চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত পাহাড়িরা by আবু দাউদ,

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ তিন দশক ধরে চলা আন্দোলন-সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সশস্ত্র পথ ছেড়ে জনসংহতি সমিতির (শান্তি বাহিনী) প্রায় দুই হাজার সদস্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। চুক্তির ১৪ বছর পূর্ণ হলো আজ। এই দীর্ঘ সময়েও চুক্তির অনেক ধারাই বাস্তবায়িত হয়নি। পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে প্রত্যাশিত শান্তিও ফিরে আসেনি। চুক্তির অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে তাদের মধ্যে চলছে অবিশ্বাস


আর শঙ্কা।হতাশা ব্যক্ত করেছেন জনসংহতির নেতারাও। আর পাহাড়ে শান্তি আনতে নতুন চুক্তির দাবি করেছে ইউপিডিএফ।জলবিদ্যুতের নামে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ, সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাহাড়ে রাজনৈতিকভাবে বাঙালি সেটেলার পুনর্বাসনসহ বেশ কিছু বিষয়কে সামনে রেখে পাহাড়ে শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র আন্দোলনের সূচনা। দুই যুগের বেশি সময় ধরে চলে তাদের সশস্ত্র সংগ্রাম। এই সময়কালে অসংখ্য পাহাড়ি ও বাঙালি হতাহত হওয়াসহ নানামুখী ক্ষতির শিকার হয় এখানকার প্রায় প্রতিটি পরিবার। ওই সময়ে কয়েকটি সরকার শান্তিপ্রক্রিয়া চালালেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর জনসংহতি সমিতির সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করে। কিন্তু ভ্রাতৃঘাতী দ্বন্দ্ব-সংঘাত আর অবিশ্বাসে আজও প্রত্যাশিত শান্তির দেখা মেলেনি।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সব শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রত্যাশা, পাহাড়ে শান্তি স্থাপন ও চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার উদ্যোগ নেবে। কেননা দীর্ঘ ১৪ বছরে চুক্তির সার্বিক অগ্রগতিতে তারা হতাশ। এ অবস্থায় স্থানীয় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও অবিলম্বে রোডম্যাপ করে চুক্তি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
শান্তিচুক্তির চৌদ্দ বছরেও চুক্তির মৌলিক বিষয় ও শর্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন জনসংহতি সমিতির নেতারা। অন্যদিকে শান্তিচুক্তির বিরোধিতাকারী পাহাড়ি সংগঠন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) নেতারা বলছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের সমস্যার প্রকৃত সমাধান আসবে না। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনই পারে সংকট নিরসন করতে। এ জন্য সরকারকে ইউপিডিএফের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি করতে হবে।
সরকারের ৩৩ মাসে অগ্রগতিশূন্য_জনসংহতি : জনসংহতি সমিতির (এম এন লারমা) কো-চেয়ারম্যান ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য সুধাসিন্ধু খীসা চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ চৌদ্দ বছরেও চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান মহাজোট সরকারের ৩৩ মাসে চুক্তির অর্জন শূন্য। বাকি ২৭ মাসেও কিছু হবে বলে জুম্ম জনগণ আশা করতে পারছে না। তিনি বলেন, যেই ভূমি সংকটে পাহাড়ে প্রতিনিয়ত দাঙ্গা-সহিংসতা ঘটছে, সেই সংকট নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেই। ল্যান্ড কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারাগুলো সংশোধনের প্রস্তাব আটকে আছে মন্ত্রণালয়ে। চুক্তির শর্তানুযায়ী আইন সংশোধন করে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি ছাড়া পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি আশা করা যায় না।
সুধাসিন্ধু খীসার মতে, আঞ্চলিক পরিষদ সৃষ্টি, শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্স, পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন ছাড়া কার্যত আদিবাসীদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। কারণ পার্বত্য চুক্তির শর্তানুযায়ী প্রণয়ন করা হয়নি আঞ্চলিক পরিষদ আইনের বিধিমালা। তিনি বলেন, ভূমি, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পুলিশ (স্থানীয়), আইনশৃঙ্খলা তত্ত্বাবধান এবং জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের কাছে কার্য ও দায়িত্বভুক্ত ৩৩টি বিষয় আজও হস্তান্তর করা হয়নি। সব অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি। এসব কারণে চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।
