এই সময়-মঙপুতে আবার by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

মৈত্রেয়ী দেবীর জবানিতে এত দূর থেকেও মঙপুর সেই পাহাড়ি বাংলোয় রবীন্দ্রনাথের গাওয়া গানটি যেন আমার কানে বাজছে। রবীন্দ্রনাথের গানকে বলেছি 'অন্তর্যাত্রা'। এর আগে তার জীবনে 'যাত্রা'র মূল্য অনুধাবন করেছি 'জীবনস্মৃতির' নানা রচনায়,


বিশেষ করে
তার 'যাত্রার পূর্বপত্র' ও
'যাত্রা' রচনায়
মঙপুতে গেছেন এমন লোকের সংখ্যা বেশি নয়। কালিমপঙ থেকে মঙপু মাত্র এক ঘণ্টার পথ। আমার খুব ইচ্ছা ছিল সেখানে একবার যাব। কারণ একটাই, তা হলো ১৯৩৮-এ রবীন্দ্রনাথ সেখানে একবার গিয়েছিলেন। আরেকবার যান ১৯৩৯-এর ১৪ মে। পুরি থেকে মঙপু এসে গ্রীষ্মাবকাশ কাটিয়ে ১৭ জুন কলকাতায় নেমে যান। আবার সে বছরেরই শরৎকালে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত এবং চতুর্থবার ১৯৪০-এর ২১ এপ্রিল থেকে ৮ মে পর্যন্ত কালিমপঙে থাকেন। রবীন্দ্রনাথের এই মঙপু থাকা অবস্থায় তার মুখের কথা নিয়ে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন মৈত্রেয়ী দেবী। বইটির নাম 'মঙপুতে রবীন্দ্রনাথ'। এর অনেক সংস্করণ বেরিয়েছে। লেখিকার নিজের কাছে শুনে ও বইটি পড়ে মঙপু সম্পর্কে আবার উৎসাহী হয়ে উঠি। এত সুন্দর একটি জায়গায় রবীন্দ্রনাথের সাহচর্যে যা তিনি অর্জন করেছিলেন, তা সবার পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়।
কিছুদিন আগে চ্যানেল আইয়ে এক ঘণ্টার একটি অনুষ্ঠান হয়। মঙপুতে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা রবীন্দ্রনাথের বেশ কয়েকটি গান গেয়ে যান, যা রবীন্দ্রনাথ, মঙপু ও মৈত্রেয়ী দেবীর সঙ্গে একাকার রেজওয়ানার কণ্ঠের অপূর্ব পরিবেশনা। গানগুলো যেন কবিগুরু এইমাত্র লিখেছেন, এইমাত্র সুর দিয়েছেন এবং এইমাত্র বাংলাদেশের সেরা শিল্পীর কণ্ঠে প্রথমবার শুনছি। মঙপুতে হিমালয় পাহাড়ের শিরশিরে হাওয়ায় যেখানে পতপত করে উড়ছে লামাদের সাদা পতাকাগুলো, রবীন্দ্রনাথ কাটিয়েছেন যেখানে তার অমূল্য প্রহর হিমালয় পর্বতের নানা শৃঙ্গের সানি্নধ্যে, সেখানে থেকে যখন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা পরিবেশন করেন প্রেমময় গীতি, 'দূরে কোথাও দূরে দূরে, আমার মন বেড়ায় যে ঘুরে ঘুরে', তখন যেন হিমালয়ের ঢেউ খেলানো পর্বতশৃঙ্গ, পাগলা ঝোরার কুলুকুলু ধ্বনি গানের মধ্যে এসে নেয় আশ্রয়, রবীন্দ্র উপলব্ধির নতুন পাওয়া বৈ তো নয়।
