রাজনীতি-নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু by আবদুল মান্নান
মহাজোট সরকারের আমলে তিন-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন হয়ে গেল এবং তিনটিতেই মহাজোটের প্রধান শরিক দল আওয়ামী লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। এ সময়ে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ভালো করতে পারেনি। তবে এর অর্থ এই নয় যে এতে প্রধান বিরোধী দলের তেমন কোনো লাভ হয়েছে বরং এই নির্বাচনগুলোর পরাজয় বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করে সামনের দিকে এগোতে পারলে আওয়ামী লীগের লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই।
তবে কী হবে, তা নির্ভর করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব, বিশেষ করে দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ওপর। প্রথম অপ্রত্যাশিত (বেশির ভাগের কাছে প্রত্যাশিত) হার বর্তমান সরকারের দেড় বছরের মাথায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন মেয়র নির্বাচনে। তিনবারের নির্বাচিত সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং একসময়ের জননন্দিত মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী হেরে গেলেন এমন একজন ব্যক্তির কাছে, যাঁর বড়জোর একজন ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা আছে। সেই ব্যক্তি মন্জুর আলমের রাজনীতিতে পরিচয় মহিউদ্দিন চৌধুরীর শিষ্য হিসেবে, যিনি নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন আগেও মুজিব কোট গায়ে লাগিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই নির্বাচনে বিএনপির নিজস্ব কোনো প্রার্থী ছিল না । মন্জুর আলমকে হাইজ্যাক করে নিয়ে বিএনপি আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল এবং বলতে দ্বিধা নেই, সুযোগটা করে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী নিজেই। তিনি বুঝতে পারেননি যে তৃতীয় মেয়াদকালে অনেকটা তাঁর অজান্তেই নিজের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়েছিল। শেষের দিকে এসে তাঁর পতন অনিবার্য করেছিল তাঁকে ঘিরে থাকা কিছু স্তাবক ও চাটুকার। প্রায় ৯৬ হাজার ভোটে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে তিনি আবার ফিরে আসতে পারবেন কি না, তা আগামী দিনই বলে দেবে। তাঁর পরাজয়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ তিনি মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বন্দর নগরের বাসিন্দারা। কারণ, বর্তমানে দেশের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই মহানগরে একজন মেয়র আছেন, তা মনেই হয় না।
সরকারে তিন বছর যখন আসি আসি করছে, তখন দ্বিতীয় বিপর্যয়টা ঘটল নারায়ণগঞ্জে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হলেন দল-সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমান, যিনি তাঁর এলাকায় একজন গডফাদার হিসেবে পরিচিত। তিনি একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, কিন্তু নানা কারণে পরিবারের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে তাঁর পরাজয় আরও ভয়াবহ—এক লাখ এক হাজার ভোটে! সেই নির্বাচনে বিএনপির একজন বড়মাপের প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন রাতে দলের নির্দেশে চোখের জল ফেলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তিন বছরের শেষ দিনটিতে সর্বশেষ বিপর্যয় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আফজাল খান পরাজিত হলেন বিএনপি থেকে অব্যাহতি নেওয়া মনিরুল হকের কাছে। আফজাল খান এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে এলাকার মানুষের ধারণা মোটেও সুখকর নয়। এই তিনটি নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেছি। এলাকার একাধিক মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি এবং অবাক করার কাণ্ড হচ্ছে—তিনটি ক্ষেত্রে আগেই খবর পেয়েছি, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পরাজর নিশ্চিত; যদিও চট্টগ্রামের পরাজয়টার জন্য ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। জনগণ ঠিকই উপলব্ধি করেছে কী হতে যাচ্ছে, পারেনি দল ও প্রার্থী নিজেরা। আর পারলেও এটাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তিনটি নির্বাচনেই শোচনীয় পরাজয়ের পেছনে অনেক কারণ আছে; তবে একটি অন্যতম অভিন্ন কারণ হচ্ছে, দলের অভ্যন্তরে ভয়াবহ কোন্দল।
