প্রকল্পে দুর্নীতি :তথ্য চেয়েছে বিশ্বব্যাংক by হকিকত জাহান হকি

বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় বিভিন্ন খাতে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য জানতে চেয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে ওইসব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত দুর্নীতিবাজ সাবেক প্রকল্প পরিচালকদের বিরুদ্ধে গৃহীত আইনগত ব্যবস্থা সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়েছে। সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের দেওয়া অর্থ আত্মসাতের ঘটনা জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে বিশ্বব্যাংক এ তথ্য জানতে চেয়েছে। ওইসব প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে কারও কারও বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করা হয়েছে। আবার কারও কারও বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।


দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সড়ক ও জনপথ বিভাগের ছয়টি প্রকল্প, উপানুষ্ঠানিক ও মানবসম্পদ উন্নয়নে দুটি শিক্ষা প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য এবং এ সংক্রান্ত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের ইন্টিগ্রিটি ভাইস প্রেসিডেন্ট লিওনার্দ এফ ম্যাককেইন ক্রেথে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ওই তথ্য জানতে চেয়েছেন। বিষয়টি বিশ্বব্যাংককে অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ওইসব দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে অর্থ মন্ত্রণালয় দুদকে চিঠি পাঠালে দুদকের মহাপরিচালক (বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত) আবু মোঃ মোস্তফা কামাল চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে বিষয়টি লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়কে জানান। অর্থ মন্ত্রণালয় শিগগির বিষয়টি বিশ্বব্যাংককে জানাবে।
দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান সমকালকে বলেন, বিশ্বব্যাংক যেসব সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ সহায়তা দিয়েছে তারা সেসব প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য জানতে চেয়েছে। তিনি বলেন, এ সংস্থা যেহেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে তাই
এ ব্যাপারে তাদের জানারও অধিকার আছে। বিশ্বব্যাংক তাদের অর্থায়নকৃত প্রকল্পে দুর্নীতির যে তথ্য জানতে চেয়েছে তা দুর্নীতি দমন অভিযান জোরদার করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে দুদকের সার্বিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মনে করেন তিনি।
নলকা-হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়ক প্রকল্প
অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ শাখাওয়াত হোসেনের বিরুদ্ধে নলকা-হাটিকুমরুল-বনপাড়া সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের অধীন সিরাজগঞ্জ-নাটোর পর্যন্ত ২৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে ১৩ কোটি ৯০ লাখ ৯ হাজার ৪৪৮ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে শাখাওয়াত হোসেনকে প্রধান আসামি করে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। সড়কটি নির্মাণে উন্নতমানের বালি ব্যবহার না করে রাস্তার পাশের নিম্নমানের মাটি ব্যবহার করে ওই পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী টোল প্লাজা
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মেঘনা ও মেঘনা-গোমতী টোল প্লাজায় আদায় হওয়া ১৭৪ কোটি ৩৫ লাখ ১৭ হাজার ৫৮২ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক প্রকল্প পরিচালক আবদুল মতিনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
ঢাকা বাইপাস সড়ক প্রকল্প
জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-নয়াপুর জাতীয় মহাসড়ক (ঢাকা বাইপাস) প্রকল্প বাস্তবায়নেও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রকল্পের আওতায় তিনটি ভুয়া বিল পেশ করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এর মধ্যে ১৫০ মিটার রাস্তার ফ্লেক্সিবল পেভমেন্ট কাজের বিপরীতে অতিরিক্ত ২ লাখ ৯১ হাজার ৭৩৫ টাকা, একই প্রক্রিয়ায় ৫০০ মিটার রাস্তার কাজে ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৭৮ টাকা ও আরও ১৫০ মিটার রাস্তার কাজে ১৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকার ভুয়া বিল করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ অভিযোগে সাবেক পরিচালক নাজমুল হককে প্রধান আসামি করে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও অন্যদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় আলাদাভাবে তিনটি মামলা করেছে দুদক। প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আরও ৯৭ ঠিকাদারের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাহাবউদ্দিন
সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাহাবউদ্দিন দেবগ্রাম-প্রগতি সরণি সংযোগ সড়ক প্রকল্পের দায়িত্বে থাকাকালে অনিয়ম-দুর্নীতি করে অবৈধ অর্থ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন সড়ক প্রকল্পের পরিচালক থাকাকালে টেন্ডার নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়া সওজের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সাহাবউদ্দিন ও তার স্ত্রীর নামে ৪০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের তথ্য পাওয়া গেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিলুপ্ত সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাদের কাছে সম্পদের হিসাব চেয়ে নোটিশ পাঠানো হলে তারা দুদকে সম্পদ বিবরণী পেশ না করে নিজেদের দুর্নীতির কথা স্বীকার করে মার্জনা পাওয়ার জন্য বিলুপ্ত ট্রুথ কমিশনের শরণাপন্ন হন। ট্রুথ কমিশনে তারা ৩ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে মার্জনা লাভ করেন।
ঢাকা মহানগরী তৃতীয় সড়ক প্রকল্প
ঢাকা মহানগরীর তৃতীয় সড়ক সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগটি অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধান কাজের স্বার্থে এ প্রকল্প সম্পর্কে সওজের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া হলে আংশিক কাগজপত্র পাওয়া যায়।
দেবগ্রাম-প্রগতি সরণি সংযোগ সড়ক প্রকল্প
ঢাকা জেলার দেবগ্রাম-প্রগতি সরণি সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সওজ ও পরিকল্পনা কমিশনকে যৌথভাবে একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে কমিটির মাধ্যমে প্রকল্পের কারিগরি বিষয়ে তথ্যের জন্য উভয় প্রতিষ্ঠানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক।
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো প্রকল্প
উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালক হিসেবে রফিকুল ইসলাম দায়িত্ব পালনকালে এ প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে এনজিও নির্বাচনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান ও তদন্ত শাখা-১ থেকে অভিযোগটি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। অভিযোগটি মানি লন্ডারিং আইন-২০১০-এর আওতায় আনা হয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা কার্যক্রম
মানবসম্পদ উন্নয়নে চলমান শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নে দুর্নীতির একটি অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সুষ্ঠুভাবে অনুসন্ধানের লক্ষ্যে অভিযোগ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে দুদক থেকে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে বেশ আগে চিঠি পাঠানো হলেও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করা হয়নি। পরে দুদক একই তথ্য চেয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায়। চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগ অনুসন্ধানের কাজ শুরু করা হবে।

No comments

Powered by Blogger.