আল-আকসায় মন্ত্রী-এমপিসহ হাজারো ইহুদির ‘হানা’, নাচ-গানে উত্তেজনা

ইহুদিদের ধর্মীয় উপবাস দিবস তিশা বি’আভ উপলক্ষে বৃহস্পতিবার অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরাইলের উগ্র জাতীয়তাবাদী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে বৃহৎ অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে।

মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদিন কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হাজারো ইসরাইলি মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

ফিলিস্তিনি ওয়াক্ফ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৩ হাজার ২০০ জনের বেশি ইসরাইলি আল-আকসা মসজিদের চত্বরে প্রবেশ করেন। বিকেলেও এই অনুপ্রবেশ অব্যাহত থাকার কথা।
এই অভিযানে অংশ নেয়াদের মধ্যে ছিলেন ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির, নেগেভ, গ্যালিলি ও জাতীয় স্থিতিশীলতাবিষয়ক মন্ত্রী ইৎজহাক ওয়াসারলাউফ এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সংসদ সদস্য আমিত হালেভি।

এদিন মসজিদ প্রাঙ্গণে গিয়ে বেন গভির বলেন, দেখুন এখানে কী হচ্ছে- ইহুদিরা এখানে প্রার্থনা করছে এবং নিজেদের এ জায়গার মালিক মনে করছে। আগে কখনও এমনটা ঘটেনি।

ফজরের নামাজে বাধা
অভিযানের আগে ইসরাইলি বাহিনী বহু ফিলিস্তিনিকে আল-আকসা মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করতে বাধা দেয়। ফলে অনেক মুসল্লিকে আশপাশের সড়কেই নামাজ আদায় করতে বাধ্য হন।
ফিলিস্তিনের ধর্মীয় বিষয় ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয় ইসরাইলি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অনুপ্রবেশকে “স্পষ্ট ও গুরুতর আগ্রাসন” বলে উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এই অভিযান ইসলামি পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনি অবস্থান পরিবর্তনের গুরুতর প্রচেষ্টা।

এতে আরও বলা হয়, ১৪৪ দুনাম আয়তনের পুরো আল-আকসা মসজিদ কেবল মুসলমানদের একচ্ছত্র অধিকার। এটি অবিভাজ্য এবং কারও সঙ্গে ভাগাভাগি করা যাবে না। দখলদার সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ পুরো অঞ্চলে ধর্মীয় যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।

নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়ালেন অংশগ্রহণকারীরা
বৃহৎ এই অনুপ্রবেশে অংশ নেয়া অনেককে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলের পতাকা ওড়াতে, গান গাইতে, নাচতে, সেজদা দিয়ে প্রার্থনা করতে এবং ছাউনি টাঙাতে দেখা যায়।
দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা ‘স্ট্যাটাস কু’ অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ। এনিয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জেরুজালেম গভর্নরেট জানায়, সাধারণত একেকটি দলে প্রায় ৩০ জন করে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হলেও বৃহস্পতিবার একেকটি দলে প্রায় ১৫০ জন করে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
এছাড়া আগে যেখানে ইহুদিদের প্রার্থনা মূলত প্রাঙ্গণের পূর্বাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, এবার ডোম অব দ্য রকের আশপাশসহ পুরো এলাকাতেই তাদের প্রার্থনা ও ধর্মীয় সংগীত গাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়েছে।

ধর্মীয় যুদ্ধের উসকানি
ইসরাইলি শান্তিকামী সংগঠন পিস নাউ সতর্ক করে বলেছে, আল-আকসায় এই ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড একটি ধর্মীয় যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, আজ সকালে টেম্পল মাউন্টে অত্যন্ত বিপজ্জনক উসকানি দেয়া হয়েছে। মসজিদগুলোর সামনে ব্যাপক ইহুদি প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিনের স্ট্যাটাস কু সরাসরি লঙ্ঘন করেছে।
তাদের ভাষ্য, যারা ধর্মীয় সংঘাত উসকে দিতে চায়, তাদের কর্মকাণ্ড এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

স্ট্যাটাস কু কী?
স্ট্যাটাস কু হলো আল-আকসা মসজিদ পরিচালনার বিষয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দীর্ঘদিনের একটি ব্যবস্থা।
এই ব্যবস্থার অধীনে ১৪৪ দুনামজুড়ে পুরো আল-আকসা কমপ্লেক্সকে ইসলামি পবিত্র স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সেখানে প্রবেশ, নামাজ, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের দায়িত্ব জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াক্ফের হাতে।
তবে ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর থেকে ইসরাইল ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করে আসছে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইল ওয়াক্ফের কাছ থেকে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নেয় এবং উগ্র জাতীয়তাবাদী ইসরাইলিদের প্রতিদিন আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব অভিযানে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ আল-আকসা প্রাঙ্গণের ভেতরে ইহুদিদের প্রার্থনা এবং পতাকা ওড়ানোরও অনুমতি দিয়েছে।
আল-আকসা মসজিদের জ্যেষ্ঠ খতিব ও জেরুজালেমের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শেখ ইকরিমা সাবরি বুধবার সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ইহুদিদের ধর্মীয় দিবসগুলোকে কাজে লাগিয়ে আল-আকসায় অনুপ্রবেশ বাড়াচ্ছে এবং মসজিদের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছে।

তিনি অভিযোগ করেন, মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা ও নেসেট সদস্যদের অংশগ্রহণে বড় ধরনের এসব অভিযান আয়োজনের মাধ্যমে ইসরাইল সরকার এ কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিক বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে।

আল-আকসায় মন্ত্রী-এমপিসহ হাজারো ইহুদির ‘হানা’, নাচ-গানে উত্তেজনা