অন্য দুটি জেলার কথা সবিস্তারে বলতে না পারলেও এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোন্দল যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তাতে এই শহরে দলের ভবিষ্যৎ যে তমসাচ্ছন্ন, তা বলার জন্য বড়মাপের কোনো বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পড়বে না।
নতুন বছরের শুরুতে বিভিন্ন গণমাধ্যম সরকারের গত এক বছরের সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিয়ে দৈবচয়নভিত্তিক একাধিক জরিপ প্রকাশ করে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত তিন বছরে প্রতিবছরই তা হয়েছে এবং এটি একটি ভালো, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। উন্নত বিশ্বে এমন জরিপ নিয়মিত করা হয় এবং সরকার এটাকে গুরুত্বসহকারে নেয়। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি চালু হয়েছে ইদানীং। যদিও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত এমন জরিপ করে বলে জানা যায়; তবে সরকারি জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু থাকে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, সরকারি জরিপে সরকার যা শুনতে চায়, সাধারণত তা-ই শোনানো হয় এবং সর্বনাশের প্রথম বীজটা তখনই বপিত হয়। গত তিন বছরের জরিপে দেখা গেছে, আগের জরিপের চেয়ে পরের জরিপে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষ বেশি অসন্তুষ্ট ও হতাশ হয়েছে। তবে এখানে বলে নেওয়া ভালো, এ ধরনের জরিপ সাধারণত জনগণের ধারণার ওপর নির্ভরশীল এবং সেই ধারণা নানা কারণে গঠিত হয় ও দ্রুততম সময়ে তা দূরও হতে পারে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের সরকার নিয়ে প্রথম তিন বছর জনমনে তেমন একটা অসন্তুষ্টি ছিল না। চর্তুথ বছরে এসে সাধারণ মানুষ সরকার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। দূরে সরে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল আওয়ামী লীগের কিছু অর্বাচীন দলীয় সংসদ সদস্য, নেতা-কর্মী এবং তাঁদের পুত্রদের লাগামহীন দুর্বৃত্তপনা। শুনতে খারাপ লাগেলও এটি স্বীকার করতেই হবে, দলের নীতিনির্ধারকেরা তা সময় মতো বুঝতে পারেননি অথবা বুঝলেও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তৎপর ছিলেন না। শেষ পরিণতি অবধারিতভাবে নির্বাচনে বিপর্যয়। তবে, বর্তমান সরকারের সময় এখন পর্যন্ত এ ধরনের কর্মকাণ্ড তেমন একটা চোখে না পড়লেও তাদের সেই শূন্যতা পূরণ করছে ছাত্রলীগ নামের একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত, যাদের সর্বশেষ বলি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ।
আগেও বলেছি, আবারও বলি, মনে হয়, আগেরবারের তুলনায় এখন শেখ হাসিনা অনেক বেশি সাহসী। আগের মেয়াদের প্রথম তিন বছর তো চলেই গিয়েছিল জড়তা ভাঙতে। এবার তো তেমনটি হওয়ার কোনো কারণ নেই। এর ওপর এবারের যাত্রায় আওয়ামী লীগকে সাধারণ মানুষ যে বিশাল সমর্থন দিয়েছে, তাতে তো বর্তমান সরকার পুরো বাংলাদেশের চেহারাই পাল্টে দিতে পারে—তার পরও কেন জনগণ থেকে সরকার দূরে সরে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন জরিপে বলছে? এটি বলতেই হয়, এই সরকারে আমলে দেশের উন্নয়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে বেশ কিছু উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। কৃষি, শিক্ষা, জঙ্গিবাদ দমন, খাদ্যনিরাপত্তা, ডিজিটাল বাংলাদেশে গড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন (ব্যয় নিয়ে বিতর্ক আছে) মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনেক যুগান্তকারী কাজ হয়েছে। বাস্তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রভাবিত