Saturday, March 7, 2026
ইরানে হামলায় যেভাবে লাভ হচ্ছে রাশিয়ার by লিওনিদ রাগোজিন
ইরানে হামলায় যেভাবে লাভ হচ্ছে রাশিয়ার by লিওনিদ রাগোজিন
ইরানে হামলা মস্কোর জন্য উদ্বেগের কারণ হলেও রাশিয়ার শাসকগোষ্ঠীর কাছে এটি তাদের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কৌশলের একধরনের বৈধতা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনসহ ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের নীতিকে তারা এর মাধ্যমে সঠিক বলে মনে করছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানবিরোধী যুদ্ধ সম্ভবত ২০১১ সালের লিবিয়ার ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে বছর ন্যাটোর নেতৃত্বে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের সময় রাশিয়া বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ অনুমোদন করেছিলেন।
পুতিন পরে এই সিদ্ধান্তকে গুরুতর ভুল বলে আখ্যা দিয়েছেন। ওই ঘটনা পুতিনের নিরাপত্তা ধারণা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলেছিল। অনেকের মতে, সেটিই তাঁকে আবার প্রেসিডেন্ট পদে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে উৎসাহিত করে।
২০১১ সালের অক্টোবরে পুতিন আরেকবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র এক মাস পরই গাদ্দাফিকে বিদ্রোহীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। তাঁর মৃত্যুর ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে।
সে সময় পশ্চিমা নেতারা এই ঘটনার প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু গাদ্দাফি-পরবর্তী লিবিয়ায় গণতন্ত্র বা স্থিতিশীলতা আসেনি, বরং দেশটি গৃহযুদ্ধ ও বিভক্তির দিকে চলে যায়।
পুতিনের কাছে এই ঘটনা ছিল স্পষ্ট সতর্কবার্তা। তাঁর ধারণা ছিল, পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বে পরিচালিত উদারপন্থী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচারণা যদি মেনে নেওয়া হয়, তবে একসময় একই ধরনের পরিণতি তাঁর ব্যক্তিগতভাবে কিংবা রাশিয়ার জন্যও অপেক্ষা করতে পারে।
২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে মস্কোতে সংসদ নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ শুরু হয়। ক্রেমলিন এই আন্দোলনকে পশ্চিমা–সমর্থিত শহুরে মধ্যবিত্তের উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিল। একই সঙ্গে সেটিকেও আরেকটি সতর্কসংকেত বলে মনে করেছিল।
কয়েক মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর পুতিন ২০১২ সালের মে মাসে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগমুহূর্তে কঠোরভাবে বিক্ষোভ দমন করেন। এই সময়টিকে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় বলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে ইউক্রেনের মাইদান আন্দোলনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ দেখা যায়।
বর্তমানে ইরানে ঘটে যাওয়া নাটকীয় ঘটনাগুলো দেখে পুতিন সম্ভবত মনে করছেন, ইউক্রেনে তাঁর পদক্ষেপগুলো সঠিক ছিল। একই সঙ্গে তিনি হয়তো সোভিয়েত আমলের নেতাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কারণ, তাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার তৈরি করেছিলেন। এই অস্ত্রভান্ডারই রাশিয়ার প্রকৃত সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থাকে নিরাপদ রেখেছে বলে তিনি মনে করেন।
রাশিয়া নিজের প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও পুতিন নিজেকে এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একজন রক্ষক হিসেবে দেখাতে চান। তাঁর মতে, এই ব্যবস্থার অবক্ষয়ের পেছনে দায়ী যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের বাড়তি আত্মবিশ্বাস, অহংকার ও বেপরোয়া নীতি।
ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ হামলার ধারণার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৩০-এর দশকের সোভিয়েত সামরিক নীতিতে, সেখানে শত্রুর ভূখণ্ডে গিয়ে যুদ্ধ করার ধারণা ছিল। ২০০৭ সালে ন্যাটো যখন ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ভবিষ্যতে সদস্য হওয়ার সুযোগ দেওয়ার কথা জানায়, তখন থেকেই ক্রেমলিন তাদের ‘শত্রু ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখতে শুরু করে। এই ধারণার প্রথম প্রয়োগ দেখা যায় ২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধে।
২০১৪ সালে ইউক্রেনে প্রথম হামলা এবং ২০২২ সালে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন ক্রেমলিনের কাছে ছিল একধরনের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ। তাদের ধারণা ছিল, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ার মতো কোনো এক সময় পশ্চিমা সামরিক হস্তক্ষেপের মুখে পড়তে পারে রাশিয়া বা তার মিত্ররা, আর এখন ইরানও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি।
