প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে দৃষ্টি ফেরাতে জঙ্গি তৎপরতা



ভারতের সঙ্গে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে মানুষের দৃষ্টিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই দেশব্যাপী রক্তাক্ত জঙ্গি তৎপরতা বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের প্রাক্কালে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতিবাদে সারা দেশ যখন ফুঁসে উঠেছে, ঠিক তখনই আবারো দেশব্যাপী রক্তাক্ত জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে মানুষের দৃষ্টিকে ভিন্নখাতে নেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। জঙ্গিবাদ নিয়ে দেশের মানুষকে অন্ধকারের মধ্যে ফেলে রাখা হচ্ছে। গতকাল রাজধানীর নয়া পল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বারবার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানালেও আওয়ামী লীগ বারবার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং জঙ্গিবাদকে ব্যবহার করে সরকারই ফায়দা নিচ্ছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিকে বানচাল করতেই জঙ্গিবাদের তৎপরতা সৃষ্টি করা হয়েছে। রিজভী বলেন, ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুম, অপহরণের কোনো অনুমোদন আমাদের সংবিধানে নেই। তাই জঙ্গি নির্মূলে সরকারের প্রশ্নবোধক দমননীতি যেমন সংবিধান অনুমোদন করে না, অন্যদিকে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে হত্যার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্কও অজানা থেকে যাচ্ছে। জনগণ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সরকার পরিকল্পিতভাবে জঙ্গিবাদের সামগ্রিক তৎপরতা আড়াল করছে। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ দেশ থেকে দূর হোক তা সরকার চায় না। যার ভূরি ভূরি প্রমাণ মিলছে, জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের ভূমিকায়। হানিফ মৃধা-সোহেলদের মা ও স্ত্রীদের কান্না জনগণের কাছে জঙ্গিবাদ নিয়ে সরকারের রহস্যজনক ভূমিকা আরো স্পষ্ট করেছে। বিএনপির মুখপাত্র অভিযোগ করেন, বর্তমানে গুম ও অপহরণের অধিকাংশ ঘটনা পুলিশ থানায় নথিভুক্ত করতে চায় না। গুম ও অপহরণের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকায় ওইসব ঘটনায় থানায় মামলা করা রীতিমতো দুঃসাধ্য। এমনকি তা সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করতেও চায় না। আর করলেও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আমরা কেবিনেটে বসি, আমরাও তো জানি না কি চুক্তি হবে- এলজিআরডি মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের এ বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন রিজভী। রিজভী বলেন, এলজিআরডি মন্ত্রীকে বলতে চাই- গণমাধ্যমে এত  খবর বের হচ্ছে, আপনাদের দলের বিভিন্ন নেতারা প্রতিরক্ষা চুক্তি বিষয়ে নানা কথা বলছেন। অথচ সে বিষয়ে আপনাদের মতো কেবিনেট মন্ত্রীরা জানেন না, নাকি বেমালুম চেপে যাচ্ছেন? এখানেইতো আসল রহস্য লুকিয়ে আছে। আপনারা দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে গোপনে দেশবিরোধী চুক্তি করে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছেন না। তিনি বলেন, ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেন্ডেন্ট-এ প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। ইনডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার মালিক হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। সুতরাং এটি স্পষ্ট যে, সরকারের ইশারাতেই ওই প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এটি কি  সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের নাড়ী বোঝার চেষ্টা করা? তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ভারতের কাছে এতটাই নতজানু যে, ভারতের একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সেই স্বাধীনতাও নেই। পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কারণে আজও তিস্তা চুক্তি হয়নি। আর ভবিষ্যতেও হবে কি না তাও অনিশ্চিত। রিজভী বলেন, আমরা সরকারের উদ্দেশ্যে পরিষ্কার বলতে চাই- আজকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। এই প্রতিরক্ষা চুক্তি আমাদের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যা অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। লাখ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে কখনই ছিনিমিনি খেলতে দেবে না জনগণ। রিজভী বলেন, বাংলাদেশ সরকার আগ বাড়িয়ে দেশের সবকিছু এমনকি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পর্যন্ত দিল্লির দরবারে সঁপে দিচ্ছে। প্রস্তাবিত প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে এমনও কথা শোনা যাচ্ছে, দুই দেশ সম্মিলিতভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিধ্বংসী কোনো  গুরুতর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে একসঙ্গে তা মোকাবিলা করবে। এর অর্থ হচ্ছে- বিভিন্ন অজুহাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতকে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেয়া, এর ফলে যা হবে সেটি হচ্ছে- ভারতের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সোচ্চার জনগোষ্ঠীকে যাতে দমন করা সহজ হয়। আমরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলতে চাই- বাংলাদেশের মাটিতে কোনো বিদেশি সৈন্যকে বরদাস্ত করা হবে না। আমাদের দেশের অভ্যন্তরে যে কোনো অশুভ শক্তি সেটি উগ্রবাদী-জঙ্গিবাদী যে গোষ্ঠীই হোক সেটি দমন করতে আমাদের সামরিক বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই যথেষ্ট। আমাদের সামরিক বাহিনী এবং র‌্যাব-পুলিশ যদি জাতিসংঘ বাহিনীতে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে সুনাম ও সাফল্য অর্জন করতে পারে তাহলে দেশের ভেতরের যে কোনো জঙ্গিবাদী উৎপাত দমন করতে তারা নিশ্চয়ই সক্ষম। বিএনপি-জামায়াত এর মদদেই জঙ্গি হামলা ঘটছে- আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যেই প্রমাণিত হয় জঙ্গি হামলার বেনিফিসিয়ারি কারা? কারা জঙ্গিবাদকে জিইয়ে রেখে দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছে? এ বিষয়টি জনগণের কাছে এখন পরিষ্কার হয়ে গেছে।

No comments

Powered by Blogger.