গোলাম আযমের পরামর্শেই রাজাকার বাহিনী গঠন
একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দোসর হিসেবে সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী গঠনে প্রধান উদ্যোগ ছিল জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আমির গোলাম আযমের। লাহোরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি এ সংক্রান্ত প্রস্তাব দেন। কুখ্যাত শান্তি কমিটি গঠনের পরামর্শও দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। শান্তি কমিটি এবং রাজাকার বাহিনী বাংলাদেশে পাকসেনাদের গণহত্যায় শুধু সহযোগিতাই করেনি, এ নৃশংসতায় প্রত্যক্ষভাবে শরিক হয়েছিল।
রাজাকার বাহিনীর 'অংশ হিসেবে' আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠনেও এ দলের ছিল মুখ্য ভূমিকা। জামায়াতে ইসলামীর তরুণ ক্যাডারদের নিয়ে গঠিত আলবদর বাহিনী নৃশংসতায় পাকবাহিনীর ডার্টি ব্যাটালিয়নের সমকক্ষতা অর্জন করেছিল। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর ১০ দিন পর গোলাম আযম, নূরুল আমীন, খাজা খয়েরউদ্দিনসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাতে তৎপর ১২ জন নেতা টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে 'পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করায় পূর্ণ সহযোগিতার' আশ্বাস দেন।
রাজাকার বাহিনী গঠনের প্রস্তাব গোলাম আযম দিয়েছিলেন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। 'দৈনিক পাকিস্তান' পত্রিকায় ১৯ জুন লেখা হয় : 'গোলাম আযম লাহোরে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে কিছু সুপারিশ রাখবেন। তবে এগুলো আগেভাগে প্রকাশ করা ভালো হবে না।' পরদিন সাক্ষাতের সময় তার সুপারিশ যে কুখ্যাত রাজাকার বাহিনী গঠনের জন্যই ছিল সেটা স্পষ্ট হয় ২১ জুন 'সংগ্রামে'র একটি সংবাদে। এতে জানানো হয়, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে 'দুষ্কৃতকারীদের মোকাবেলার জন্য দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করার আহ্বান জানিয়েছেন।'
এর পরদিনই সংগ্রামে সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, 'দেশপ্রেমিকদের অস্ত্রসজ্জিত করা হলে অল্প সময়েই দুষ্কৃতকারীদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে।'
একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে তাকে শুধু চ্যালেঞ্জই জানায়নি, 'দুষ্কৃতকারীদের দমনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।' [লাহোরে গোলাম আযমের সংবাদ সম্মেলন, ২১ জুন, '৭১]
প্রেসিডেন্টকে রাজাকার বাহিনী গঠনের প্রস্তাব প্রদানের পর লাহোরে তিনি বলেন, 'জামায়াতে ইসলামী দুষ্কৃতকারীদের দমনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।'
সংগ্রামে ২৩ আগস্ট 'রেজাকার অর্ডিন্যান্স' শীর্ষক সম্পাদকীয় লেখা হয়। এতে বলা হয়, 'ইসলামী আদর্শের অনুসারী ছাড়া কেউ যেন এ বাহিনীতে যোগ দিতে না পারে' সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সংগ্রামের এ সম্পাদকীয়তেই জানানো হয় যে দেশের 'কোথাও কোথাও রেজাকার বাহিনী বদর বাহিনী হিসেবে পরিচিত।'
দলের পাকিস্তানের আমির মওলানা মওদুদী লাহোরে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের এক সভায় বলেন, 'পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পূর্ণরূপে খতম করা হবে। আল্লাহর হাজার শুকরিয়া যে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতায় শেখ মুজিবের ভ্রান্ত পদক্ষেপ মোকাবেলায় এগিয়ে আসে এবং দাসত্বে আবদ্ধ করার ষড়যন্ত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করে। [৯ অক্টোবর,'৭১]
জামায়াতে ইসলামী রাজাকার বাহিনী গঠনের পর এর সদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানো এবং তাদের ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করার দাবি তোলে। দেশের সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বাড়ছে এ খবর দিয়ে সংগ্রামে ৭ অক্টোবর লেখা হয় : 'প্রদেশের অভ্যন্তরে দুষ্কৃতকারীদের নির্মূল করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্ভরযোগ্য লোকের মাধ্যমে রেজাকার বাহিনী গঠন এর মোক্ষম হাতিয়ার। রাজাকারদের ভারী অস্ত্র দেয়াও আবশ্যক।' প্রসঙ্গত 'সংগ্রামে' রাজাকার বাহিনীকে রেজাকার বাহিনী হিসেবে লেখা হতো। রাজাকার ও আলবদর বাহিনী জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে, ক্রমাগত এ অভিযোগ উঠতে থাকায় দলের 'পূর্ব পাকিস্তান' শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক ১৪ অক্টোবর এক বিবৃতিতে বলেন, 'এ বাহিনী বিশেষ কোনো দলের নয় বরং সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন।' তিনি রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ না এনে তাদের প্রশংসা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
