কংগ্রেস-তৃণমূল টানাপড়েন by গৌতম লাহিড়ী

মস্যা হলো, এখন ভারতে কোয়ালিশন সরকারের যুগ। ইউপিএ সরকারের প্রধান শরিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের সাংসদ সংখ্যা ১৯। কেন্দ্রের সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থন অবশ্য প্রয়োজন। ফলে মমতার মন-মেজাজ বুঝে চলা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই গত সোমবার নয়াদিলি্লর প্রথম সারির সংবাদপত্রে একটি বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় জাতীয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের


উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পৌরোহিত্য করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উপস্থিত থাকবেন ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায় এবং বিদ্যুৎমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধে। স্বভাবতই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল এ সভাকে ঘিরে। দীর্ঘদিন পর প্রণব মুখোপাধ্যায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত হননি। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা উপনির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিঙ্গুর জমি অধিগ্রহণ আইন নিয়ে শিল্পপতি টাটা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলায় জয়ী হয়েছেন। এসব কারণে তার মন-মেজাজ ফুরফুরে থাকারই কথা। কিন্তু ঘটনা তা নয়। কথায় কথায় তিনি আজকাল কেন্দ্রের ইউপিএ সরকারের প্রধান শাসক দল জাতীয় কংগ্রেসের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন। ফারাক্কার অনুষ্ঠানে গরহাজির থাকাটাও তা এক লক্ষণ। এতেই রীতিমতো চিন্তায় পড়েছেন জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব।
এমনিতেই ফারাক্কা বিধানসভা কেন্দ্রটি এখন আর অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্রের আওতাভুক্ত নয়, আগে ছিল। এ ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে জল্পনার অবকাশ হতো না। দেখা যাচ্ছে, ইদানীং কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি নিয়ে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের আপত্তি সোচ্চার হয়ে উঠছে। একমাত্র যে তিস্তার পানি ভাগাভাগি চুক্তি নিয়েই আপত্তি তা নয়। কয়েকদিন আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারতের বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজ্যে 'নির্মাণ শিল্প গঠনের জন্য' নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা ছিল। আলোচ্য বিষয় ছিল, 'নির্মাণ শিল্পনীতি নির্ধারণ'। বৈঠকের সময় দেখা গেল, মমতার দলের রেলমন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদি ওই নীতিতে আপত্তি জানিয়ে বসলেন। ফলে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো না। পরবর্তী মন্ত্রিসভার বৈঠকের জন্য তোলা রইল। তিনি জানিয়েও দিলেন, তার নেত্রীর নির্দেশে আপত্তি জানাতে বাধ্য হয়েছেন। কবে ওই নীতি গৃহীত হবে তা কেউ বলতে পারছেন না।
গত মাসেই দিলি্লতে মুখ্যমন্ত্রী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ে জাতীয় সংহতি পরিষদের সম্মেলন ডাকেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। ওই বৈঠকে অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে আলোচ্য বিষয় ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা রোখার জন্য একটি জাতীয় আইন প্রবর্তন করা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৈঠকে উপস্থিত হননি। তার পরিবর্তে প্রতিনিধি পাঠিয়ে দেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্রকে। তৃণমূল কংগ্রেসের আরেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদিও হাজির হন। ভারতীয় জনতা পার্টিশাসিত রাজ্যগুলোর মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে একযোগে তৃণমূল কংগ্রেসেও ওই প্রস্তাবিত আইনে ভেটো দিয়ে বসেন। বামপন্থিদের মধ্যে প্রকাশ কারাতও আপত্তি তোলেন এ কারণে যে, প্রস্তাবিত আইনটি রাজ্যগুলোর সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করতে পারে। শেষ পর্যন্ত বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, আইনটি আপাতত স্থগিত রাখা হবে। পরবর্তী সময়ে ফের আলোচনা করে সর্বসম্মতি তৈরি করে আইনটি আনা হবে। কিন্তু নেট ফল, আইনটি করা গেল না।
আরও একটি বিষয়ে ভারতে এখন বিতর্ক চলছে দেশজুড়ে। তা হলো, শিল্প স্থাপনের জন্য কৃষকদের জমি কীভাবে অধিগ্রহণ করা হবে। সবারই জানা যে, জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে মমতার স্পর্শকাতরতা রয়েছে। কেননা এ জমি অধিগ্রহণের আন্দোলন করেই আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ফলে কোনোমতেই তিনি কৃষকের জমি অধিগ্রহণের বিষয়ে কখনোই সম্মতি দেবেন না। অথচ কল-কারখানা তৈরি করতে হলে জমি অধিগ্রহণ করতেই হবে। এ জন্য ভারত সরকার চাইছিলেন কৃষকদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে আইন প্রণয়ন করা। এখানেও মমতার ভেটো... শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় গ্রামীণ উন্নয়নমন্ত্রী জয়রাম রমেশ কলকাতা উড়ে গিয়ে কোনোক্রমে মমতার সম্মতি আদায় করে আসেন। আইনটি সংসদে কেবল পেশ করতে দিন। তারপর আলোচনার সময় মমতার আপত্তিগুলো নিয়ে বিবেচনা করা যাবে। জাতীয় কংগ্রেসের প্রধান নেতা রাহুল গান্ধী চাইছিলেন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা ভোটের আগে অন্তত আইনটি সংসদে পেশ করে ইউপিএ সরকার কৃষকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে দায়বদ্ধতা ঘোষণা করুক। সংসদে আইনটি পাস না করে কেবল পেশের অনুমতি নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও মানসম্মান বাঁচিয়েছে।
