দিতে হবে বীরের মর্যাদা by রেহানা পারভীন রুমা

রমানীটোলার এক বাড়িতে দেখতে পাই দশ-এগারো বছরের স্বাস্থ্যবতী একটি মেয়ে। ফুটফুটে। ফর্সা গায়ের রঙ। মেয়েটির সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে। সারা গায়ে জমাট বাঁধা রক্ত। কয়েক জায়গায় মাংস খুবলে নেওয়া হয়েছে। নরপশুরা মেয়েটিকে ধর্ষণ শেষে দুদিক থেকে পা ধরে টেনে নাভি পর্যন্ত ছিঁড়ে ফেলেছে।' সাহেব আলী নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী একাত্তরের হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতার ভয়াল দৃশ্য স্মরণ করে যখন এভাবে স্মৃতিচারণ


করতে থাকেন, তখন আতঙ্কে সারা শরীর শিউরে ওঠে আমাদের। মনে হয় চিৎকার করে উঠি। শাঁখারীপট্টির সেই মেয়েটির খোলা চোখ কি আমাদের তাড়া করে না? করে, কারণ ততক্ষণে আমাদের জানা হয়ে যায়_ এ কোনো অবোধ বন্য পশুর আক্রমণ নয়, একাত্তরে মানুষরূপী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বর আচরণের একটি উদাহরণ মাত্র। ৯ মাস ধরে পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশের নারীদের ওপর যে জঘন্য ও বীভৎস অত্যাচার চালিয়েছে, এত বছর পরও তার বর্ণনা শুনলে বা পড়লে কোনো মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নয়।
৪০ বছরে পা রাখল আমাদের স্বাধীনতা। যুদ্ধশিশু বলতে অচেনা যেসব মানুষের কথা মনে পড়ত তারাও এখন যৌবনের শেষ প্রান্তে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের চিহ্ন শরীরে নিয়ে এখনও অনেক নারী গোপন যন্ত্রণা বহন করে জীবন যাপন করে চলেছেন। অনেকে অপমান সয়ে চলে গেছেন নিভৃতে। চলি্লশ বছর কম সময় তো নয়। স্বাধীনতার পর 'বীরঙ্গনা' নামে অভিহিত এসব নারী হারিয়ে গেছেন, মিশে গেছেন জনারণ্যে। স্বাধীনতার পর আমরা তাদের অবদান, বিসর্জনটাকে ঠিকমতো শ্রদ্ধাও জানাতে পারিনি। অভিমান করে সরিয়ে নিয়েছিলেন নিজেদের। আর সেই সঙ্গে হারিয়ে গিয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধে নারীর অবদানের এক মর্মান্তিক ইতিহাস। যে ইতিহাস স্বীকৃতি পেলে হয়তো বদলে দিতে পারত এ দেশের নারীর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। তাদের আত্মত্যাগ বীরত্বে বদলে যেত।
একাত্তরের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটের নামে রাতভর বাঙালি নিধন উৎসবে মেতে উঠেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ৯ মাসে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে গ্রামে, গঞ্জে, শহরে মানুষের সেই নিধনযজ্ঞে দানব হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি সেনারা। সঙ্গে জুটেছিল তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস। যুদ্ধের ৯ মাসেই সবকিছু বিসর্জন দিতে হয়েছে এ দেশের সাধারণ মানুষকে। নারীকে দিতে হয়েছে চরম মূল্য। সুপরিকল্পিতভাবে আঁকা হয়েছিল নারী নির্যাতনের কলাকৌশল। তৈরি হয়েছিল বিকৃত লালসা চরিতার্থ করার জন্য কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। স্বামী, সন্তান, ভাই যুদ্ধে গেছে_ এমন নারীদের ধরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো সেসব ক্যাম্পে। আর সে কাজটি অবলীলায় করত পাকিস্তানি বাহিনীর এ দেশীয় দোসররা। নারীর প্রতি পাশবিক নির্যাতনের মাধ্যমে একটা জাতিকে মানসিকভাবে আহত, পঙ্গু করে দেওয়ার নকশা এঁকেছিল হানাদাররা। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এখনও বুক কেঁপে ওঠে আমাদের। এখানেই শহরের স্কুল, কলেজ, অভিজাত এলাকার মেয়েদের এনে বন্দি করে রাখত পাষণ্ডরা। উলঙ্গ করে পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে তাদের ওপর চালানো হতো বর্বরতম পাশবিকতা। ধর্ষণের মতো জিঘাংসায় উন্মত্ত পাকিস্তানি সেনারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৯ মাসে সভ্যতার যে কলঙ্কিত অধ্যায় রচনা করেছিল তার নজির ইতিহাসে খুব কমই পাওয়া যায়।
সিদ্দিক সালিকের 'উইটনেস টু সারেন্ডার' গ্রন্থেও নিয়াজির নারী লোলুপতার প্রমাণ পাওয়া যায়। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টেও রয়েছে তার শত শত নারী নিপীড়নের কাহিনী। অফিসার থেকে নিম্ন পর্যায়ের সৈন্যরা পর্যন্ত মেতে উঠেছিল এই ধর্ষণযজ্ঞে। নিজেদের লালসা মিটিয়ে এসব মেয়েদের তারা তুলে দিত তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে পুনরায় ধর্ষণ ও হত্যার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের একটা বড় অংশজুড়ে ছিল স্পট ধর্ষণ। পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন এলাকায় হামলার সময় পুরুষদের হত্যা করলেও নারীদের সর্বসমক্ষে ধর্ষণের শিকার হতে হয়েছে। খড়ের গাদা, ঘরের মাচা, পুকুরের পানিতে ডুবিয়ে রেখেও মেয়েদের রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, একাত্তরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শেষদিক থেকে সচেতনভাবেই স্পট রেপ শুরু করে পাকিস্তানি সেনারা। বিজয় লাভের আগ পর্যন্ত চলে এই ধর্ষণ, গণধর্ষণ। একই সঙ্গে এথনিক ক্লিনজিংয়ের নামে ধর্মের দোহাই দিয়ে হিন্দুসহ সংখ্যালঘু নারীদের ধর্ষণ ও তাদের গর্ভে ইসলামের বীজ বপনের মতো অমানবিক কার্যকলাপ চালিয়েছে পাক সেনারা।
১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীনের পর বিভিন্ন স্থানের পাকিস্তানি সেনাদের ঘাঁটি থেকে উদ্ধার করা হয় হাজার হাজার অসুস্থ, মানসিক বিকারগ্রস্ত নির্যাতিত নারীকে। বিভিন্ন গণকবর থেকে বেরিয়ে আসে বীভৎস নির্যাতিত নারীদের মৃতদেহ। বিশ্বজুড়ে সব যুদ্ধে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির নাৎসি বাহিনী, ইতালির ফ্যাসিস্ট বাহিনী, জাপানি সৈন্যদের নারী নির্যাতনের রোমহর্ষক কাহিনী আজও ঘুরেফিরে উপস্থাপিত হচ্ছে মানুষের সামনে। কিন্তু মানবতার বিরুদ্ধে নৃশংসতার যে উদাহরণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আমাদের নারীদের জীবনে ঘটিয়ে গেছে তার বিচার চলি্লশ বছরে কিছুমাত্র এগোয়নি। আশার কথা, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সেই অপরাধীদের দেখে হয়তো মা-বাবা-ভাই-বোন, স্বামী-সন্তান হারানো এ দেশের মানুষ কিছুটা হলেও সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে। তবে এই মানবতাবিরোধী কার্যকলাপের জন্য কঠোর শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি আমাদের অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণের স্বীকৃতি জানাতে হবে। একই সঙ্গে শ্রদ্ধা জানাতে হবে ধর্ষিত, নির্যাতিত সেই সব নারীর প্রতি, যাদের আমরা এড়িয়ে গেছি বারবার। বীরাঙ্গনা নয়, বীরের মর্যাদা দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সেই সব নারীকে।

No comments

Powered by Blogger.