করে, তেমন সব ব্যাষ্টিক বিষয়গুলোই মানুষের ধারণাকে পরিচালিত করতে সহায়তা করে। মনে করি, কোনো এক জাদুমন্ত্র বলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য অর্ধেকে নেমে এল (বাস্তবে তেমটি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বিরোধী দল তা নিয়ে যতই মাঠ গরম করুক) এবং এটাকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখা গেল, তখন দেখা যাবে, সাধারণ মানুষের কাছে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ পদ্মার ওপর সেতু চায়, নতুন বিমানবন্দর চায়, চোখ-ধাঁধানো সব ফ্লাইওভার, পাতাল রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চায়, যানজটমুক্ত ঢাকা চায়—তবে সবার আগে পেট পুরে ডাল-ভাত খেতে চায়, জীবনের নিরাপত্তা চায়, বাচ্চার জন্য ন্যূনতম শিক্ষা চায়, নিজে ও পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা চায়, মাথা গোঁজার ঠাঁই চায়। এগুলোই তার নিত্যদিনের চাহিদা। এগুলো যে সরকারই পূরণ করতে পারে, সেই সরকারকে জনগণের সমর্থন না করার কোনো কারণ নেই। এ কাজগুলো একেবারে শতভাগ পূরণ করা যাবে, তা-ও সত্য নয়। তবে, সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যেসব চরম অদক্ষতা, অপরিণামদর্শিতা ও অসংগতি আছে, তা দূর করা গেলে এবং যেগুলো করা গেল না, কেন গেল না, তা জনগণকে বোঝানো গেলে, জনগণ না বোঝার কোনো কারণ নেই।
বর্তমান সরকারের সমালোচনার একটি বড় বিষয় হচ্ছে, শুরু থেকেই সরকার সব ক্ষেত্রে যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেদিন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁর দৃষ্টিতে বর্তমান সরকার কোন জায়গায় দুর্বল। উত্তরে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্য লোকের অভাব। কথাটা মোটেও ঠিক নয়। কেমন করে জানি অনেক অপদার্থ মানুষ বর্তমান সরকারের আমলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঠাঁই করে নিয়েছে। আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এই অপদার্থরা আবার সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে অজ্ঞাত কারণে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিছু মন্ত্রীর লাগামহীন কথাবার্তা, একজন আবুল হোসেন বা শাজাহান খান গত জরিপে কতটুকু অবদান রেখেছেন, তা যদি জানা যেত, তাহলে স্বাভাবিক কারণেই সবাই আঁতকে উঠত। সরকার কিন্তু এ ব্যাপারে দারুণ উদাসীন বলে মনে হয়। এবারের জরিপ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম তাঁর প্রতিক্রিয়ায় এই জরিপের সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, এসব জরিপ তেমন কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। ইমাম সাহেব ঠিকই জানেন, এটি তাঁর মনের কথা নয়। তবে তাঁর মতো ব্যক্তিদের সুবিধা হচ্ছে, সরকার বা দলের বিপর্যয় ঘটলে তাঁদের অধিকাংশকেই দেশে পাওয়া যাবে না।
কিছুটা হলেও সরকার এবং আওয়ামী লীগের জন্য এই সময়টা নাজুক। এ অবস্থা থেকে পার পেতে হলে কী করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা কিছুটা ধৃষ্টতা আর ঔদ্ধত্যের শামিল। তবে সাহস করে একটি শব্দ দিয়ে এর উত্তর দিতে চাই, আর তা হচ্ছে, শেখ হাসিনার যে সাহসের কথা সবাই বলেন, সেই সাহসটা এবার ঘরের পরিস্থিতি সামাল দিতে দেখাতে হবে। দেশ ও দলের ভালোর স্বার্থে কোনো ব্যক্তিকে অপরিহার্য মনে না করে দ্রুততম সময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের ছেঁটে ফেলে শেষ দুই বছর শুরু করা হোক। ধরে নিতে হবে, ২০১৪ সালে নির্বাচনের ক্ষণগণনা এখন থেকেই শুরু হয়েছে। ভুললে চলবে না, এখন শুধু দলের অন্ধভক্তদের সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়া সম্ভব নয়। গত নির্বাচনে দেড় কোটি নতুন ভোটার ভোট দিয়েছে। আগামী নির্বাচনে তাদের সঙ্গে কমপক্ষে আরও এক কোটি যোগ হবে। এরাই আসলে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক। এদের অনেকেই শিক্ষিত, আধুনিক মনোভাবপন্ন, অনেক বেশি সচেতন এবং ওয়াকিবহাল। এরা শুধু মার্কা দেখে ভোট দেবে না। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তা প্রমাণিত। এই নতুন প্রজন্ম ভুল করবে না। মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণা নিয়ে যদি একবিংশ শতকের দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার কথা চিন্তা করা হয়, তাহলে তা হবে এক বিরাট আত্মঘাতী ভুল। বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ জনগণকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সময় শুরু হয়েছে সেসব প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব হলো তার হিসাব করা এবং যা সম্ভব হয়নি, তা কেন হয়নি—এটা জনগণকে যত্ন করে বোঝানো। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আওয়ামী লীগ বা বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি বা আমার মতো অনেকেই কেন চিন্তিত? এর একটাই কারণ, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পরে দেশে যেভাবে নরক গুলজার আর বেপরোয়া লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, কয়েক হাজার মানুষ ঘরছাড়া ও দেশছাড়া হয়েছিল, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত—তেমন একটা অবস্থায় দেশ আবার ফিরে যেতে চায় না।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
সরকারে তিন বছর যখন আসি আসি করছে, তখন দ্বিতীয় বিপর্যয়টা ঘটল নারায়ণগঞ্জে। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে পরাজিত হলেন দল-সমর্থিত প্রার্থী শামীম ওসমান, যিনি তাঁর এলাকায় একজন গডফাদার হিসেবে পরিচিত। তিনি একটি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান, কিন্তু নানা কারণে পরিবারের সুনাম অক্ষুণ্ন রাখতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে তাঁর পরাজয় আরও ভয়াবহ—এক লাখ এক হাজার ভোটে! সেই নির্বাচনে বিএনপির একজন বড়মাপের প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু নির্বাচনের আগের দিন রাতে দলের নির্দেশে চোখের জল ফেলে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তিন বছরের শেষ দিনটিতে সর্বশেষ বিপর্যয় কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে যখন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আফজাল খান পরাজিত হলেন বিএনপি থেকে অব্যাহতি নেওয়া মনিরুল হকের কাছে। আফজাল খান এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে এলাকার মানুষের ধারণা মোটেও সুখকর নয়। এই তিনটি নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেছি। এলাকার একাধিক মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি এবং অবাক করার কাণ্ড হচ্ছে—তিনটি ক্ষেত্রে আগেই খবর পেয়েছি, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পরাজর নিশ্চিত; যদিও চট্টগ্রামের পরাজয়টার জন্য ব্যক্তিগতভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। জনগণ ঠিকই উপলব্ধি করেছে কী হতে যাচ্ছে, পারেনি দল ও প্রার্থী নিজেরা। আর পারলেও এটাকে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। তিনটি নির্বাচনেই শোচনীয় পরাজয়ের পেছনে অনেক কারণ আছে; তবে একটি অন্যতম অভিন্ন কারণ হচ্ছে, দলের অভ্যন্তরে ভয়াবহ কোন্দল।
অন্য দুটি জেলার কথা সবিস্তারে বলতে না পারলেও এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোন্দল যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তাতে এই শহরে দলের ভবিষ্যৎ যে তমসাচ্ছন্ন, তা বলার জন্য বড়মাপের কোনো বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন পড়বে না।
