দ্বিখণ্ডিত ডিসিসি থেকে কী পাব! by ইমরুল চৌধুরী

'ডিসিসি' নিয়ে এখন তুলকালাম। ডিসিসি এখন অনেকের উৎস্বপ্নে দ্বিখণ্ডিত চাঁদের তরবারি। আমাদের কারও কারও অবস্থানে এখন হয় উত্তরের হু-হু বাতাস, না হয় দক্ষিণের খোলা জানালা।ডিসিসি নিয়ে আমি যেমন উৎকণ্ঠায় যুগপৎ আন্দোলিত, তেমনি উদ্বেলিত দেশের একজন ছড়াকারও বটে। তিনি লিখেছেন, 'ছিঃ ছিঃ ছিঃ/খবর পেলাম হচ্ছে বিভাগ ডিসিসি/কী লাভ এতে? এ ফাঁদ পেতে_ করছে মাথা ঝি ঝি ঝি/ডিসিসিকে ভাগ করলে আমরা পাবো কী কী


কী।' ইত্যাদি ইত্যাদি।ডিসিসি খণ্ডিত হোক, দ্বিখণ্ডিত হোক, খণ্ড-বিখণ্ড হোক এ নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। ব্যথা শুধু ওই ছড়াকারের মতো, অমূল্য রতনের মতো আমরা পাব কী কী কী?
এক সময় যখন ডিসিসি ছিল পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে, নাম ছিল ঢাকা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন বা ডিএমসি, তখন যা পেয়েছি, এখন যখন ডিসিসি নতুন-পুরান ঢাকার সঙ্গমস্থলের এক বিশালায়তন সুরম্য অট্টালিকায়, তখন এমন কী আমরা পেয়েছি এই পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত রাজভাণ্ডার থেকে।
আমরা ঢাকাবাসী যে রকম ছিলাম সে রকমই তো আছি। মসৃণ পিচঢালা রাস্তায় হঠাৎ পিছলে গিয়ে অশ্বের যে চিঁহি চিঁহি হ্রেষা ধ্বনি নির্গত হয়, তেমনি করুণ থেকে করুণতর অবস্থা আমাদের। এহেন ডিসিসির যিনি প্রধান, যিনি ঢাকাবাসীর সরাসরি ভোটে নির্বাচিত, তিনি কি রাজন্য, কি ভিখিরি, কি ভবঘুরে সকলের কাছে 'নগর পিতা' নামে অভিহিত। ভালো হতো যদি তিনি নির্দলীয় হতেন। এমনটি আশা করা আমাদের কিঞ্চিৎকর দেশে অকল্পনীয় বটে। বাগড়া তো সেখানে, যখন ক্ষমতাসীন দলের না হয়ে বিরোধী দলের কেউ নির্বাচিত হন। এখন যেহেতু ঢাকা দ্বিখণ্ডিত সে ক্ষেত্রে উত্তরে ক্ষমতাসীন আর দক্ষিণে বিরোধীদলীয় 'নগর পিতা' নির্বাচিত হলে তখন তো রশি টানাটানি নিয়ে ভালোই জমবে মজা। 'নগর পিতা' যদি দলীয় বিবেচনায় নির্বাচিত হন, তাহলে তার কাছ থেকে সকল পুত্রের প্রতি সমআচরণ কিংবা সমস্নেহ-বণ্টন প্রশ্নবিদ্ধ থাকে বটে।
'নগর পিতা' অর্থাৎ যে শহরে আমাদের বসবাস তিনি একটি বৃহত্তর সংসারের অভিভাবক। তিনি যদি উত্তরের হন তাহলে দূরাঞ্চল থেকে আসা গাবতলী যাত্রী ছাউনিতে স্বাস্থ্যসম্মত গণশৌচাগার রয়েছে কি-না তা দেখার দায়িত্ব যেমন তার অনুরূপভাবে তিনি যদি দক্ষিণের হন, তাহলে সায়েদাবাদ যাত্রী ছাউনি দেখার দায়িত্ব তার।
এ প্রসঙ্গে কাঠগড়ায় প্রশ্ন তোলা যায়, কী ধরনের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা আমরা পাচ্ছি বর্তমানের একীভূত ডিসিসির কাছ থেকে বা ভবিষ্যতে পাব দ্বিখণ্ডিত ডিসিসির মাধ্যমে?
ঢাকা শহরে না রয়েছে মেট্রো রেল, না পাতাল ট্রেন। কোটি লোক অধ্যুষিত অধিকাংশ নগরবাসীর অন্যতম যাতায়াত মাধ্যম আন্তঃনগর বাস সার্ভিস। এ শহরে কোথাও কি আপনার নজরে পড়েছে আধুনিক সুবিধা সংবলিত কোনো একটি যাত্রী ছাউনির? যেখানে বয়োবৃদ্ধ কিংবা সাধারণ কোনো যাত্রী খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে তার ক্লান্তি দূর করতে পারেন?
কি গ্রীষ্মের দাবদাহ, কি শ্রাবণের অঝোর বৃষ্টিধারা কিংবা শীতের ঘন কুয়াশা সবকিছুই তো অপেক্ষমাণ যাত্রীসাধারণ ঋতু-পরিক্রমার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। অথচ সবকিছুই তো নাগরিক সুবিধার অন্তর্গত।
ডিসিসি উত্তর-দক্ষিণে বিভক্ত হলে সবকিছুর সরল সমাধান হবে তা তো নয়। এই দুর্গম ঢাকায় আমরা যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছিলাম, দোরগোড়ায় সেবা পেঁৗছে দিতে ডিসিসির এই অনভিপ্রেত বিভক্তি! তাহলে তো পূর্ব-পশ্চিমের বিষয়টিও কোনো এক সময় আমাদের চিন্তায় আনা যেতে পারে।
অথচ গোড়ায় যেখানে গলদ তার শিখর সোপানে পেঁৗছতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। সঠিকভাবে এই গলদ ব্যবচ্ছেদের ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যতে উত্তর-দক্ষিণের সেতুবন্ধ।

ইমরুল চৌধুরী :প্রাক্তন সংবাদ পাঠক, কবি ও শিশুসাহিত্যিক
adkingltd@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.