কম সময়ে হ্যাটট্রিক

স্প্যানিশ লিগে পরশু প্রথম গোল করার ১৪ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ইতালিতে কাল একইভাবে এসি মিলানকে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দিয়েছেন কেভিন প্রিন্স বোয়াটেং। ১৪ মিনিটের অনেক কম ব্যবধানেও ৩ গোল করার নজির আছে ফুটবলে। সে রকম কিছু হ্যাটট্রিক নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজন৯০ সেকেন্ডে হ্যাটট্রিক করেও আফসোস৯০ সেকেন্ডে হ্যাটট্রিক, তাও ফুটবলে? কিভাবে সম্ভব? জাল থেকে কুড়িয়ে কিকঅফ পর্যন্ত আসতেই তো কখনো কখনো কেটে যায় ৯০ সেকেন্ড!


অথচ এ সময়েই কিনা হ্যাটট্রিক করে বসে আছেন টমি রস! ১৯৬৪ সালের ২৮ নভেম্বর ভিক্টোরিয়া পার্কে অবিশ্বাস্য এই কীর্তিটাই করেছিলেন স্কটল্যান্ডের রস কাউন্টি ক্লাবের এই স্ট্রাইকার। স্কটিশ ঘরোয়া ফুটবলের ম্যাচে নাইরন কাউন্টি এফসির বিপক্ষে ম্যাচটিতে করা ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিকে তাঁর দল জিতেছিল ৮-১ ব্যবধানে। তবে এই হ্যাটট্রিকের অফিশিয়াল স্বীকৃতি নেই, কেননা ম্যাচটিতে দুজনের জায়গায় টাইমকিপার ছিলেন মাত্র একজন, তাও তিনি আবার রেফারি। তাই গিনেস বুকে নাম তোলার আবেদন না করে ২০০৪ সালে একবার আফসোস করে রস বলেছিলেন, 'টাইমকিপার হিসেবে সেই ম্যাচে ছিলেন কেবল রেফারিই, অথচ থাকার কথা দুজনের। কারো খুব তাড়াতাড়ি করা হ্যাটট্রিক দেখে আফসোস হয় আমার, কেননা ৯০ সেকেন্ডে ৩ গোল করেছিলাম আমিও।'
সবচেয়ে কম সময়ে হ্যাটট্রিক
রসের কীর্তি গিনেস বুকে ঠাঁই না পেলেও দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ডটি কিন্তু তাঁরই দেশের এক ফুটবলারের। ১০৬ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৩ গোল করে গিনেস বুকে জায়গা করে নিয়েছেন কুইন অব সাউথ এফসির স্ট্রাইকার টমি ব্রিস। ১৯৯৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর আরব্রোথের বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েন তিনি।
১৯৮০ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ক্লাব ফুটবল খেললেও জাতীয় দলে কখনো ডাক পাননি ব্রিস। ক্লাব ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছেন কুইনেই। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ওই ক্লাবের হয়ে ১৭৬ ম্যাচে করেছিলেন ৪৯ গোল।
রেকর্ড থেকে একটু দূরে...
দুই মিনিটেরও কম সময়ে হ্যাটট্রিকের কীর্তি আছে এদুয়ার্দো ম্যাগলিওনিরও। আর্জেন্টাইন ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ইন্দিপেন্দিয়েন্তের হয়ে তিনি জিতেছেন 'লাতিন ফুটবলের চ্যাম্পিয়নস লিগ'খ্যাত কোপা লিবারতাদোরেসের তিন তিনটি শিরোপা। লাতিন ক্লাব ফুটবলে সবচেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে হ্যাটট্রিকটি করেছেন অবশ্য ঘরোয়া ফুটবলে জিমনাসিয়া ডি লা প্লাতার বিপক্ষে। ১৯৭৩ সালের ১৮ মার্চ ১ মিনিট ৫০ সেকেন্ড বা ১১০ সেকেন্ডেই করে বসেন গোল তিনটি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অবশ্য খেলা হয়নি ম্যাগলিওনিরও। দু-দুটি লিগ শিরোপা জেতা এই স্ট্রাইকার ইন্দিপেন্দিয়েন্তের হয়ে ১৩৫ ম্যাচে করেছেন ৫৮ গোল।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে আয়ারল্যান্ড দাগ কাটতে পারেনি সেভাবে। তাদের ঘরোয়া ফুটবলের মান অবশ্য যথেষ্টই ভালো। আর ইউরোপের শীর্ষ সারির লিগের মধ্যে দ্রুততম হ্যাটট্রিকটি হয়েছে সেখানেই। ১৯৬৭ সালের ১৯ নভেম্বর সেলবোর্নের হয়ে বোহামিয়ানসের বিপক্ষে ২ মিনিট ১৩ সেকেন্ডে ৩ গোল করেন জিমি ও'কোনর। সেদিনের মতো অবশ্য পুরো ক্যারিয়ারে সেভাবে আলো ছড়াতে পারেননি এ স্ট্রাইকার। নইলে ১০৯ লিগ ম্যাচে মাত্র ২৬ গোল থাকত না জিমির।
জেমসের মা-বাবার আফসোস
