Friday, February 20, 2026
গাজা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জুয়া খেলা by রনি পি সাসমিতা
গাজা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জুয়া খেলা by রনি পি সাসমিতা
এই সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক নয়, এটি কূটনৈতিক অবস্থানেও বড় বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বহু দশক ধরে গড়ে ওঠা ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির ভঙ্গিমা থেকে এটি দৃশ্যমান সরে আসা। প্রশ্ন উঠছে, জাকার্তা কি সত্যিই নিজের জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি বাইরের এক ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনৈতিক এজেন্ডার প্রভাবে নিজের পথ বদলাচ্ছে?
ভূরাজনীতি কখনো ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার প্রদর্শনী নয়। এটি ঠান্ডা মাথায় জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌম মর্যাদার হিসাব। কিন্তু বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অনেকের চোখে সুপরিকল্পিত কৌশলগত পদক্ষেপের চেয়ে তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া বলেই মনে হচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়ার আন্তর্জাতিক প্রভাব এত দিন দাঁড়িয়ে ছিল ভারসাম্যের ওপর—কোনো বিতর্কিত নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ওপর নয়। অথচ যে উদ্যোগে তারা যোগ দিতে চলেছে, তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এমন এক ব্যক্তি, যিনি লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক ঐকমত্য উপেক্ষার জন্য পরিচিত।
ফলে বিষয়টি শুধু মধ্যপ্রাচ্য শান্তি উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব কূটনীতিতে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীন, স্থিতিশীল ভাবমূর্তি কি এতে আঘাত পাবে?
যদি বোর্ড অব পিসের অধীনে সত্যিই সেনা পাঠানো হয়, ঝুঁকি আরও বাড়বে। গাজা কোনো প্রচলিত শান্তিরক্ষা এলাকা নয়। এটি বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির ও রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত সংঘাতক্ষেত্রগুলোর একটি। এখানে মানবিক দায়বদ্ধতা ও কঠোর নিরাপত্তা বাস্তবতা প্রায়ই মুখোমুখি দাঁড়ায়।
এমন জায়গায় অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপক্ষীয় ম্যান্ডেট ছাড়া হাজার হাজার সেনা পাঠানো মানে এমন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া, যেখানে নিরপেক্ষ থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—ইন্দোনেশিয়ার বহুদিনের ‘স্বাধীন ও সক্রিয়’ পররাষ্ট্রনীতির ভিত্তি কি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে? বান্দুং সম্মেলন এবং জুয়ান্ডা ঘোষণার সময় থেকে এই নীতিই তাদের কূটনীতির মেরুদণ্ড।
ইন্দোনেশিয়া ঐতিহাসিকভাবে নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে, কারও ব্যক্তিগত কূটনৈতিক এজেন্ডার অনুসারী হিসেবে নয়। কিন্তু ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া মানে এমন একপক্ষীয় পন্থাকে বৈধতা দেওয়া, যা আন্তর্জাতিক–স্বীকৃত নিয়মের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক।
‘স্বাধীন’ মানে বাইরের চাপমুক্ত অবস্থান। ‘সক্রিয়’ মানে জাতীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে অংশগ্রহণ। যদি তা বদলে যায়, তবে ইন্দোনেশিয়া কেবল যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নীতির প্রতীকী সমর্থকে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি নেবে।
এতে চীন, রাশিয়া বা আসিয়ান অংশীদারদের সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য দুর্বল হতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্ব এত দিন নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই দাঁড়িয়ে ছিল।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ইন্দোনেশিয়ার অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিরপেক্ষতার ভিত্তিতে হয়েছে। কিন্তু বোর্ড অব পিস বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার বাইরে। ফলে দেশটি নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী থেকে রাজনৈতিক নিরাপত্তা কাঠামোর সক্রিয় অংশীদারে পরিণত হতে পারে।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক, এটি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে। যদি অর্থনৈতিক বা কৌশলগত প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি আলোচনাযোগ্য হয়ে ওঠে, তবে কূটনৈতিক পরিচয়ের সামঞ্জস্যই ভেঙে পড়তে পারে। অথচ বৈশ্বিক শান্তি ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে তাদের সাংবিধানিক অঙ্গীকার টিকিয়ে রাখতে হলে নীতিগত স্বাধীনতা জরুরি।
