বিশ্বায়নের কাল- নির্যাতন বিচারে ব্রিটিশ আদালতের এখতিয়ার by কামাল আহমেদ

বছরের শুরুর একটি ঘটনা হয়তো অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে—নেপালের সঙ্গে ব্রিটেনের কূটনৈতিক বিরোধ। কিন্তু যে বিষয় ঘিরে এই বিরোধ, তার প্রভাব যে শুধু এই দুই দেশের মধ্যে আটকে থাকবে, ব্যাপারটি তেমন নয়।
ব্রিটেনের পুলিশ নেপাল সেনাবাহিনীর একজন কর্মকর্তা, কর্নেল কুমার লামাকে সে দেশে গৃহযুদ্ধ চলাকালে নির্যাতনের অভিযোগে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক আইনে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যুদ্ধাপরাধ বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্বটি যুক্তরাজ্যে পালন করে থাকে মেট্রোপলিটন পুলিশ। দ্য ক্রিমিনাল জাস্টিস অ্যাক্ট, ১৯৮৮-এর ১৩৪ ধারায় বিদেশে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন বা নির্যাতনের অপরাধ তদন্তে ব্রিটেনে পুলিশের এ ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তবে তা প্রয়োগের দৃষ্টান্ত বিরল।
এই আইনে ব্রিটেনে এর আগে দক্ষিণ লন্ডনে বসবাসরত আফগান ওয়্যারলর্ড ফারইয়াদি জারদাদকে ২০০৫ সালে সংঘটিত অপরাধের জন্য বিচার করে ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। আইনটিতে যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অপরাধের বিচার অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ বিচারব্যবস্থার এখতিয়ার তাদের সার্বভৌম সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে।
কর্নেল লামাকে গ্রেপ্তার করা হয় ৩ জানুয়ারি এবং গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই নেপালের সরকার ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়ে বলে যে তাদের নাগরিককে নিজেদের দেশের কোনো কর্মকাণ্ডের জন্য ভিন্ন একটি দেশ বিচার করতে পারে না। এটা নেপালের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল।
কিন্তু নেপাল সরকারের ওই প্রতিবাদে কোনো কাজ হয়নি। ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী এবং নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে মানবাধিকারকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার আন্তর্জাতিক দায়িত্বের কারণে পুলিশ এ ব্যবস্থা নিয়েছে।
৫ জানুয়ারি লন্ডনের একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বিচারাধীন আসামি হিসেবে আটক রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দুই ব্যক্তির ওপর শারীরিক নিপীড়ন চালিয়েছিলেন এবং তাঁদের ভোগান্তির কারণ ঘটিয়েছেন। বিভিন্ন খবরে বলা হয়, অভিযোগটি ২০০৫ সালের এবং নির্যাতনের শিকার এই দুজন নেপালি নাগরিক সেখানকার মানবাধিকার সংগঠন, অ্যাডভোকেসি ফোরামের সহায়তায় এবং লন্ডনের একটি আইনি সেবাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ করায় এই তদন্ত শুরু হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ যাঁরা নেপালে গৃহযুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের বিচার দাবি করে আসছেন, সেসব মানবাধিকার সংগঠকেরা ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। গার্ডিয়ান জানায়, গৃহযুদ্ধের সময় নেপালের পুলিশ-প্রধান কুবের সিং রানার ভূমিকার কারণে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর উদ্বেগের পটভূমিতে ব্রিটিশ সরকার গত নভেম্বর মাসে তাঁকে ভিসা দেয়নি। নেপালে ১৯৯৬ থেকে শুরু হওয়া মাওবাদী বিদ্রোহের অবসান ঘটে ২০০৬ সালে এক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে। ওই গৃহযুদ্ধে ১২ হাজারেরও বেশি লোকের প্রাণহানি ঘটে এবং অভিযোগ ওঠে হাজার হাজার মানুষকে নির্যাতনের। কিন্তু রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে এসব নির্যাতনের ঘটনার তদন্ত বা বিচারের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।
কর্নেল লামার বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে, যে আইনে সেই আইনটি প্রয়োগ হওয়ার কথা সাধারণত সেসব ক্ষেত্রে, যেখানে নির্যাতনকারী সরকার বা রাষ্ট্রের পক্ষে কাজটি করেছেন। তবে, এর আগে আফগান ওয়্যারলর্ড ফারইয়াদি জারদাদের যে বিচার করা হয়েছিল, সেই জারদাদ কোনো সরকারি পদ বা দায়িত্বে না থাকলেও তাঁকে এই একই আইনে বিচার করে ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। হাইকোর্টও তাঁকে ডি ফ্যাক্টো পাবলিক অফিশিয়াল (কার্যত সরকারি কর্মকর্তা) হিসেবে গণ্য করে বিচারের বিষয়টি অনুমোদন করেন। ফারইয়াদি জারদাদের কাহিনি আরও নাটকীয় এবং মানবাধিকার হরণকারীর বিচারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আফগানিস্তানে