নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম এনপিএর যাত্রা শুরু, ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া বাম ও মধ্যপন্থী মতাদর্শের তরুণদের উদ্যোগে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের’ (এনপিএ) আত্মপ্রকাশ হয়েছে। নতুন এই প্ল্যাটফর্মের ৩ জন মুখপাত্র ও ১০১ সদস্যের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল ঘোষণা করা হয়েছে। তিন মুখপাত্র হলেন ফেরদৌস আরা রুমী, মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) ও নাজিফা জান্নাত।

গত শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এনপিএর আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ হয়েছে। সেখানে প্ল্যাটফর্মের মুখপাত্র ও কাউন্সিল সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ (কাউন্সিল সদস্য)।

মুখপাত্রের দায়িত্ব পাওয়া ফেরদৌস আরা রুমী ও তুহিন খান লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট। আর নাজিফা জান্নাত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী।

এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে স্থান পাওয়া ১০১ জনের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে পদত্যাগকারী চার নেতা রয়েছেন। তাঁরা হলেন এনসিপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় (ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক), সাবেক যুগ্ম সদস্যসচিব তুহিন খান, সাবেক কালচারাল সেলের উপপ্রধান সৈয়দা নীলিমা দোলা। এ ছাড়া আছেন এনসিপির সাবেক সদস্য সৈয়দ ইমতিয়াজ নদভী।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অলিউর সান, ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সভাপতি মেঘমল্লার বসু, সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সহসমন্বয়ক নূমান আহমাদ চৌধুরী ও রাফসান আহমেদও আছেন এনপিএর কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে।

মুখপাত্র ও কাউন্সিল সদস্যদের নাম ঘোষণার পর এনপিএর তিন মুখপাত্র প্ল্যাটফর্মের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এই প্ল্যাটফর্মের পাঁচটি মূলনীতিও ঘোষণা করা হয়। এগুলো হলো গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা।

ঘোষণাপত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক লড়াই-সংগ্রামের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়। বলা হয়, জুলাই আমাদের সামনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক প্রশ্নটি স্পষ্টভাবে হাজির করে। জুলাই কেবল শাসক পরিবর্তনের ঘোষণা ছিল না, এটি ছিল ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের দাবি নিয়েই জুলাই আমাদের সামনে এসেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের নানা উদ্যোগ নিলেও দেড় বছর পর এসে বাস্তবতা হতাশাজনক। একই সঙ্গে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক পরিসরের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা আজ অনেকটাই ভেঙে পড়েছে।

এরপর বলা হয়, বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভাষা ও চর্চার পুনরুত্থান। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় সংখ্যাগুরুর পাশাপাশি সংখ্যালঘুর কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করার যে গণতান্ত্রিক ধারণা, তার গুরুতর লঙ্ঘন ঘটছে। ধর্মীয়, জাতিগত ও লৈঙ্গিক পরিচয়ের সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন আরও বেশি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই কোনো না কোনোভাবে নারী, সংখ্যালঘু বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি অবিচারমূলক আচরণ করছে। গণতন্ত্রের নাম ব্যবহার করেও বাস্তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের উত্থান স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তার প্রশ্নকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ঘটেছিল। তবু প্রাণাধিকার ও মানবাধিকার আজও নিশ্চিত করা যায়নি।

অভ্যুত্থানের পরেও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নাগরিকের রক্ত ঝরছে উল্লেখ করে ঘোষণাপত্রে বলা হয়, এর পাশাপাশি নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অভিব্যক্তির ওপর বিভিন্ন উগ্র গোষ্ঠীর আক্রমণ বাড়ছে। এসব ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশে এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে, যারা গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মৌলিক প্রশ্নগুলোকে অগ্রাধিকার দেবে। যারা নাগরিকের অধিকারকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক পরিসর নির্মাণে মনোযোগী হবে। এই প্রেক্ষাপটেই জনগণের শক্তি, আগামীর মুক্তি গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এনপিএ যাত্রা শুরু করছে।

এনপিএর কাউন্সিল সদস্য মীর হুযাইফা আল মামদূহ ছিলেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক। শেষ পর্যায়ে তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে এনপিএর পরবর্তী কার্যক্রম ঘোষণা করা হবে।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এনপিএর কাউন্সিল সদস্য অনিক রায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, শ্রমিক নেত্রী মোশরেফা মিশু, কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম, লেখক আলতাফ পারভেজ, বাসদের (মার্ক্সবাদী) নেত্রী সীমা দত্ত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বখতিয়ার আহমেদ, শিল্পী অমল আকাশ, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা দিদারুল ভূঁইয়া, কবি জাহিদ জগৎ প্রমুখ।

‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ গানটি সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-16%2Fiyvxvazh%2FNPA-Programme-01.jpeg?rect=0%2C0%2C1599%2C1066&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের’ (এনপিএ) কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্যরা। আজ শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। ছবি: দীপু মালাকার

No comments

Powered by Blogger.