মতিউর রহমান নিজামীর সংকল্প ও প্রত্যাশা ছিল সে সময় আকাশছোঁয়া : 'সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আলবদর তরুণরা সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দুস্তানের অস্তিত্ব খতম করে দেবে।'
পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি নিজামী আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একাত্তরের ১৮ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল এডুকেশন সেন্টার রাজাকারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন করার সময় প্রদত্ত ভাষণে তিনি 'ভালোভাবে ট্রেনিং নিয়ে শত্রু দমনে ভূমিকা রাখার জন্য' রাজাকারদের প্রতি আহ্বান জানান।
রাজাকার বাহিনী গঠনের প্রস্তাব গোলাম আযম দিয়েছিলেন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। 'দৈনিক পাকিস্তান' পত্রিকায় ১৯ জুন লেখা হয় : 'গোলাম আযম লাহোরে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে কিছু সুপারিশ রাখবেন। তবে এগুলো আগেভাগে প্রকাশ করা ভালো হবে না।' পরদিন সাক্ষাতের সময় তার সুপারিশ যে কুখ্যাত রাজাকার বাহিনী গঠনের জন্যই ছিল সেটা স্পষ্ট হয় ২১ জুন 'সংগ্রামে'র একটি সংবাদে। এতে জানানো হয়, পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে 'দুষ্কৃতকারীদের মোকাবেলার জন্য দেশের আদর্শ ও সংহতিতে বিশ্বাসী লোকদের হাতে অস্ত্র সরবরাহ করার আহ্বান জানিয়েছেন।'
এর পরদিনই সংগ্রামে সম্পাদকীয় নিবন্ধে বলা হয়, 'দেশপ্রেমিকদের অস্ত্রসজ্জিত করা হলে অল্প সময়েই দুষ্কৃতকারীদের উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে।'
একাত্তরের ২৬ মার্চ থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নিজের স্বাধীন অস্তিত্ব ঘোষণা করেছে। জামায়াতে ইসলামী দলগতভাবে তাকে শুধু চ্যালেঞ্জই জানায়নি, 'দুষ্কৃতকারীদের দমনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।' [লাহোরে গোলাম আযমের সংবাদ সম্মেলন, ২১ জুন, '৭১]
প্রেসিডেন্টকে রাজাকার বাহিনী গঠনের প্রস্তাব প্রদানের পর লাহোরে তিনি বলেন, 'জামায়াতে ইসলামী দুষ্কৃতকারীদের দমনের জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।'
সংগ্রামে ২৩ আগস্ট 'রেজাকার অর্ডিন্যান্স' শীর্ষক সম্পাদকীয় লেখা হয়। এতে বলা হয়, 'ইসলামী আদর্শের অনুসারী ছাড়া কেউ যেন এ বাহিনীতে যোগ দিতে না পারে' সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সংগ্রামের এ সম্পাদকীয়তেই জানানো হয় যে দেশের 'কোথাও কোথাও রেজাকার বাহিনী বদর বাহিনী হিসেবে পরিচিত।'
দলের পাকিস্তানের আমির মওলানা মওদুদী লাহোরে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীদের এক সভায় বলেন, 'পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হলে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পূর্ণরূপে খতম করা হবে। আল্লাহর হাজার শুকরিয়া যে পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতায় শেখ মুজিবের ভ্রান্ত পদক্ষেপ মোকাবেলায় এগিয়ে আসে এবং দাসত্বে আবদ্ধ করার ষড়যন্ত্র থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে রক্ষা করে। [৯ অক্টোবর,'৭১]
জামায়াতে ইসলামী রাজাকার বাহিনী গঠনের পর এর সদস্য সংখ্যা আরও বাড়ানো এবং তাদের ভারী অস্ত্রে সজ্জিত করার দাবি তোলে। দেশের সর্বত্র মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বাড়ছে এ খবর দিয়ে সংগ্রামে ৭ অক্টোবর লেখা হয় : 'প্রদেশের অভ্যন্তরে দুষ্কৃতকারীদের নির্মূল করতে হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নির্ভরযোগ্য লোকের মাধ্যমে রেজাকার বাহিনী গঠন এর মোক্ষম হাতিয়ার। রাজাকারদের ভারী অস্ত্র দেয়াও আবশ্যক।' প্রসঙ্গত 'সংগ্রামে' রাজাকার বাহিনীকে রেজাকার বাহিনী হিসেবে লেখা হতো। রাজাকার ও আলবদর বাহিনী জামায়াতে ইসলামীর নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে, ক্রমাগত এ অভিযোগ উঠতে থাকায় দলের 'পূর্ব পাকিস্তান' শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক ১৪ অক্টোবর এক বিবৃতিতে বলেন, 'এ বাহিনী বিশেষ কোনো দলের নয় বরং সামরিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন।' তিনি রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ না এনে তাদের প্রশংসা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
মতিউর রহমান নিজামীর সংকল্প ও প্রত্যাশা ছিল সে সময় আকাশছোঁয়া : 'সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আলবদর তরুণরা সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে হিন্দুস্তানের অস্তিত্ব খতম করে দেবে।'
পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি নিজামী আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। একাত্তরের ১৮ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল এডুকেশন সেন্টার রাজাকারদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন করার সময় প্রদত্ত ভাষণে তিনি 'ভালোভাবে ট্রেনিং নিয়ে শত্রু দমনে ভূমিকা রাখার জন্য' রাজাকারদের প্রতি আহ্বান জানান।
No comments