রুশ আগ্রাসনের সময় নব্বইয়ের দশকে মুজাহিদিন মিলিশিয়াদের একটি দলের নেতৃত্বে থেকে অপহরণ ও নির্যাতনের বহু নৃশংসতার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। তালেবান গোষ্ঠীর ক্ষমতা দখলের সময় তিনি ভুয়া পরিচয়ে ব্রিটেনে পালিয়ে আসেন। এরপর বিবিসির অনুসন্ধানে তাঁর অতীত অপকর্ম ফাঁস হয়ে গেলে তাঁকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায় ব্রিটিশ সরকার। প্রথম দফায় ২০০৪ সালে জুরিরা তাঁকে অপরাধী সাব্যস্ত করতে ব্যর্থ হলেও ২০০৫ সালে তাঁকে দ্বিতীয় দফায় বিচারের মুখোমুখি করা হয়। কাবুলে ব্রিটিশ দূতাবাসে সাক্ষীদের কয়েকজনকে নিয়ে এসে পরিচয় গোপন রেখে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত ২০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে বিচারক সাজা ভোগের পর তাঁকে আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানোর আদেশ দেন।
এরও অনেক আগে, ১৯৯৯ সালে, চিলির কুখ্যাত সামরিক শাসক অগাস্টো পিনোশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ বিচারে ব্রিটেনের এখতিয়ার আছে কি না, সেই প্রশ্নের মীমাংসা করে ব্রিটেনের সে সময়কার সর্বোচ্চ আপিল আদালত ল লর্ডস (লর্ডস অব অ্যাপিল ইন অর্ডিনারি) রায় দেন যে নির্যাতন এমন একটি অপরাধ, যার বিচারের এখতিয়ার বিশ্বজনীন।
এসব বিচারিক দৃষ্টান্ত থাকার পরও বাংলাদেশে যাঁদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে, তাঁরা কীভাবে বছরের পর বছর নির্বিঘ্নে ব্রিটেনে বসবাস বা আসা-যাওয়া করেন, তা রীতিমতো একটা রহস্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আছে, এ রকম অন্তত দুজন ব্রিটেনে স্থায়ী অভিবাসী হিসেবে বসবাস করছেন। আর, বাংলাদেশের ‘জেনারেল পিনোশে’ তো ফি-বছরই লন্ডন সফর করে থাকেন। নৃশংসতা কিংবা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার কোনো ভুক্তভোগী অথবা তাঁদের পক্ষে কোনো মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান যুক্তরাজ্যে এঁদের বিরুদ্ধে অদ্যাবধি কোনো আইনি উদ্যোগ নিয়েছে বলে শোনা যায়নি। সে রকম কিছু হলে বিচারবঞ্চিত ভুক্তভোগীরা একদিন বিচার পেলেও পেতে পারেন। অনেকে বলে থাকেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কার্যকারিতা ওই সনদ গৃহীত হওয়ার আগের কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না। কিন্তু জেনারেল পিনোশে ও জারদাদের ক্ষেত্রে নির্যাতনের অপরাধ বিচারে বৈশ্বিক এখতিয়ারের দৃষ্টান্তগুলো তো এ ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
ফিরে আসি কর্নেল লামার গ্রেপ্তার ও বিচারের বিষয়ে। কর্নেল লামাকে গ্রেপ্তারের পর বিচারের মুখোমুখি করানোর সিদ্ধান্ত সম্পর্কে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, এই গ্রেপ্তার নেপাল ও অন্যান্য দেশে যাঁরাই নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত, তাঁদের জন্য একটা হুঁশিয়ারি সংকেত। আর সাবধানবাণীটি হচ্ছে, নির্যাতনে অংশ নিলে বিচার থেকে পার পাওয়া যাবে না। আশা করি, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো পরিচালনার দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা এই সাবধানবাণীতে কান দেবেন। অতীতে নিরাপত্তা বাহিনীর অনেক সদস্যকেই দেখা গেছে, রাজনৈতিক কারণে অথবা কর্তৃপক্ষকে খুশি করার আশায় তাঁরা তাঁদের পোশাক বা পদের অপব্যবহার করে সাময়িক সময়ের জন্য দাপট দেখিয়ে বেড়িয়েছেন। আর, সরকারবদলের আগেই তাঁরা সাগর পাড়ি দিয়ে অভিবাসী হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম সারির রাজনীতিকদের অনেকেরই জবানিতে এ ধরনের নির্যাতন সহ্য করার দুর্ভাগ্যের কথা অতীতে শোনা গেছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, সন্দেহ কিংবা হয়রানি—এগুলোর যেকোনোটির কারণে কাউকে হেফাজতে নেওয়ার পর স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে নির্যাতন নিরাপত্তা বাহিনীতে বহুদিনের সংস্কৃতি বা অভ্যাসের অংশ হয়ে রয়েছে। আশা করি, ব্রিটেনে নেপালি কর্নেলের এই বিচার-প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা-ব্যবস্থাপকদেরও টনক নড়বে।
আশার কথা অবশ্য এই যে গত ডিসেম্বরে লন্ডনে বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতারা মানবাধিকার সংগঠক এবং ব্রিটিশ এমপিদের সঙ্গে এক সভায় অঙ্গীকার করে গেছেন, জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সনদের আলোকে নির্যাতনকে সংজ্ঞায়িত করে তা প্রতিকারের লক্ষ্যে তাঁরা আইন পাস করবেন।

লন্ডন
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি।

No comments

Powered by Blogger.