সুধাসিন্ধু খীসা বলেন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি হলে চুক্তির অন্য সব ধারা বাস্তবায়ন করা সহজ হতো। এটা করতে না পারায় স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা করা যায়নি। ফলে পার্বত্য জেলা পরিষদ নির্বাচনও হচ্ছে না। এর ফলে আটকে আছে আঞ্চলিক পরিষদ নির্বাচনও।
জনসংহতির এই নেতা বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে একজন প্রতিমন্ত্রী, শরণার্থীবিষয়ক টাস্কফোর্স ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে দুজনকে প্রতিমন্ত্রী মর্যাদায় আসীন করা হয়েছে। পার্বত্য জেলা পরিষদে কোনো মর্যাদা ছাড়াই চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ায় পরিষদগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে।
সুধাসিন্ধু খীসা দাবি করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে কিছু কাজ হয়েছিল। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উল্টো চুক্তি বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার চুক্তির পক্ষে কথা বললেও কার্যত চুক্তির সব প্রক্রিয়া আটকে দেয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় এসে তা ভুলে গেছে। দুই-একটি শৌখিন বৈঠক ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি কোনো কাজ দেখাতে পারেনি।
এটা যে আপস চুক্তি তা প্রমাণ হয়েছে_ইউপিডিএফ : খাগড়াছড়ি জেলা ইউপিডিএফের সমন্বয়কারী প্রদীপন খীসা বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের প্রকৃত সমাধান আসবে না। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনই পারে সংকট নিরসন করতে। এ জন্য সরকারকে ইউপিডিএফের সঙ্গে নতুনভাবে চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। তিনি বলেন, সাধারণ পাহাড়িদের বিরোধিতা উপেক্ষা করে স্বাক্ষরিত চুক্তিটি যে মূলত সন্তু লারমার আপস চুক্তি ছিল, তা চৌদ্দ বছরে প্রমাণ হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে ইউপিডিএফ শুরু থেকেই পার্বত্য চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
প্রদীপন খীসা দাবি করেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর পাহাড়ে নির্যাতন-নিপীড়নের ধরন পাল্টেছে মাত্র। বরং ভিন্নভাবে আরো কঠিন নির্যাতন-নিপীড়ন চলছে। এখন বাঙালিদের দিয়ে নির্যাতনের পাশাপাশি পাহাড়িদের জমিজমা দখল করানো হচ্ছে। মূলত চুক্তির পরই বেশি জমি দখল ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ফর্মুলা হিসেবে তিনি পররাষ্ট্র, অর্থ ও ভারী শিল্প বাদ রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে নতুন কাঠামো হবে সেগুলোর ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করেন। একই সঙ্গে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করে দেশের সব জাতিসত্তাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান। এদিকে ইউপিডিএফ সন্তু লারমার উদ্দেশে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিক্রিয়া : সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) জেলা সভাপতি অধ্যাপক ড. সুধীন কুমার চাকমা বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তিন বছরেও দৃশ্যত চুক্তির কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। রোডম্যাপ অনুযায়ী পার্বত্য চুক্তি ইস্যুতে সরকারের অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। অন্যথায় পাহাড়ের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস আর দূরত্ব আরো বাড়তে থাকবে। কেননা পাহাড়ি মানুষ মনে করে, এই সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করবে না।
অবশ্য ক্ষমতাসীন দলের নেতারা চুক্তি স্বাক্ষরের সাফল্য তুলে ধরেন। চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার আন্তরিক উল্লেখ করে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহেদুল আলম বলেন, চুক্তির অনেক ধারাই মহাজোট সরকার বাস্তবায়িত করে ফেলেছে। বাকি ধারাগুলো বাস্তবায়নে কাজ চলছে। এই সরকারের আমলেই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা কংজরী চৌধুরী বলেন, গতি ধীর হলেও বর্তমান সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক। তবে চুক্তির শর্ত মতে স্থানীয় মিশ্র পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো পার্বত্য জেলা পরিষদে হস্তান্তর হলে অর্ধেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

No comments

Powered by Blogger.