নতুন বছরের শুরুতে বিভিন্ন গণমাধ্যম সরকারের গত এক বছরের সাফল্য এবং ব্যর্থতা নিয়ে দৈবচয়নভিত্তিক একাধিক জরিপ প্রকাশ করে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত তিন বছরে প্রতিবছরই তা হয়েছে এবং এটি একটি ভালো, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ। উন্নত বিশ্বে এমন জরিপ নিয়মিত করা হয় এবং সরকার এটাকে গুরুত্বসহকারে নেয়। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি চালু হয়েছে ইদানীং। যদিও সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত এমন জরিপ করে বলে জানা যায়; তবে সরকারি জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা কতটুকু থাকে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কারণ, সরকারি জরিপে সরকার যা শুনতে চায়, সাধারণত তা-ই শোনানো হয় এবং সর্বনাশের প্রথম বীজটা তখনই বপিত হয়। গত তিন বছরের জরিপে দেখা গেছে, আগের জরিপের চেয়ে পরের জরিপে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাধারণ মানুষ বেশি অসন্তুষ্ট ও হতাশ হয়েছে। তবে এখানে বলে নেওয়া ভালো, এ ধরনের জরিপ সাধারণত জনগণের ধারণার ওপর নির্ভরশীল এবং সেই ধারণা নানা কারণে গঠিত হয় ও দ্রুততম সময়ে তা দূরও হতে পারে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের সরকার নিয়ে প্রথম তিন বছর জনমনে তেমন একটা অসন্তুষ্টি ছিল না। চর্তুথ বছরে এসে সাধারণ মানুষ সরকার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে। দূরে সরে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল আওয়ামী লীগের কিছু অর্বাচীন দলীয় সংসদ সদস্য, নেতা-কর্মী এবং তাঁদের পুত্রদের লাগামহীন দুর্বৃত্তপনা। শুনতে খারাপ লাগেলও এটি স্বীকার করতেই হবে, দলের নীতিনির্ধারকেরা তা সময় মতো বুঝতে পারেননি অথবা বুঝলেও এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে তৎপর ছিলেন না। শেষ পরিণতি অবধারিতভাবে নির্বাচনে বিপর্যয়। তবে, বর্তমান সরকারের সময় এখন পর্যন্ত এ ধরনের কর্মকাণ্ড তেমন একটা চোখে না পড়লেও তাদের সেই শূন্যতা পূরণ করছে ছাত্রলীগ নামের একশ্রেণীর দুর্বৃত্ত, যাদের সর্বশেষ বলি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ।
আগেও বলেছি, আবারও বলি, মনে হয়, আগেরবারের তুলনায় এখন শেখ হাসিনা অনেক বেশি সাহসী। আগের মেয়াদের প্রথম তিন বছর তো চলেই গিয়েছিল জড়তা ভাঙতে। এবার তো তেমনটি হওয়ার কোনো কারণ নেই। এর ওপর এবারের যাত্রায় আওয়ামী লীগকে সাধারণ মানুষ যে বিশাল সমর্থন দিয়েছে, তাতে তো বর্তমান সরকার পুরো বাংলাদেশের চেহারাই পাল্টে দিতে পারে—তার পরও কেন জনগণ থেকে সরকার দূরে সরে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন জরিপে বলছে? এটি বলতেই হয়, এই সরকারে আমলে দেশের উন্নয়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে বেশ কিছু উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে। কৃষি, শিক্ষা, জঙ্গিবাদ দমন, খাদ্যনিরাপত্তা, ডিজিটাল বাংলাদেশে গড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন (ব্যয় নিয়ে বিতর্ক আছে) মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনেক যুগান্তকারী কাজ হয়েছে। বাস্তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রভাবিত করে, তেমন সব ব্যাষ্টিক বিষয়গুলোই মানুষের ধারণাকে পরিচালিত করতে সহায়তা করে। মনে করি, কোনো এক জাদুমন্ত্র বলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য অর্ধেকে নেমে এল (বাস্তবে তেমটি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, বিরোধী দল তা নিয়ে যতই মাঠ গরম করুক) এবং এটাকে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত ধরে রাখা গেল, তখন দেখা যাবে, সাধারণ মানুষের কাছে এই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ পদ্মার ওপর সেতু চায়, নতুন বিমানবন্দর চায়, চোখ-ধাঁধানো সব ফ্লাইওভার, পাতাল রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে চায়, যানজটমুক্ত ঢাকা চায়—তবে সবার আগে পেট পুরে ডাল-ভাত খেতে চায়, জীবনের নিরাপত্তা চায়, বাচ্চার জন্য ন্যূনতম শিক্ষা চায়, নিজে ও পরিবারের জন্য স্বাস্থ্যসেবা চায়, মাথা গোঁজার ঠাঁই চায়। এগুলোই তার নিত্যদিনের চাহিদা। এগুলো যে সরকারই পূরণ করতে পারে, সেই সরকারকে জনগণের সমর্থন না করার কোনো কারণ নেই। এ কাজগুলো একেবারে শতভাগ পূরণ করা যাবে, তা-ও সত্য নয়। তবে, সার্বিক ব্যবস্থাপনায় যেসব চরম অদক্ষতা, অপরিণামদর্শিতা ও অসংগতি আছে, তা দূর করা গেলে এবং যেগুলো করা গেল না, কেন গেল না, তা জনগণকে বোঝানো গেলে, জনগণ না বোঝার কোনো কারণ নেই।