সমস্যা হলো, এখন ভারতে কোয়ালিশন সরকারের যুগ। ইউপিএ সরকারের প্রধান শরিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। তাদের সাংসদ সংখ্যা ১৯। কেন্দ্রের সরকার টিকিয়ে রাখতে হলে তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থন অবশ্য প্রয়োজন। ফলে মমতার মন-মেজাজ বুঝে চলা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর নেই। কয়েকদিন আগে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারতেও পেট্রোলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা তেলের দাম যেমন বাড়বে, সেই অনুপাতে তেল উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো দাম বাড়ায়। সরকার নিজে বাড়ায় না। ডিজেল-কেরোসিন-রান্না গ্যাসের ক্ষেত্রে সরকার নিজে দাম নির্ধারণ করে। এর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার প্রচুর ভর্তুকি দেয়। এটা ঠিকই, দাম বাড়লে জনতার অসুবিধা বাড়ে। কিন্তু পেট্রোলের দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিবাদে সোচ্চার হলো। কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক হয়েও প্রকাশ্যেই আপত্তি জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বভাবতই সরকারি কোয়ালিশনের মতবিরোধ প্রকাশ্যে এলে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়ে ওঠে।
কয়েক বছর ধরে ভারত সরকার পরোক্ষ কর ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের জন্য দেশব্যাপী সমহারে পণ্য পরিসেবা কর চালু করতে চাইছে। ভারতের সব প্রাদেশিক রাজ্য সরকারের অর্থমন্ত্রীদের নিয়ে কমিটি সর্বসম্মতি তৈরির চেষ্টা করছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র ওই বৈঠকগুলোতে হাজির থাকছেন। কিন্তু এখনও কোনো মতামত প্রকাশ্য দেননি। কেননা মুখ্যমন্ত্রী মমতা কোনো মত জানাননি। মমতার ধারণা, এ কর ব্যবস্থা চালু হলে পরোক্ষ করের বোঝা বেড়ে যাবে। ফলে এ নিয়েও ধন্দে আছে কেন্দ্রীয় সরকার। যদিও খসড়া আইনটি সংসদে পেশ হয়েছে। এখন আলোচনা চলছে সংসদের সংসদীয় স্থায়ী সমিতিতে। আগামী নভেম্বর মাসে সংসদের শীতকালীন অধিবেশনে আইনটি পাস হওয়ার জন্য ফের পেশ হবে। তখন মমতা কী মনোভাব নেন তা জানতে উদগ্রীব কংগ্রেস নেতৃত্ব। তারপর পশ্চিমবঙ্গে শরিক কংগ্রেস দলের সঙ্গে চাপান-উতোর তো চলছেই। সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে রাজনৈতিক জল্পনা চলছেই। রাজনৈতিক পণ্ডিতদের একাংশ মনে করে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষে কখনোই মুসলিম ভোটের কারণে বিজেপির সঙ্গে জোট বাঁধা সম্ভব নয়। কিন্তু বেশিদিন কোয়ালিশন রাজনীতিতে সংঘাত চলাটাও সুখকর নয়_ এটাও কংগ্রেস নেতৃত্ব বুঝছে। প্রশ্নটা হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এতটাই অসন্তুষ্ট কেন? চৌত্রিশ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে জনতার বিপুল রায় নিয়ে মমতা যখন মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে আসীন হলেন তখন পশ্চিমবঙ্গের রাজকোষ প্রায় শূন্য বললেও অত্যুক্তি হয় না। তিনি আশা করছিলেন, দিলি্লর সরকার তাকে ভাঁড়ার খুলে অর্থ সাহায্য করবে। কিন্তু ভারতের সংবিধানে কোনো একটি রাজ্যের জন্য ঢালাও অর্থ সাহায্যের নিয়ম নেই। একমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যতীত। অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, যেমন করেই হোক, রাজ্য সরকার রাজ্যের বার্ষিক বাজেট বিধানসভায় পেশ করুক। তার থেকে বোঝা যাবে, রাজ্য সরকার কতটা রাজস্ব সংগ্রহ করতে পারে। সেই ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ বরাদ্দ করবে। কিন্তু মমতা সেই প্রস্তাব মানতে নারাজ। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর চার মাস কেটে গেছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গ সরকার আজ পর্যন্ত কোনো বার্ষিক বাজেট পেশ করেনি। কেবল ভোট অন অ্যাকাউন্ট পেশ করেই সরকার চলছে। মমতার ভয়, বাজেট পেশ করার অর্থ রাজ্যে কতটা কর চাপাচ্ছেন তা সবাই জেনে যাবেন। তাতে তার ভাবমূর্তিতে ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে তখনও পর্যন্ত তার নিজের বিধানসভার উপনির্বাচন বাকি রয়ে গেছে। মমতার দাবিমতো একতরফাভাবে কেন্দ্র অর্থ না দেওয়ায়ই বেজায় চটে রয়েছেন। এবার উপনির্বাচন শেষ। বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন। দিলি্লর আশা, হয়তো এবার মমতার মেজাজের পরিবর্তন হবে। একে একে কেন্দ্রীয় সরকারের আইনগুলো পাস করাতে যেমন অনুমতি দেবেন তেমনি বাংলাদেশও হয়তো পেতে পারে তিস্তা নিয়ে কোনো সুখবর।

গৌতম লাহিড়ী :সমকাল প্রতিনিধি
 

No comments

Powered by Blogger.