ছেলে জেমস হায়েটেরকে নিয়ে বড় স্বপ্নই দেখতেন তাঁর বাবা রিচার্ড ও মা মেরি। ইংল্যান্ডের জাতীয় দলে না হোক, অন্তত ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা আর্সেনালের জার্সিতে তাঁকে দেখতে চেয়েছিলেন তাঁরা। স্বপ্নটা পূরণ হয়নি। বেশি এগুতে পারেননি ৩২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। তবে ২০০৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইংলিশ ফুটবলে অনন্য এক কীর্তি গড়েন জেমস। সেদিন লিগা ওয়ানে জেমসের দল বোরেনমাউথ মুখোমুখি হয়েছিল ওরেঙ্হামের। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ৩-০ গোলে এগিয়েও ছিল বোরেনমাউথ। জেমস ছিলেন বেঞ্চে। তাই সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় ৮০ মিনিটে মাঠ ছাড়েন তাঁর মা-বাবা। ৮৪ মিনিটে বদলি হিসেবে নামার সুযোগ হয় জেমসের। আর সুযোগটা কাজে লাগিয়ে গড়েন নতুন ইতিহাস। ১৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৩ গোল করেছিলেন জেমস, যা ইংলিশ ফুটবল ইতিহাসে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের কীর্তি। তাঁর আগে ১০ সেকেন্ড বেশি সময় নিয়ে ১৯৪৩ সালে রেকর্ডটা করেছিলেন জক ডোডস। অথচ জেমসের এই কীর্তিই কিনা একটু আগে গ্যালারি ছেড়ে চলে যাওয়ায় দেখতে পারেননি তাঁর মা-বাবা। সে কারণে ম্যাচ শেষে জেমস বলেছিলেন, 'মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করে জাতীয় দলে খেলতে পারিনি। তবে এ হ্যাটট্রিকটা দেখলে নিশ্চিত আমাকে নিয়ে তাঁদের আফসোস থাকত না।'
প্রিমিয়ার লিগেও...
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে দ্রুততম হ্যাটট্রিকের রেকর্ড ববি ফাওলারের। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ৫ মিনিটেরও কম ব্যবধানে হ্যাটট্রিক করে সবার নজর কাড়েন ফাওলার। ১৯৯৪ সালের ২৮ আগস্ট আর্সেনালের বিপক্ষে লিভারপুলের জার্সিতে হ্যাটট্রিক করতে ফাওলার সময় নিয়েছিলেন ৪ মিনিট ৩২ সেকেন্ড। ইংল্যান্ড জাতীয় দলের সাবেক গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যান সেদিন অসহায়ই হয়ে পড়েছিলেন ফাওলারের জাদুতে। ইংল্যান্ডের হয়ে ২৬ ম্যাচে ৭ গোল করা এই ফরোয়ার্ড ২০০২ সালের পর জাতীয় দলে আর ডাক পাননি।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্রুততম
প্রতিদিন সূর্যটা সবার আগে দেখা যায় জাপানে, তাই দেশটার অন্য নাম 'সূর্যোদয়ের দেশ'। সে দেশের মাসায়ি নাকায়ামা আবার সবার আগে হ্যাটট্রিক করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলো ছড়িয়েছেন। তাও আবার বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে! ২০০০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাছাই পর্বের ম্যাচটিতে ব্রুনাইয়ের বিপক্ষে নাকায়ামা ৩ গোল করতে সময় নেন মাত্র ৩ মিনিট ৩ সেকেন্ড, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্রুততম। ২৭ সেকেন্ড বেশি নিয়ে ১৯৩৮ সালে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আগের রেকর্ডটি করেছিলেন ইংল্যান্ডের জর্জ উইলিয়াম হল।
ব্রুনাইয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিকের পর নাকায়ামা গিনেস বুকে নাম ওঠান আরেকটি কীর্তি গড়ে। ১৯৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২৯ এপ্রিল জে লিগের টানা চার ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি! এই চার ম্যাচে সব মিলিয়ে গোল করেছিলেন ১৬টি। জাতীয় দলের হয়ে ৫৩ ম্যাচে ২১ গোল করে ২০০৩ সালে থামে তাঁর ক্যারিয়ার।
চ্যাম্পিয়নস লিগে নিউয়েল
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫ মিনিটেরও কম ব্যবধানে হ্যাটট্রিক থাকলেও চ্যাম্পিয়নস লিগে এমন গল্প নেই। ১৯৯৫-৯৬ মৌসুমে রোজেনবার্গের বিপক্ষে ব্ল্যাকবার্ন রোভার্সের মাইক নিউয়েল ৩ গোল করেছিলেন ৯ মিনিটের ব্যবধানে। ৯ মিনিটের ব্যবধানে হ্যাটট্রিক আছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোরও, তবে সেটা চ্যাম্পিয়নস লিগে নয়। এ বছরের ২১ জুলাই মৌসুম শুরুর আগে প্রস্তুতি ম্যাচে মেঙ্েিকার ক্লাব চিভাস গুদালাজারার বিপক্ষে এই কীর্তি গড়েছিলেন তিনি। ৭৩ মিনিটে বেনজেমার পাস থেকে নেওয়া শটে লক্ষ্যভেদের পর ৭৬ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটা করেন পেনাল্টি থেকে। আর ৮২ মিনিটে রোনালদো হ্যাটট্রিক পূরণ করেন ওজিলের পাস থেকে পাওয়া বলে দুর্দান্ত এক গোল করে।

No comments

Powered by Blogger.