সময়ের কথা-লক্ষণে অলক্ষুনে ছায়া by অজয় দাশগুপ্ত

পাঁচ লাখ টাকার কাজ হোক কিংবা পাঁচ বা দশ কোটি টাকার সে কাজের ভাগ, টেন্ডার তাদেরই পেতে হবে কিংবা পাবে তাদের পছন্দের কেউ, যে প্রকল্পের ব্যয়ের একটি অংশ তাদের বখরা হিসেবে দিয়ে দেবে। ফলে এক কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ হবে ৫০ লাখ টাকার, বাকিটা হবে ভাগ-বাটোয়ারা। স্বাধীনতার ৪০তম বছরে তারা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারত তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর


এদেশীয় দোসর আলবদর-রাজাকারদের নৃশংসতা তুলে ধরার জন্য। কিন্তু সময় কাটছে যে টেন্ডারে\রাজধানী ঢাকার কিছু বাসের পেছনে পোস্টার :... ভাইকে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র হিসেবে দেখতে চায় জনগণ। উত্তরের মেয়র হিসেবেও অনেক 'ভাইয়ের' নাম উঠে এসেছে দেয়ালে কিংবা বাসে অথবা অন্য কোনো আকর্ষণীয় স্থানে। পোস্টারের ছাপার ব্যয় আমজনতার পকেট থেকে এসেছে, নাকি যিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী তিনিই জোগান দিয়েছেন, সে প্রশ্ন কাকে করি? বর্তমান নির্বাচন কমিশন এক সময় কঠোর ছিল। ২০০৮ সালের ঈদ-শারদীয় দুর্গাপূজার সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীরা শুভেচ্ছা-সালাম-আদাব জানিয়ে পোস্টার-ব্যানার লাগিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এতই শক্তিধর ছিল যে, তারা যাদের নামে পোস্টার-ব্যানার লাগানো হয় তাদের বাধ্য করেছিল সেসব নিজের গাঁটের অর্থ ব্যয় করে তুলে ফেলতে। এখন রাজনৈতিক সরকারের আমলে কোথায় গেল ড. এটিএম শামসুল হুদা ও সাখাওয়াত হোসেনের (ব্রিগেডিয়ার, অব.) সে শক্তি?
সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর দেশব্যাপী 'আইভী-হাওয়া' উঠেছিল। অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে 'আইভীদের' যেন মনোনয়ন দেওয়া হয়, সে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হচ্ছিল। শামীম ওসমানের মতো হেভিওয়েট প্রার্থী দল ও সরকারের পূর্ণ সমর্থন লাভ করেও ধরাশায়ী হওয়ার পর আওয়ামী লীগ 'এমন ভুল আর করবে না' বলে যাদের মনে হতে শুরু করেছিল, তারা নিশ্চয়ই কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রার্থীদের ঠিকুজি সংবাদপত্রে পাঠ করেছেন। ঢাকা মহানগরের দুটি সিটি করপোরেশনে যারা মেয়র হতে দারুণভাবে আগ্রহী, তাদের মধ্যেও কি 'আইভীদের' খুঁজে পাওয়া যায়?