ইউক্রেনকে পশ্চিমাদের সঙ্গে সংঘাতের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র বানানোর মাধ্যমে ক্রেমলিন রাশিয়ার অধিকাংশ নাগরিককে যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব থেকে দূরে রাখতে পেরেছে। রাষ্ট্রীয় প্রচারণার মাধ্যমে এই যুদ্ধকে সমাজের কাছে অবশ্যম্ভাবী হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান অপ্রত্যাশিত এক মিত্র হিসেবে সামনে আসে। দুই দেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে জটিল হলেও ইরান রাশিয়াকে গুরুত্বপূর্ণ ড্রোন প্রযুক্তি সরবরাহ করে।
সে সময় পশ্চিমা বিশ্বে ধারণা ছিল, তুরস্কের তৈরি বায়রাক্তার ড্রোন ব্যবহার করে ইউক্রেন প্রযুক্তিগত সুবিধা পেতে পারে। ইরানের সহায়তা অবশ্য নিছক বন্ধুত্বের কারণে ছিল না। এর বিনিময়ে তেহরান কয়েক বিলিয়ন ডলার পেয়েছে, যা তাদের দুর্বল অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করেছে।
তবে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ক এতটা গভীর নয় যে এখন মস্কো সরাসরি ইরানের পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে। এর পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতাও রয়েছে। ইসরায়েল ইউক্রেনকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র সরবরাহ করেনি এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাতেও যোগ দেয়নি। ফলে বহু রুশ ধনকুবেরের জন্য ইসরায়েল নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
আরেকটি কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তিনি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়েছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করছেন। মস্কো চায় না ইউরোপীয় নেতারা এই সম্পর্ককে নষ্ট করার সুযোগ পান।
বাস্তবে ইরানকে সহায়তা করার মতো সামরিক সক্ষমতাও এখন রাশিয়ার খুব বেশি নেই। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরে যে নতুন সামরিক প্রযুক্তি তৈরি হয়েছে, তা সরবরাহ করলে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার ইরানেরও হয়তো এই প্রযুক্তি কেনার মতো অর্থ নেই।
অন্যদিকে স্বল্প মেয়াদে ইরানে যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য কিছু সুবিধাও এনে দিচ্ছে। সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই তেল ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর ফলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়বে। উচ্চ জ্বালানিমূল্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে, যারা বর্তমানে ইউক্রেনের প্রধান অর্থদাতা।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ হলে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারও ক্ষয় হতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, যা অন্যথায় ইউক্রেনে ব্যবহৃত হতো। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যদি আরও বেশি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে ইউক্রেনকে ঘিরে চলমান আলোচনায় রাশিয়ার প্রভাবও বাড়তে পারে।
দেশের ভেতরেও পুতিন এর রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারেন। ইরানে ধ্বংস ও অস্থিরতার দৃশ্য রাশিয়ার মানুষের মধ্যে অবরুদ্ধ দুর্গের মানসিকতা আরও শক্ত করবে। এতে পুতিনের ভাবমূর্তি এমন এক নেতার হিসেবে আরও মজবুত হতে পারে, যার শাসনব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদী হলেও তিনি দেশকে রক্ষা করছেন।
* লিওনিদ রাগোজিন, লাতভিয়াভিত্তিক একজন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

About: বাংলা খবর
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
-
▼
2026
(1280)
-
▼
March
(202)
-
▼
Mar 07
(8)
- সৌদি আরব কেন তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে by ব...
- লেবাননে রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল
- ইরানের পাল্টা হামলায় বদলাচ্ছে সমীকরণ: দীর্ঘমেয়াদি ...
- মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য...
- যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ কোটি ডলার দামের থাড রাডার ব্যবস্...
- ইরানে হামলায় যেভাবে লাভ হচ্ছে রাশিয়ার by লিওনিদ রা...
- ইসরায়েলের হয়ে কোনো মার্কিন লড়তে চান না: সিনেট শুনা...
- ট্রাম্প চাইলেই কি খামেনিকে হত্যা করতে পারেন, আন্তর...
-
▼
Mar 07
(8)
-
▼
March
(202)
- ► 2025 (3280)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
No comments:
Post a Comment