এখানেই তৈরি হচ্ছে ‘ফিলিস্তিন প্যারাডক্স’। ইন্দোনেশিয়ার সংবিধান সব ধরনের উপনিবেশবাদ প্রত্যাখ্যান করে এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়ের ওপর জোর দেয়। অথচ এমন এক উদ্যোগে যোগ দেওয়া, যার উদ্যোক্তা অতীতে ইসরায়েলের পক্ষে ঝুঁকে থাকা নীতির স্থপতি—তা সহজে মিলিয়ে নেওয়া কঠিন।
ট্রাম্পের জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস সরানোর সিদ্ধান্ত বহু দশকের কূটনৈতিক ঐকমত্য ভেঙেছিল এবং মুসলিম বিশ্বে তীব্র সমালোচনা কুড়িয়েছিল। বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারাবাহিক সমর্থক হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার কাছে এই অংশগ্রহণ রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
যদি বোর্ড অব পিস ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা ছাড়াই আঞ্চলিক স্বাভাবিকীকরণ এগিয়ে নেয়, তবে ইন্দোনেশিয়া এমন একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়বে, যা দেশ-বিদেশে চাপিয়ে দেওয়া উদ্যোগ হিসেবে দেখা হতে পারে। এতে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাতিসংঘের মতো মঞ্চে তাদের নৈতিক নেতৃত্ব দুর্বল হবে।
গাজা সংঘাত শুধু ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে সীমাবদ্ধ নয়। তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’সহ বৃহত্তর আঞ্চলিক শক্তিগুলোও এখানে সক্রিয়। ইন্দোনেশীয় বাহিনীকে যদি পশ্চিমা নিরাপত্তাবলয়ের অংশ হিসেবে দেখা হয়, তবে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্যবস্তু হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। শান্তিরক্ষীরাই হয়ে উঠতে পারেন সংঘাতের সক্রিয় লক্ষ্য।
৮ হাজার সেনা পাঠানো ছোটখাটো পদক্ষেপ নয়,এটি একটি পূর্ণ ব্রিগেড। এমন সময়ে, যখন নর্থ নাটুনা সাগরে উত্তেজনা বাড়ছে এবং ইন্দো–প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে, তখন আট হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া দেশের মূল প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকারকে দুর্বল করতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও সিদ্ধান্তটি ভারী। ধ্বংসস্তূপে পরিণত, উচ্চ সামরিকীকৃত এলাকায় হাজার হাজার সেনা টিকিয়ে রাখতে বিশাল লজিস্টিক অবকাঠামো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সহায়তা থাকলেও গোপন ব্যয় শেষ পর্যন্ত জাতীয় বাজেটেই চাপ ফেলবে।
দেশের অর্থনীতি যখন চাঙা করার প্রয়োজন এবং প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণ যখন অপরিহার্য, তখন অনিশ্চিত কৌশলগত ফলের আশায় বিপুল সম্পদ বরাদ্দ করা সংসদীয় পর্যালোচনা দাবি করে। স্পষ্ট নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক লাভ না থাকলে এটি ব্যয়বহুল ভূরাজনৈতিক জুয়া হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত কোনো উদ্যোগে অংশ নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি ভাবমূর্তির ঝুঁকি তৈরি করে। মার্কিন রাজনীতি গভীরভাবে বিভক্ত। ভবিষ্যৎ প্রশাসন যদি ট্রাম্পযুগের উদ্যোগ থেকে সরে আসে, তবে অকারণেই ইন্দোনেশিয়া কূটনৈতিক বিপাকে পড়তে পারে।
ব্যক্তিনির্ভর কূটনৈতিক কাঠামো সাধারণত অস্থির হয়। ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহ্য বরাবরই জাতিসংঘ ও আসিয়ানের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে। কারণ, এগুলো কোনো এক ব্যক্তির সঙ্গে বাঁধা নয়, তাই টেকসই।
দ্রুত বদলে যাওয়া বহু মেরু বিশ্বে প্রভাব বাড়াতে ইন্দোনেশিয়ার শর্টকাটের প্রয়োজন নেই। তাদের শক্তি ছিল স্বাধীনতা, ভারসাম্য ও নীতিনিষ্ঠ কূটনীতি।
প্রশ্ন একটাই, জাকার্তা সেই ঐতিহ্য রক্ষা করবে নাকি দৃশ্যমান ভূরাজনৈতিক উপস্থিতির মোহে নিজস্ব অবস্থানকে আপসের মুখে ঠেলে দেবে?
* রনি পি সাসমিতা, ইন্দোনেশিয়া স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিকস অ্যাকশন ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
![]() |
| গাজায় ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছে ফিলিস্তিনি কিশোরেরা। গাজা নগরীর আল-শাতি শরণার্থীশিবিরের পাশে। ৮ নভেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1281)
-
▼
February
(244)
-
▼
Feb 20
(8)
- ‘শহীদের শোকসভা’ ঘিরে ইরান আবারও সংকটের মুখে by জেস...
- গাজা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জুয়া খেলা by রনি পি সাসমিতা
- পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জমি কেনা সহজ ক...
- ১০ দিনের মধ্যে চুক্তি না করলে ইরানে হামলার হুমকি ট...
- ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে কী ঘটতে পারে
- কৃত্রিম অক্সিজেনের অভাবে বায়ুথলি দুটি ওভারটাইম খেট...
- উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব!
- বিএনপির শপথ না নেওয়া গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা by...
-
▼
Feb 20
(8)
-
▼
February
(244)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment