যা, টেইলারিং দোকানের মালিক মোহাম্মদ উল্লা দর্জিকে বাজারের মাঝখানেই বেধড়ক পিটুনি দেয়। বাদ যাননি নসা মিয়াও।
সকাল ১০টা নাগাদ জড়ো করা প্রায় আড়াইশ' লোকের মধ্য থেকে নসা মিয়াসহ ৫৬ জনকে বাজারের পূর্বদিকের রাস্তায় খালপাড়ে দাঁড় করায় এবং বাজারে আগুন ধরিয়ে দেয় পাক আর্মি ও রাজাকাররা। নসা মিয়া তখন লাইনে দাঁড় করানো ৫৬ জনের মধ্য থেকে তাদের মসজিদের ইমাম হাফেজ আজিজুর রহমান এবং পোস্টম্যান আবদুল মান্নানের জীবন ভিক্ষা চান পাক সেনাদের কাছে। নসা মিয়ার অনুরোধ রক্ষা করে এ দু'জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু নসা মিয়ার রক্ষা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতার অপরাধে রাজাকারদের ইন্ধনে লাইনে নসা মিয়াসহ দাঁড় করানো বাকি ৫৪ জনকে খালের দিকে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়াতে বলে এবং একসঙ্গে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। সৌভাগ্যক্রমে গুলিবিদ্ধ অবস্থায়ই তখন একজন বেঁচে যান।
পাক সেনারা চলে যাওয়ার পর দুপুর ১২টার দিক থেকেই পর্যায়ক্রমে শহীদদের স্বজনরা তাদের লাশ নিতে আসেন। শহীদদের তাজা রক্তে লাল হয়ে যায় বর্ষায় টইটুম্বুর খালের পানি। শহীদদের লাশ সমাহিত করা হয় নিজ নিজ পারিবারিক কবরস্থানে। এ জন্য অনেকের নাম-পরিচয় তখন শনাক্ত করা যায়নি।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ১৯ আগস্ট শহীদদের স্মরণে প্রতিবছর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলেও সেই মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞের কোনো স্মৃতিচিহ্ন ছিল না গোপালপুর বাজারে। ১৯৮৮ সালে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় জনতা ক্লাব। ক্লাবের তখনকার সভাপতি রতন মাস্টার খুঁজে খুঁজে সংগ্রহ করেন গণহত্যায় শহীদ হওয়া ৫৪ জনের মধ্যে ২৪ জনের নাম-পরিচয়। যাদের নাম-ঠিকানাসহ স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করা হয় ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর।
সঠিক সংস্কার ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না থাকায় ১৯৮৮ সালে স্থাপিত এ স্মৃতিস্তম্ভটি পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়। তাই সম্প্রতি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা লকিয়ত উল্যাসহ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের লোকজনের উদ্যোগে গণহত্যার স্থলে পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মাণে সরকারি সহযোগিতা কতটুকু পাওয়া যাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে স্থানীয় প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দের। মু্িক্তযোদ্ধাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বিবেকবর্জিত এই গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের।
বফরঃড়ৎ@পযধষড়সধহহড়ধশযধষর.পড়স

No comments

Powered by Blogger.