তবু আশায় বসতি by নোমান মোহাম্মদ

'গতকাল থেকে শিক্ষা নাও, আজকের জন্য বাঁচো, আর আশা বাঁচিয়ে রাখো আগামীকালের জন্য।'
বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলে ক্রিকেটের চর্চা কতটুকু হয়, এ নিয়ে সন্দেহটা বহু পুরনো। ক্রিকেটাররা যে অনুক্ষণ খেলাটিতে বুঁদ হয়ে থাকেন না, ম্যাচ ও প্র্যাকটিসের বাইরে জীবনধারণের প্রতিটি পদক্ষেপে যে ক্রিকেট মাথায় রাখেন না_এমন অভিযোগের তীর বরাবরই তাঁদের দিকে। আর খেলার বাইরে নিজেদের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনা,


তর্ক-বিতর্ক, সর্বোপরি বুদ্ধিবৃত্তির সৃজনশীল চর্চা? দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে এমন প্রস্তাবনাই অনেক তারকার কাছে হাস্যকর! আলবার্ট আইনস্টাইনের ওপরের বাণীটি তাই তাঁদের পরিচিত হওয়ার কথা নয়। অথচ চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিন শেষে সেই মহামতির দ্বারস্থ হতে হচ্ছে বাংলাদেশ দলের। কারণ ওই আগামীর আশাই তো এখন একমাত্র ভরসা!
ব্যাটিং-স্বর্গে নিজেরা প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে গেছে ১৩৫ রানে। কাল দ্বিতীয় দিন শেষে ৪ উইকেটে ৪১৫ রান তুলে ফেলেছে পাকিস্তান। অর্থাৎ হাতে ৬ উইকেট নিয়ে এগিয়ে আছে ২৮০ রানে, খেলার বাকি এখনো তিন দিন_এই টেস্টের ভবিষ্যৎ বলে দিতে আপনাকে নস্ট্রাডামুস হতে হবে না। তার পরও একটু আশা! যদি ম্যাচের পরের অংশে ভালো কিছু করা যায়! অন্তত নিজেদের সামর্থ্যের স্বাক্ষরটা যদি রাখা যায়! দলের প্রতিনিধি হয়ে দিন শেষের সংবাদ সম্মেলনে আসা মাহমুদ উল্লাহর কণ্ঠে ঝরে পড়ল সেই আশাবাদ। এই বিরুদ্ধ সময়ে দাঁড়িয়েও!
বাংলাদেশের এই দলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় আলোকিত হাতে গোনা যে দু-একজন, মাহমুদ উল্লাহ তাঁদের অন্যতম। চলনে-বলনে, কথাবার্তায় সেই ছাপটা আপনি পেয়ে যাবেন সহজেই। দলের সহ-অধিনায়ক তাই ঠিকই জানেন, ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে তাঁরা অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারছেন না। পুরো সিরিজজুড়ে ব্যর্থতা সে কথাই বলবে। চলতি টেস্টের প্রথম ইনিংসের ব্যর্থতার জেরেই তো তাঁরা খাবি খাচ্ছেন এখনো। বর্তমানের জন্য যে বাঁচবেন, সেটিও কী করে! পাকিস্তানের ব্যাটসম্যানরা যে রানপাহাড়ে চড়ে যাচ্ছেন তরতর করে। আশা তাই ওই ভবিষ্যৎ নিয়েই। সরল স্বীকারোক্তিতে তা জানাতে দ্বিধা নেই মাহমুদের, 'এ মুহূর্তে আমাদের আশা করা ছাড়া উপায় নেই। প্রথম ইনিংসে ভালো ব্যাটিং করতে পারিনি। এখন যদি আমরা দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো করার আত্মবিশ্বাস না রাখি, তাহলে তো আরো পারব না।' ধারাবাহিক ব্যর্থতায় ব্যাটসম্যানদের