এখন পর্যন্ত 'বিভক্ত ঢাকায়' রাজনীতিকদেরই মাঠে দেখছি। বিএনপি নির্বাচন করবে নাকি রাজপথে লড়বে, সেটা এখনও স্পষ্ট নয়। এ দলের নেতা সাদেক হোসেন খোকা মহাভাগ্যবান ছিলেন। টানা প্রায় ১০ বছর তিনি মেয়র ছিলেন একক রাজধানীর। ২০০২ সালে যখন এ নির্বাচন হয়েছিল, তখন কয়েক মাস আগে ১ অক্টোবরের (২০০১) নির্বাচনে পরাস্ত আওয়ামী ছিল অগোছালো। এখন দল ক্ষমতায় এবং আসন্ন নির্বাচনে মেয়র হয়ে জনগণের সেবা করার জন্য যারা ব্যাকুল হয়ে সিংহবিক্রমে মাঠে নেমে পড়েছেন, তারা আত্মরক্ষায় ব্যস্ত। জনগণের কাছে গিয়ে ভোট চাওয়ার মতো মনের জোর তাদের ছিল না। আবার কারও কারও ভয় ছিল, নির্বাচনে প্রার্থী হলে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী জোট নতুন করে হামলা-মামলায় জড়িয়ে হেনস্তা-হয়রানি করবে। চারদলীয় জোটের শাসনকালে রাজনীতি বা অর্থনীতি, কোনো ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য ছিল না। রাজধানীবাসীর জন্য সেবা বেড়েছে, এমন দাবি মেয়রের পরম সুহৃদরা করতেও লজ্জা পাবেন। যানজট কমানো কিংবা বস্তির জীবন সহজ করার জন্য সিটি করপোরেশন কিছুই করেনি। সাদেক হোসেন খোকা যাদের ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে পেয়েছিলেন, তাদের অনেকেরই এলাকায় পরিচয় ছিল 'শীর্ষ সন্ত্রাসী' হিসেবে এবং নির্বাচিত হয়ে এ কাজে তারা দক্ষতাও দেখিয়েছেন। দল ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের বিক্রম ছিল সিংহের মতো। ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দিনের দুই বছরের শাসনামলে তারা বিপন্নবোধ করেন। কারও কারও চরম বিপদ নেমে আসে। জেল-জুলুমও সহ্য করতে হয় কয়েকজন 'জনপ্রতিনিধিকে'। আওয়ামী লীগের তিন বছরের শাসনামলে পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার কারণ ঘটেনি। তারপরও তারা দায়িত্বে বহাল। আওয়ামী লীগ যদি ২০০৯ সালের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দিয়ে দিত, তাহলে মেয়র ও ওয়ার্ড কমিশনার হিসেবে তাদের প্রার্থীরাই মূলত জয়ী হতেন, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ২০০২ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যেমন হীনবল ছিল, ২০০৯ সালে বিএনপির অবস্থা ছিল তেমনই। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব, বিশেষ করে শেখ হাসিনা যদি এ সময়ে 'আইভী-মুখ' উপহার দিতে চাইতেন, জনগণ মহা উৎসাহে স্বাগত জানাত। কিন্তু তেমনটি যে ঘটল না! এবারে ঘটবে, এমন লক্ষণও তো দেখা যাচ্ছে না!
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল প্রত্যাশা জাগিয়েছিল। কিন্তু এখন যে আর তেমন অবস্থা নেই। একদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, অন্যদিকে দলের কিছু নেতাকর্মীর সেই পুরনো ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া_ ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, যা পারো গুছিয়ে নাও। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় এসেছিলেন। এ কারণে অনেক সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করা কঠিন ছিল। কিন্তু ২০০৮ সালে জনগণের বিপুল সমর্থন পাওয়ার কারণে ক্ষমতায় এসে দলকে গুছিয়ে তোলার চমৎকার সুযোগ মিলেছিল। একদিকে বিএনপি ছিল 'যুদ্ধাপরাধী-হাওয়া ভবন' কেলেঙ্কারিতে বিপর্যস্ত, অন্যদিকে জরুরি অবস্থার সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কিছু পদক্ষেপের কারণে আওয়ামী লীগের 'দুষ্টু লোকেরাও' ছিল ঝামেলায়। যাদের সম্পর্কে গডফাদারি অভিযোগ ছিল, তাদের অনেকেই জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। ভোটের প্রচারেও দেখা গেছে, সন্ত্রাসীদের ডাণ্ডার ভয় কিংবা ব্যাগভর্তি টাকার জোর না দেখিয়েও 'শত শত' আওয়ামী লীগ প্রার্থী বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের পর ফের 'দুষ্টু লোকেদের' কেন হারানো সাম্রাজ্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ করে দেওয়া