Friday, February 20, 2026
‘শহীদের শোকসভা’ ঘিরে ইরান আবারও সংকটের মুখে by জেসন বার্ক
‘শহীদের শোকসভা’ ঘিরে ইরান আবারও সংকটের মুখে by জেসন বার্ক
ওমানে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তাঁর দল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় বসেছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, দুই পক্ষের অবস্থানের ফারাক এতটাই বেশি যে তা সহজে মেটানো সম্ভব নয়, বরং সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এর মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরানে শাসন পরিবর্তনই হতে পারে সবচেয়ে ভালো ঘটনা। ফলে উত্তেজনা ও ঝুঁকি—দুটিই বাড়ছে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের নিয়ন্ত্রণ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত লক্ষ্য ইরানের শাসন পরিবর্তন বলেই মনে হচ্ছে। অনেকের মতে, সেই প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, আশির দশকের পর সবচেয়ে বড় বিক্ষোভের ঢেউ ইরানে ছড়িয়ে পড়ে। মাশহাদ থেকে আবাদান পর্যন্ত লাখো মানুষ রাস্তায় নামে।
এ দৃশ্য অনেককে ইরানের শাহর শেষ সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে কিছু স্পষ্ট মিল আছে, যা ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে বড় মিল অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। প্রায় ৫০ বছর আগেও একই ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৭৭ সালে নিত্যপণ্যের দাম ২৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তখনো জীবিকা হুমকির মুখে পড়ায় তেহরানের বাজারের দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
আরেকটি মিল দেখা যাচ্ছে দমন–পীড়ন, শোক এবং প্রতিবাদের এক পুনরাবৃত্ত চক্রে, যা শেষ পর্যন্ত শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল। ১৯৭৮ সালে একটি রক্ষণশীল পত্রিকায় আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনিকে নিয়ে কটূক্তিপূর্ণ লেখা ছাপা হয়। এতে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।
কুম শহরে শত শত মাদ্রাসাশিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে। তারা শাহর শাসনের প্রতীক এবং তাঁর আরোপিত আধুনিকায়নের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে ছয়জন নিহত হয়। এরপর তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
এই বিক্ষোভ হয়তো থেমে যেত, যদি না শিয়া মুসলমানদের মধ্যে ৪০ দিনের শোক পালনের ঐতিহ্য থাকত। নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে এই শোকসভাগুলোই পরবর্তী বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়।
পোলিশ সাংবাদিক রিশার্ড কাপুশচিনস্কি তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন, স্বাভাবিক মৃত্যু হলে শোকসভার পর একধরনের শান্ত, মেনে নেওয়ার মনোভাব তৈরি হয়। কিন্তু সহিংস মৃত্যুর ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে প্রতিশোধের তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্ম নেয়।
১৯৭৮ সালের জানুয়ারিতে কুমের ঘটনার ঠিক ৪০ দিন পর নতুন বিক্ষোভ শুরু হয়, নতুন করে হত্যাকাণ্ড ঘটে, আবার শোক পালিত হয় এবং তা আবার বিক্ষোভে রূপ নেয়। এই চক্র ক্রমে তীব্র হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে শাহ দেশ ছেড়ে চলে যান, আর ফিরে আসেননি।
এই চক্র আবারও ফিরে আসতে পারে। গত বৃহস্পতিবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীরা সারা দেশের ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানিয়েছেন জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নিহতদের মৃত্যুর পর ৪০ দিনের শোকের শেষে আবার রাস্তায় নামতে। তাঁদের লক্ষ্য নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতি ধরে রাখা এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া।
এটি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাসবিদ আলী আনসারির মতে, ১৯৭৮ সালে শাহবিরোধী আন্দোলনে প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। আর কেউ কেউ মনে করেন, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শুধু জানুয়ারিতেই নিহত মানুষের সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। এর মানে, সামনে আরও বহু শোকসভা এবং সম্ভাব্য বিক্ষোভ।
১৯৭৮ সালে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকেরা সরাসরি ঘটনাস্থলে ছিলেন। কিন্তু এখন তেমন উপস্থিতি নেই। সরকার ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ঠিক কারা আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে এটুকু বোঝা যায়, ক্ষোভ ও বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি গভীর এবং বাস্তব।
১৯৭৮ সালের আন্দোলনে ছিল একটি বিস্তৃত জোট। এতে খোমেনির অনুসারী ধর্মীয় গোষ্ঠীর পাশাপাশি ছিল উদারপন্থী, জাতীয়তাবাদী, সমাজতন্ত্রী, নারীবাদী, মধ্যপন্থী আলেম, এমনকি কিছু কমিউনিস্টও। বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও এতে যুক্ত ছিল। এই বৈচিত্র্যে যেমন শক্তি ছিল, তেমনি দুর্বলতাও। কারণ, সবাই শাহকে সরাতে চাইলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে সবার ধারণা ছিল ভিন্ন।
আজও সেই বাস্তবতা প্রযোজ্য। বর্তমান শাসন যদি পতনও হয়, ভবিষ্যৎ পথ তৎক্ষণাৎ স্পষ্ট না–ও হতে পারে। খোমেনিও দেশে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে পূর্ণ ক্ষমতা পাননি। কয়েক বছরের মধ্যে ইরান–ইরাক যুদ্ধ, নতুন সংবিধান, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং নিরাপত্তা বাহিনী গড়ে তোলার মাধ্যমে তাঁর শাসন শক্তিশালী হয়। এই প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য সব প্রতিপক্ষকে নির্মমভাবে দমন করা হয়।
আজ যাঁরা ইরানে পরিবর্তন চান, তাঁদের জন্য এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আছে। সফল হতে হলে ব্যাপক জনসমর্থন এবং একটি বিস্তৃত ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু সেই ঐক্যের ভেতরেই থাকবে নানা মত ও ভবিষ্যৎ কল্পনা। অতীতে এই বৈচিত্র্যই একসময় দুর্বলতায় পরিণত হয়েছিল, যার সুযোগ নিয়ে একটি গোষ্ঠী কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করে।
তাই শাসন পতন হলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ৪৭ বছর আগের মতোই এখনো বলা কঠিন, সামনে কী অপেক্ষা করছে। জনগণ হয়তো বিজয়ী হবে। কিন্তু তখনই শুরু হবে আসল লড়াই—স্বাধীনতা, সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য।
* জেসন বার্ক, দ্য গার্ডিয়ানের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তাবিষয়ক সাংবাদিক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
![]() |
| ইরানে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শুধু জানুয়ারিতেই নিহত মানুষের সংখ্যা ৩০ হাজার পর্যন্ত হতে পারে। ছবি: এএফপি |
About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1281)
-
▼
February
(244)
-
▼
Feb 20
(8)
- ‘শহীদের শোকসভা’ ঘিরে ইরান আবারও সংকটের মুখে by জেস...
- গাজা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার জুয়া খেলা by রনি পি সাসমিতা
- পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের জমি কেনা সহজ ক...
- ১০ দিনের মধ্যে চুক্তি না করলে ইরানে হামলার হুমকি ট...
- ইরানে সরকার পরিবর্তন হলে কী ঘটতে পারে
- কৃত্রিম অক্সিজেনের অভাবে বায়ুথলি দুটি ওভারটাইম খেট...
- উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব!
- বিএনপির শপথ না নেওয়া গণভোটের রায়কে অগ্রাহ্য করা by...
-
▼
Feb 20
(8)
-
▼
February
(244)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

No comments:
Post a Comment