সামর্থ্য নিয়েও শুরু হয়েছে ফিসফিসানি। যদিও কথার বর্মে সতীর্থকে রক্ষা করেছেন সহ-অধিনায়ক, 'এটি সত্যি যে গত দুই-তিন সিরিজে আমাদের ব্যাটিংটা ভালো হয়নি। তবে তার আগে এক-দেড় বছরে আমরা ধারাবাহিকভাবে দল হিসেবে ভালো ব্যাটিং করছিলাম। সেটি টেস্ট-ওয়ানডে সব জায়গায়। এখন আসলে আমাদের একটা বড় ইনিংস দরকার। যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাটিং করতে পারি, তাহলে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে।'
কিন্তু সেই দ্বিতীয় ইনিংসে ক্রিজে যাওয়ার সুযোগটা তাঁরা পাবেন কখন? উত্তর জানা নেই মাহমুদের। এখানেও আছে আশাবাদ, 'কাল (আজ) যদি ওদের দ্রুত অল আউট করে দিতে পারি! যদিও জানি এমন উইকেটে কাজটি খুব কঠিন। এরই মধ্যে ওদের লিড প্রায় তিন শ হয়ে গেছে। এটিকে যত কমে রাখা যায়, ততই ভালো।' সেই লক্ষ্য পূরণের পথে অন্যতম অন্তরায় উইকেট। এমন নির্ভেজাল ব্যাটিং উইকেটের সুবিধা স্বাগতিক দল নিতে না পারলেও ঠিকই তা পেরেছে পাকিস্তান। অসহায়ত্ব তাই ফুটে উঠেছে মাহমুদের কণ্ঠে, 'আমাদের মূল শক্তি স্পিন। প্রথম সেশনে উইকেট থেকে কিছু টার্ন পেয়েছিলাম। এরপর আর পাইনি। তাই হয়তো বেশি উইকেট পাচ্ছি না।'
অর্থাৎ, আবার সেই অপেক্ষায় সওয়ার। পাকিস্তান কখন ইনিংস ঘোষণা করবে, কখন দ্বিতীয় ইনিংসের অগি্নপরীক্ষায় নামবে বাংলাদেশ। এই ম্যাচের ফল নির্ধারিত হয়ে গেলেও পাওয়ার অনেক কিছু আছে বলে মানছেন মাহমুদ। মানছেন কোচ স্টুয়ার্ট ল'র বলা মনস্তাত্তি্বক বাধার কথাও, 'কোচ যা বলেছেন, আমার মনে হচ্ছে সমস্যাটা তাই। প্র্যাকটিসে আমাদের সব কিছু ঠিকঠাক হচ্ছে। কিন্তু যখনই মাঠে যাচ্ছি, আর হচ্ছে না। মনস্তাত্তি্বক কিছু সমস্যা হয়তো আছে। শট সিলেকশনের ব্যাপারে কী করব, না করব_এমন একটা ব্যাপার কাজ করে। এখন সব কিছু নির্ভর করছে আমাদের ব্যাটিংয়ের দ্বিতীয় ইনিংসের ওপর।' ভালো পারফরম্যান্সে ক্ষয়িষ্ণু আত্মবিশ্বাস ফিরবে বলেও তাঁর আশা, 'আপনি পারফরম করলে আত্মবিশ্বাস পাবেন। না করলে সেটি পাবেন না। আমরা ওই ভালো পারফরম্যান্সের অপেক্ষায় আছি। প্রথম ইনিংসে নাসির ভালো খেলেছে, নাজিম উইকেটে টিকে ছিল অনেকক্ষণ, তবে বড় ইনিংস কেউ খেলতে পারেনি। যদি দ্বিতীয় ইনিংসে কেউ বড় ইনিংস খেলতে পারে, তার মাধ্যমে পুরো দলই আশা করি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে। আসলে আমাদের কাছে এ মুহূর্তে আশা ছাড়া বলার মতো কিছু নেই।'
সেই আশায় বসতি। আইনস্টাইনের কথামতো অতীত থেকে শিক্ষা নিতে পারলে ভবিষ্যতের এই আশার কলি ঠিকই ফুটবে ফুল হয়ে। নইলে মনে পড়ে যাবে আরেক মহামতি উইলিয়াম শেঙ্পিয়ারকে_'দুর্দশাগ্রস্তদের জন্য কোনো ওষুধ নেই, কেবল আশা ছাড়া!'

No comments

Powered by Blogger.