জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যাম্পাসে হত্যা-সন্ত্রাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দায় by রায়হান রাইন

প্রতিষ্ঠার পর থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যতগুলো ছাত্রহত্যা হয়েছে, যতদূর জানা গেল, কেউই সেই সব খুনের দায়ে সাজা ভোগ করেননি। খোদ প্রশাসন যেন একেকটি খুনের দায়দায়িত্বকে নিজের ভেতরে গুম করে ফেলেছে। নিহত কবীর, দীপু বা আনন্দর অমীমাংসিত মৃত্যু অনন্তের গহ্বরে হারিয়ে গেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই নৃশংসভাবে খুন হলেন জুবায়ের আহমেদ।


ইংরেজি বিভাগের স্নাতক চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি, চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা শেষ করে সবে পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়েছেন, তখন ছাত্রলীগের একদল সন্ত্রাসী তাঁকে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অনেকেই অনুমান করছেন, এই হত্যাকাণ্ডটির দায়দায়িত্বও বিশ্ববিদ্যালয় গুম করে ফেলবে। এমন অলক্ষুনে আন্দাজকে আমরা বিশ্বাস করতে চাই না, মাথায় আনতেও চাই না। শুধু এই প্রশ্নটার সুলুক-সন্ধান করতে চাই যে ঠিক কী কারণে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হত্যাকারীদের জন্য অভয়ারণ্য হয়ে উঠল, ঠিক কী রকম একটা ব্যবস্থায় এই স্থানটি হত্যার দায়কে নিজের গহ্বরে শুষে নেয়?
রাষ্ট্রের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ক্রসফায়ার বা গুম-খুনের ঘটনাগুলোকে আমলে আনলে একটা দিশা পাওয়া যেতে পারে। এখানে হত্যাকারী এবং আদালতের মাঝখানে দাঁড়ানো ক্ষমতাধর একটা প্রতিষ্ঠান, যে প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে হত্যার দায়দায়িত্ব হজম করে ফেলার উপযোগী একটা নিয়মতন্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হত্যাকাণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে এই মধ্যবর্তী পক্ষটি হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। স্বায়ত্তশাসিত হওয়ার কারণে এর ধরন-ধারণ অনেকটাই রাষ্ট্রের মতো, এই প্রতিষ্ঠানে নিহিত ক্ষমতা একটা হত্যাকাণ্ডের পর ভূমিকা রাখে হত্যার দায়মুক্তিতে। প্রশ্ন উঠবে, প্রশাসন কেন হত্যাকারীর পক্ষ নেবে, তার জরুরত কী? লক্ষ করলে আমরা দেখব, খুন, ধর্ষণসহ যাবতীয় নিপীড়নের সঙ্গে ক্ষমতার যোগ আছে এবং অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার একটা জুতসই ব্যবস্থা করে দেওয়া আছে। নির্বাচিত প্যানেলে থাকলেও সরকারি আশীর্বাদ ছাড়া কেউ উপাচার্য হতে পারেন না। আর বর্তমানে উপাচার্য নির্বাচনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটিও রদ হয়ে গেছে প্রায়। উপাচার্যকে এখন নিয়োগ দেওয়া হয়। ইউজিসি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় যে কৌশলপত্র দিয়েছে, তার বাস্তবায়ন হলে স্বায়ত্তশাসনের কোনো বৈশিষ্ট্যই আর অবশিষ্ট থাকবে না। সার্চ কমিটি যখন উপাচার্য খুঁজে আনে তখন সেই উপাচার্যের ক্ষমতার আয়ু আসে দল থেকে। একইভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকাও নির্ভর করে দলীয় শক্তির ওপর। এ কারণে সরকারি দলের পাশাপাশি দলীয় ছাত্র সংগঠনও ক্রমশ ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ক্ষমতার পুচ্ছধারী সন্ত্রাসীদের মধ্যেও আছে আধিপত্য বিস্তার এবং সুবিধা বিলি-বণ্টনকেন্দ্রিক দল-উপদল। এ অবস্থায় এমন একটা কাঠামো ক্রমশ তৈরি হয়েছে যে উপাচার্য নিজেই এখন সরাসরি দলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেন, কোন দল ক্যাম্পাসে থাকবে, কোন দলকে বিতাড়িত করা হবে, এসব তিনি নিজেই ঠিক করেন। এভাবে উপাচার্যের আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রসংগঠনের অপরাধের দায়মুক্তির ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। হত্যার দায় থেকে বাঁচার আরও ক্ষেত্র তৈরি করে অপরাধের দলীয় অংশীদারি। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন যখন হত্যাকাণ্ড ঘটায় তখন ওই পন্থী শিক্ষকেরা মিনমিনে কণ্ঠে দায়সারা একটা শোকবার্তা দেন। এ ছাড়া আর কোনো ভূমিকাই থাকে না তাঁদের। অপরাধের দলীয় অংশীদারি অপরাধকে থিতিয়ে ফেলে। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, দেশজুড়েই অপরাধ অনুমোদনের এই ক্রমবন্ধন অবাধ। যেকোনো দলীয় অপরাধকে অন্যরা নিজেদের করে নিতে থাকেন। এ অবস্থায় কারও অপরাধ ধরা পড়লে তাঁর দলীয় ঊর্ধ্বতন বলতে থাকেন, ‘ঠিক আছে, আমি দেখছি’। তাঁর ঊর্ধ্বতন বলবেন, ‘সমস্যা নাই, আমি দেখছি’। এভাবে অপরাধ অনুমোদনের ঊর্ধ্বমুখী গতিটি অবাধ হওয়ায় ক্ষমতার সবগুলো এলাকা অপরাধ সংঘটনকারীর সশস্ত্র দুই হাত থেকে ওপর-নিচ সবগুলো তল পর্যন্ত তৎপর হয়ে অপরাধকে নিস্ক্রিয় করে দেয়।
জানা গেছে, নিহত জুবায়ের ছাত্রলীগের যে দলের কর্মী ছিলেন সেই দলকে বিতাড়িত করা হয়েছিল ক্যাম্পাস থেকে। তখন কথিত ‘ভিসি-গ্রুপ’কে প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তুলে দেওয়া হয় হলগুলোতে। জুবায়েরের হত্যাকারীরা হলে প্রতিষ্ঠিত এই দলেরই কর্মী-সন্ত্রাসী। এদের প্রতিপক্ষ দলকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়নে উপাচার্যের ভূমিকা যেমন প্রত্যক্ষ, এদের প্রতি তেমনি উপাচার্যের আনুকূল্যও অপরিসীম। যেমন হত্যাকাণ্ডে ১০-১২ জনের একটা দল অংশ নিলেও উপাচার্য আমলে নিয়েছেন মাত্র তিনজনকে। হয়তো এই তিনজনের গুরুত্ব তাঁর কাছে খুবই কম। তবে এদের প্রতিও স্নেহ তাঁর কম ছিল না। অননুমোদিতভাবে ক্যাম্পাসের পুকুরে মাছ ধরার কারণে যে শাস্তি দেওয়া হয়, এই তিনজনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সে রকমই শাস্তি দিয়েছে, এক বছরের সাময়িক বহিষ্কার। গুরুপাপে লঘুদণ্ডের এই ঘটনা এতটাই হাস্যকর এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে উপাচার্য বেগতিক অবস্থাটি বুঝতে পারেন। তিনি নিজ ক্ষমতায় তড়িঘড়ি করে অফিস আদেশ জারি করে এই সাময়িক বহিষ্কৃতদের আজীবন বহিষ্কার করেন। বাকিরা থেকে গেল নিরাপদে। এই বহিষ্কৃত তিনজনের সবাইকে ধরেওনি পুলিশ। অপরাধ সংঘটনের উৎসাহ কেবল যে উপাচার্যের স্নেহশীল আচরণের কারণে ঘটছে তা-ই শুধু নয়, স্বয়ং উপাচার্যকে তারা মডেল হিসেবে দেখে। সন্ত্রাসীরা উপাচার্যকে যৌন নিপীড়কের পক্ষ নিতে দেখে, তারা দেখে ক্যাম্পাসবাসীর প্রবল সামাজিক প্রতিরোধকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে উপাচার্য কীভাবে বৃক্ষনিধন করেন, নিজ দলের বাইরে থাকা শিক্ষকদের কীভাবে তিনি প্রতি পদে বিপদগ্রস্ত করেন, চাকরিচ্যুত করেন, মেধাহীন প্রার্থীকে শিক্ষক বানিয়ে নিজের ক্ষমতা জাহির করেন। স্বয়ং উপাচার্যের যুদ্ধংদেহী মনোভাবকেই তাঁর অনুগত সন্ত্রাসীরা ধারণ করে থাকবে।
জুবায়েরকে হত্যা করা হয়েছে অত্যন্ত নৃশংসভাবে। রড এবং চাপাতি দিয়ে ঘণ্টাখানেক সময় ধরে আঘাত করা হয়েছে তাঁর শরীরে। চামড়ার ওপর থেকে আঘাত পৌঁছে গেছে ফুসফুস অবধি। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে নয়, খুব ঠান্ডা মাথায় এত দীর্ঘ সময় ধরে আঘাতে আঘাতে কাউকে মৃত্যুর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার স্নায়ুবিক সামর্থ্য তারা পেল কোথায়? সহসাই তো অর্জন করা যায় না এমন সামর্থ্য। এ জন্য তাদের নিয়মিত মারধরে অংশ নিতে হয়েছে, তাড়া করে প্রতিপক্ষকে দোতলা থেকে ফেলে দিয়ে উল্লাস করতে হয়েছে, নিয়মিত শোডাউনে অংশ নিয়ে ইভটিজিং করতে হয়েছে, র‌্যাগিংয়ে নবাগত ছাত্রদের নির্যাতন করে সেসব উপভোগ করতে হয়েছে। নৃশংস নিপীড়ন এবং নির্মমভাবে হত্যার স্নায়ুবিক ও মানসিক সামর্থ্য হয়তো এভাবেই তৈরি হয়েছে ক্রমশ।
ক্ষমতার সঙ্গে সহিংসতা, হত্যা—এসবের এখন যেন এক অনিবার্য সম্পর্ক সৃষ্টি হয়ে গেছে। কারও মৃত্যুর ওপর নিজেদের আস্ফাালনকে দাঁড় করানোই যেন সবচেয়ে বড় ক্ষমতার চিহ্ন। এই চিহ্ন ছাড়া ক্ষমতা এবং ক্ষমতার দম্ভকে প্রকাশই করা যায় না। এ জন্যই কি ক্ষমতা সব সময় মানুষের মৃত্যুকে শিকার করে? চারপাশে নিপীড়ন অপরাধ দেখতে দেখতে মানুষ যখন খুব নির্লিপ্ত হয়ে পড়ে, নৃশংস হত্যাও তাদের যখন আর বিচলিত করে না এমন অবস্থাতেই হয়তো কোনো দুঃসাহসী প্রতিবাদকারী নিজের শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। তবে আমরা জুবায়ের হত্যাকাণ্ডের পর ক্যাম্পাসের বড় একটা অংশকে দ্রোহের আগুনে জ্বলতে দেখছি, তাঁরা নির্লিপ্ত না থেকে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন, রাষ্ট্রীয় আইনে সব হত্যাকারীর বিচার চাইছেন। একই সঙ্গে এ রকম অপরাধের জমি প্রস্তুতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুকূল ব্যবস্থা তাঁর বিরুদ্ধে সৃষ্টি করছেন প্রয়োজনীয় সামাজিক আন্দোলন।
রায়হান রাইন: শিক্ষক, দর্শন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.