বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ by মো. শরিফ উদ্দিন

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয় দেশের জনগণের টাকায়। এ দেশের খেটে খাওয়া শ্রমিক, মজুর, কুলি, শ্রমজীবীসহ সব মানুষের দেওয়া ট্যাক্সের টাকায় সরকারের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত হয়।
সমাজের নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। কারণ হিসেবে বলা যায়, প্র্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে যে খরচ তা একজন গ্রামের কৃষকের পক্ষে বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ছাড়া প্রতিবছর বাড়ছে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী সংখ্যা। এখন দেশের আপামর সাধারণ জনতার কাছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগটি বহুল প্রত্যাশিত। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষ স্নাতক (সম্মান) শ্রেণীতে গতবারের চেয়ে এবার প্রায় দুই শতাধিক আসনসংখ্যা কমানো হয়েছে। এ আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত শিক্ষা ধ্বংসের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনোভাবেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া যায় না। প্রতিবছর বাড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী সংখ্যা। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রয়োজন হচ্ছে নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের। জনগণের টাকায় পরিচালিত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ক্রমবর্ধমান আসনসংখ্যা বৃদ্ধি সময়ের দাবি। এ মুহূর্তে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসনসংখ্যা কমানো কতটা অযৌক্তিক। বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক দিক হলো দিন দিন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে উচ্চশিক্ষার চাহিদাও বাড়ছে। কিন্তু নেতিবাচক দিক হলো উচ্চশিক্ষার চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে না। এর মধ্যে যদি আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা কমানো হয়, তাহলে সেটা প্রশ্নবিদ্ধ। সাধারণত প্রতিবছরই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়। বাড়ানো সম্ভব না হলেও অন্তত আসন সংখ্যা সমান রাখা হয়। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসন উল্টোপথে হাঁটছে। এ ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল কোটা সংখ্যা কমানোর। কিন্তু প্রশাসন ঠিকই মেধাবী সংখ্যা কমিয়ে কোটাধারী সংখ্যা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষিতের হার যখন ক্রমাগত নিচের দিকে যাচ্ছিল, তখন সরকার বেতনমুক্ত শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাবৃত্তি চালু করেছে। এর ফলে বাড়ছে লাখ লাখ উচ্চ মাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থী। বেতনমুক্ত শিক্ষার ফলেই আজ অনেক গরিব পরিবারের সন্তান এইচএসসি পাস করতে পারছে। কিন্তু উচ্চশিক্ষার বেলায় ব্যক্তিগতভাবে তাদের পক্ষে খরচ বহন করা আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। যদি শিক্ষার সুযোগই না থাকে, তবে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারটি অর্থহীন। প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আবেদন করার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ছে প্রায় লক্ষাধিক। কিন্তু এর বৃহৎ এক অংশ উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে। এর কারণ এই নয় যে তারা মেধাবী নয়, বরং মেধা থাকা সত্ত্বেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আসন সংকটের ফলেই তারা এখান থেকে ঝরে পড়ছে। বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ ৩০-৪০ হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি করা সম্ভব। অথচ বর্তমানে জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্রসংখ্যাই ৬০ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফলে একজন ছাত্রকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হয়। বাকি থাকে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বাংলাদেশের কয়টি পরিবার প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে সক্ষম? যেখানে পেটের ভাত জোগাতেই তারা ব্যর্থ, সেখানে প্রতি মাসে উচ্চহারে টিউশন ফি দিয়ে লেখাপড়া করতে পারবে কয়টি পরিবারের সন্তান? সঙ্গে মেস বা হোস্টেলে থাকার খরচ তো আছেই। এখানে যুক্তি দেখানো হচ্ছে ক্লাসরুম সংকট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ক্লাস সংকটের জন্য আসনসংখ্যা কমাতে হবে কেন? হতে পারে, আসন বাড়বে না। তা ছাড়া এখন যারা প্রথমবর্ষ বা দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছে তারা যদি ক্লাস করতে পারে, তাহলে সমানসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করতে সমস্যা কোথায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি একটি ক্লাসে ১০০-১৫০ জন শিক্ষার্থী ক্লাস করতে পারে, তবে জাহাঙ্গীরনগরে কেন সম্ভব নয়? এখানে ক্লাসরুম সংকট থাকতে পারে, সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করে ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। আরও একটি কথা বলা হচ্ছে সেটা হলো, শিক্ষক স্বল্পতা। এটা খোঁড়া অজুহাত ছাড়া কিছুই নয়। আমরা দেখেছি, গত তিন বছরে দুইশ' শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে মূল্যবান বিষয়টি হচ্ছে, দুইশ' শিক্ষক নিয়োগের আগে যে শিক্ষকরা ছিলেন তারাই সমপরিমাণ শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছিলেন এবং শিক্ষা কার্যক্রম খুব ভালোভাবেই চলছিল। তারপরও অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। প্রশ্ন হলো, একটি ব্যাচের একটি কোর্স নিতে কতজন শিক্ষকের দরকার? আর সেই ক্লাসে শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে শিক্ষক সংখ্যার কী সম্পর্ক? যদি এমন হতো যে, শিক্ষক সংকটের কারণে নতুন বিভাগ খুলবে না, তাহলে তা যৌক্তিক ছিল; কিন্তু একটি ক্লাসে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২০ হলেও এর জন্য যে পরিমাণ শিক্ষক দরকার শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬০ বা ১০০ হলেও শিক্ষক সংখ্যা সমানই প্রয়োজন। সুতরাং শিক্ষক সংকটের কারণে আগের তুলনায় আসন কমিয়ে ফেলা কোনো যুক্তিতেই পড়ে না। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই শিফটে পাঠদান করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কারণ দুপুরের পরে হাতেগোনা দু'একটি বিভাগ ছাড়া কোনো বিভাগেই ক্লাস হয় না। আমরা দেখেছি, গত উপাচার্যের পদত্যাগের অন্যতম কারণ ছিল মধ্যে অতিরিক্ত পরিমাণ শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া। এখনও যদি তাই হয় তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে। আমি মনে করি, এ মুহূর্তে ছাত্রদের আসন কমিয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া আত্মঘাতী ছাড়া আর কিছু নয়। প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর জীবন থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগবঞ্চিত করা শিক্ষার অনুন্নয়নে ভয়াবহ ক্ষতিকর একটি সিদ্ধান্ত। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য যে বাজেট আসবে, তাতে কিন্তু ওই দুইশ'জন শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কারণ, এই সংখ্যাটি আগে ছিল। আর বাজেট কখনও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ার পরিবর্তে কমবে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আহ্বান আবারও আসনসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা জরুরি।

ড. মো. শরিফ উদ্দিন : অধ্যাপক ও সাধারণ সম্পাদক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষক সমিতি
msharifju@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.