চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের কাণ্ড-পাবলিক পরীক্ষায় আইন ভেঙে ৩০ লাখ টাকা আদায়

বেআইনিভাবে পাবলিক পরীক্ষায় গত তিন বছরে ৩০ লাখের বেশি টাকা আদায় করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। বিজি প্রেস থেকে পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র আনা বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে এই বিপুল অর্থ আদায় করা হয়েছে। কেন্দ্রসচিবদের মাধ্যমে নেওয়া এই অর্থ আদায়ের হিসাব শিক্ষা বোর্ডও জানে না।


চট্টগ্রামের বিভিন্ন কেন্দ্রসচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এনসিসি ব্যাংক জুবিলি রোড শাখার একটি নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে পরীক্ষার্থীর সংখ্যার অনুপাতে টাকা জমা দিতে হয়। পিএসসি, জেএসসি ও এসএসসিতে প্রতি পরীক্ষার্থী বাবদ চার টাকা এবং এইচএসসিতে পাঁচ টাকা হারে ব্যাংকে টাকা জমার রসিদ দেখিয়ে কেন্দ্রসচিবদের জেলা প্রশাসনের ট্রেজারি থেকে প্রশ্নপত্র নিতে হয়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর নামকরা এক কলেজের অধ্যক্ষ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'অন্য কোনো জেলায় পরীক্ষার্থীপ্রতি ফি আদায় করা হয় না। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র আনা বাবদ ব্যয় হিসাব করে কেন্দ্রগুলোকে বলে দেওয়া হয় কে কত টাকা দেবে। এ ক্ষেত্রে চট্টগ্রামই ব্যতিক্রম।
এখানে প্রতি পরীক্ষার্থী হিসাব করে টাকা আদায় করা হয়।'
কক্সবাজার সরকারি মহিলা কলেজের প্রধান অফিস সহকারী আবু কায়সার বলেন, 'আমাদেরকে পরীক্ষার্থী অনুযায়ী কোনো টাকা জেলা প্রশাসনে জমা দিতে হয় না। বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র আনা বাবদ যত টাকা খরচ হয় তা আমাদেরকে জানিয়ে দেওয়া হয় এবং আমরা জেলা প্রশাসনে টাকা দিয়ে থাকি।'
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গত তিন বছরে চট্টগ্রাম জেলায় এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় ৯০ হাজার। সে অনুযায়ী প্রতি পরীক্ষার্থী থেকে পাঁচ টাকা হারে চার লাখ ৫০ হাজার টাকা জেলা প্রশাসনের হিসাবে জমা হয়। একইভাবে গত তিন বছরে এসএসসি, জেএসসি ও পিএসসিতে চট্টগ্রামের মোট পরীক্ষার্থী ছিল প্রায় সাড়ে ছয় লাখ। প্রতি পরীক্ষার্থী থেকে চার টাকা করে সংগ্রহ করলেও এ সময় জেলা প্রশাসনের হিসাবে ২৬ লাখ টাকা জমা হয়েছে।
তাৎপর্যের বিষয় হলো, পাবলিক পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় শিক্ষার্থীরা এই টাকা জমা দিলেও শিক্ষাবোর্ড 'কেন্দ্র ফি'র টাকার কোনো হিসাব রাখে না। এমনকি কেন্দ্র ফির টাকা থেকে জেলা প্রশাসনকে দেওয়ার জন্যও কোনো নির্দেশনা নেই।
এদিকে এসব পাবলিক পরীক্ষা ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্সের পরীক্ষার প্রশ্নপত্র বিজি প্রেস থেকে আনা বাবদও কলেজগুলোকে জেলা প্রশাসনে টাকা জমা দিতে হয়।
পরীক্ষার নামে এভাবে টাকা আদায় সম্পূর্ণ অযৌক্তিক উল্লেখ করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা জানান, গত এসএসসি পরীক্ষায় এই টাকা নিয়ে চট্টগ্রামের এক সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বাগ্বিতণ্ডা হয়। তার পরও শিক্ষার্থীপ্রতি চার টাকা করে জমা দিতে হয়েছে। শিক্ষকরা এর বিরোধিতা করলেও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা টাকা আয়ের বাড়তি উৎস হিসেবে পাবলিক পরীক্ষাকে ব্যবহার করে চলেছে।
কেন্দ্রসচিবদের কাছ থেকে টাকা আদায় প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসনের শিক্ষা শাখার কর্মকর্তারা জানান, বিজি প্রেস থেকে প্রশ্নপত্র আনা, ট্রেজারির খরচ, পুলিশের অতিরিক্ত সম্মানী ও সার্বক্ষণিক একজন ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত থাকা এবং এ কাজে সহায়তাদানকারী জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এই টাকা ভাগ করে দেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহম্মদের সঙ্গে টেলিফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) খালেদ মনসুরকে টেলিফোন করলে এ ব্যাপারে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

No comments

Powered by Blogger.