বর্তমান সরকারের সমালোচনার একটি বড় বিষয় হচ্ছে, শুরু থেকেই সরকার সব ক্ষেত্রে যোগ্য লোক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সেদিন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁর দৃষ্টিতে বর্তমান সরকার কোন জায়গায় দুর্বল। উত্তরে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগ্য লোকের অভাব। কথাটা মোটেও ঠিক নয়। কেমন করে জানি অনেক অপদার্থ মানুষ বর্তমান সরকারের আমলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ঠাঁই করে নিয়েছে। আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, এই অপদার্থরা আবার সরকারের নীতিনির্ধারকদের কাছে অজ্ঞাত কারণে অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কিছু মন্ত্রীর লাগামহীন কথাবার্তা, একজন আবুল হোসেন বা শাজাহান খান গত জরিপে কতটুকু অবদান রেখেছেন, তা যদি জানা যেত, তাহলে স্বাভাবিক কারণেই সবাই আঁতকে উঠত। সরকার কিন্তু এ ব্যাপারে দারুণ উদাসীন বলে মনে হয়। এবারের জরিপ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও সরকারের একজন প্রভাবশালী উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম তাঁর প্রতিক্রিয়ায় এই জরিপের সমালোচনা করেছেন এবং বলেছেন, এসব জরিপ তেমন কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক নয়। ইমাম সাহেব ঠিকই জানেন, এটি তাঁর মনের কথা নয়। তবে তাঁর মতো ব্যক্তিদের সুবিধা হচ্ছে, সরকার বা দলের বিপর্যয় ঘটলে তাঁদের অধিকাংশকেই দেশে পাওয়া যাবে না।
কিছুটা হলেও সরকার এবং আওয়ামী লীগের জন্য এই সময়টা নাজুক। এ অবস্থা থেকে পার পেতে হলে কী করতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা কিছুটা ধৃষ্টতা আর ঔদ্ধত্যের শামিল। তবে সাহস করে একটি শব্দ দিয়ে এর উত্তর দিতে চাই, আর তা হচ্ছে, শেখ হাসিনার যে সাহসের কথা সবাই বলেন, সেই সাহসটা এবার ঘরের পরিস্থিতি সামাল দিতে দেখাতে হবে। দেশ ও দলের ভালোর স্বার্থে কোনো ব্যক্তিকে অপরিহার্য মনে না করে দ্রুততম সময়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের ছেঁটে ফেলে শেষ দুই বছর শুরু করা হোক। ধরে নিতে হবে, ২০১৪ সালে নির্বাচনের ক্ষণগণনা এখন থেকেই শুরু হয়েছে। ভুললে চলবে না, এখন শুধু দলের অন্ধভক্তদের সমর্থন দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়া সম্ভব নয়। গত নির্বাচনে দেড় কোটি নতুন ভোটার ভোট দিয়েছে। আগামী নির্বাচনে তাদের সঙ্গে কমপক্ষে আরও এক কোটি যোগ হবে। এরাই আসলে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক। এদের অনেকেই শিক্ষিত, আধুনিক মনোভাবপন্ন, অনেক বেশি সচেতন এবং ওয়াকিবহাল। এরা শুধু মার্কা দেখে ভোট দেবে না। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তা প্রমাণিত। এই নতুন প্রজন্ম ভুল করবে না। মান্ধাতা আমলের ধ্যানধারণা নিয়ে যদি একবিংশ শতকের দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার কথা চিন্তা করা হয়, তাহলে তা হবে এক বিরাট আত্মঘাতী ভুল। বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ জনগণকে অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সময় শুরু হয়েছে সেসব প্রতিশ্রুতির কতটুকু বাস্তবায়ন সম্ভব হলো তার হিসাব করা এবং যা সম্ভব হয়নি, তা কেন হয়নি—এটা জনগণকে যত্ন করে বোঝানো। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, আওয়ামী লীগ বা বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি বা আমার মতো অনেকেই কেন চিন্তিত? এর একটাই কারণ, ১৯৯১ ও ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের পরে দেশে যেভাবে নরক গুলজার আর বেপরোয়া লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল, কয়েক হাজার মানুষ ঘরছাড়া ও দেশছাড়া হয়েছিল, যা বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত—তেমন একটা অবস্থায় দেশ আবার ফিরে যেতে চায় না।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
No comments