হলো, সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন বটে। ক্ষমতার তিন বছরের মাথায় আওয়ামী লীগের যে বদনাম, তার একটি কারণ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। এ ক্ষেত্রে তাদের একটি যুক্তি থাকতে পারে_ বিশ্ব বাজারের অস্থিরতা। অনেক পণ্য আমরা আমদানি করি, যার দাম বেড়েছে। বিদ্যুৎ সংকটেরও যুক্তি থাকতে পারে_ বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের পরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার উৎপাদন বাড়াতে কিছুই করেনি। গত তিন বছরে বর্তমান সরকার জাতীয় গ্রিডে দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যোগ করেছে, এটা রেকর্ড বৈকি। কিন্তু দলের কিছু লোক কেন হাওয়া ভবন মার্কা কাজে যুক্ত হয়ে পড়ল? কেন ছাত্রলীগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজেদের 'মুক্তির ঠিকানা' খুঁজে পেল? শেখ হাসিনা এ সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদ ছেড়ে দিলেন ক্ষোভে-দুঃখে, কিন্তু তাতে তো কারও সম্বিত ফিরল না। বর্তমান সরকারের আমলে সবচেয়ে ভালো কাজ হচ্ছে যেসব ক্ষেত্রে তার মধ্যে শিক্ষা ও কৃষির কথা সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন। বিনামূল্যে বই দেওয়া যায় কোটি কোটি শিক্ষার্থীকে এবং তারা তা বছরের প্রথম দিনেই পেয়ে যায়_ এটা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু সেটা ঘটছে পর পর তিন বছর। এ মহৎ কর্মকাণ্ডের পেছনে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব কিংবা আওয়ামী ঘরানার যারা শিক্ষকদের জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে নিয়োগ পেতে ব্যাকুল, তারা কতটা অবদান রেখেছেন বা রাখতে চাইছেন?
বিশ্বব্যাপী খাদ্যমূল্য চড়া। অনেক দেশে ধান ও গমে উৎপাদন ঘাটতি। অথচ বাংলাদেশে উদ্বেগ নেই। একের পর এক বাম্পার ফসল পাচ্ছি আমরা। এ বছর আমন ধান ওঠার পর চালের বাজার অনেকটাই সহনশীল। শীতের সবজিও সস্তা। কৃষকরা 'ন্যায্যমূল্য' না পেয়ে কিছুটা হতাশ, তবে অন্যরা খুশি। কিন্তু কৃষক লীগ নেতৃত্ব কি জানে এ সাফল্যের রহস্য?
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে জনমত গড়ে তোলার জন্য শেখ হাসিনা দেশব্যাপী সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুভ পরিকল্পনা। কিন্তু এ প্রশ্নে জনমত গড়ে তোলার জন্য ঘরে ঘরে যাওয়ার কথা তো ছিল ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীদের। তাদের সে সময় কি আছে? অনেকে বলেন, তাদের ব্যস্ততা রয়েছে কোথায় সরকারি কাজের কী টেন্ডার আছে সেটা নিয়ে। পাঁচ লাখ টাকার কাজ হোক কিংবা পাঁচ বা দশ কোটি টাকার সে কাজের ভাগ, টেন্ডার তাদেরই পেতে হবে কিংবা পাবে তাদের পছন্দের কেউ, যে প্রকল্পের ব্যয়ের একটি অংশ তাদের বখরা হিসেবে দিয়ে দেবে। ফলে এক কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ হবে ৫০ লাখ টাকার, বাকিটা হবে ভাগ-বাটোয়ারা। স্বাধীনতার ৪০তম বছরে তারা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে পারত তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দোসর আলবদর-রাজাকারদের নৃশংসতা তুলে ধরার জন্য। কিন্তু সময় কাটছে যে টেন্ডারে।
ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশনে যারা জনসেবা ও শেখ হাসিনার হাত শক্তিশালী করার আহ্বান নিয়ে দেয়াল ভরে দিচ্ছেন, তাদের অনেকেরই নজর কিন্তু উন্নয়ন করার, তবে এলাকার নয় বরং নিজের। এমন অনেকে মেয়র হতে চাইছেন যারা অতীতে নানাভাবে বদনামের ভাগি হয়েছেন। তাদের নাম উজ্জ্বল কালিতে লেখা যায় নারায়ণগঞ্জ কিংবা কুমিল্লার 'কীর্তিমানদের' পাশে। তারা দলের মনোনয়ন পেলে বলতে হবে, সেবাধর্মী কাজের সুবিধার জন্য নয় বরং এদের জন্যই বিভক্ত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকা সিটি করপোরেশন। এ ধরনের রাজনীতির কাছে আমরা যে বড় অসহায়!

অজয় দাশগুপ্ত :সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.