'মঙপুতে রবীন্দ্রনাথ'-এর লেখক মৈত্রেয়ী দেবীর পাম এভিনিউর বাড়িতে ভরা মজলিসে গান গেয়েছি। আমাকে নিজেই তার বইটি উপহার দিয়েছিলেন। বইটি পড়লে তার অনেক গানের অন্তরের সুর শুনতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে যে গানটি আমার প্রিয় :
যদি জানতেম আমার কিসের ব্যথা তোমায় জানাতাম
কে যে আমায় কাঁদায়, আমি কী জানি তার নাম।
রবীন্দ্রনাথ এক সন্ধ্যায় চৌদ্দ-পনেরটি গান গেয়েছিলেন। ওপরের গানটি দিয়ে শুরু। মৈত্রেয়ী লিখছেন : 'তখন অন্ধকার গভীর হয়ে এসেছে_ মঙপুর নির্জন অন্ধকার_ চারদিকে গভীর নীরবতা। আমরা ক'টি প্রাণী তাঁর পায়ের কাছে পুঞ্জীভূত হয়ে বসে আছি_ ঘরের একটি মাত্র আলো তাঁর হাতের বই আর মুখের চারপাশে একটি জ্যোতির্মণ্ডল সৃষ্টি করেছে ...'।
আরেক দিনের কথা। কবি গাইছেন :
'মনে রয়ে গেল মনের কথা
চোখের জল আর প্রাণের ব্যথা
মনে করি দু'টো কথা বলে যাই
কেন মুখপানে চেয়ে চলে যাই
সে যদি চাহে, মরি যে তাহে
কেন মুদে আসে আঁখির পাতা'।
'এইসব হল আমার আগেকার গান_ এ গান তোমরা কখনও শোননি।'
সেদিন একটা হিন্দুস্থানি গানও করেছিলেন_
'বালমারে চুনরিয়া মুহুকা লাল রঙ্গা দে
জেয়সে তেরি পাগিয়া
এইসে মোরিরে চুনরিয়া'
অর্থ : তোমার ওই পাগড়ির রঙে রাঙিয়ে দাও আমার ওড়না।
মৈত্রেয়ী দেবীর জবানিতে এত দূর থেকেও মঙপুর সেই পাহাড়ি বাংলোয় রবীন্দ্রনাথের গাওয়া গানটি যেন আমার কানে বাজছে।
রবীন্দ্রনাথের গানকে বলেছি 'অন্তর্যাত্রা'। এর আগে তার জীবনে 'যাত্রা'র মূল্য অনুধাবন করেছি 'জীবনস্মৃতির' নানা রচনায়, বিশেষ করে তার 'যাত্রার পূর্বপত্র' ও 'যাত্রা' রচনায়। 'যাত্রা'য় শেষ স্ট্যাঞ্জায় তার মনোভাবটি ছিল নিম্নরূপ :
কেবলমাত্র চলিবার আনন্দটুকুই পাইব বলিয়া আমি বাহির হইয়াছি। ... অনেক দিন আমাদের আশ্রমের বাড়িতে দোতলার বারান্দায় একলা বসিয়া যখন আমাদের সামনের শালগাছগুলোর উপরের আকাশের দিকে তাকাইয়াছি, তখন সেই আকাশ দূরের দিকে তাহার তর্জনী বাড়াইয়া দিয়া আমাকে সংকেত করিয়াছে। যদিও সেই আকাশটি নীরব তবু দেশ-দেশান্তরের যত অপরিচিত গিরিনদী-অরণ্যের আহ্বান কত দিগ্দিগন্ত হইতে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিয়া এই আকাশের নীলিমাকে পরিপূর্ণ করিয়াছে। নিঃশব্দ আকাশ বহু দূরের সেই-সমস্ত মর্মরধ্বনি, সেই-সমস্ত কলগুঞ্জন, আমার কাছে বহন করিয়া আনিত। আমাকে কেবলই বলিত, 'চলো, চলো, বাহির হইয়া এসো।'
কয়েক দিন আগে রেজওয়ানার বাবা মারা যান। আমার সঙ্গে খান সাহেবের দীর্ঘ পরিচয়। সেদিন আমি সিলেটের বানিয়াচংয়ে এক অনুষ্ঠানে। বারবার ফোন করেও রেজওয়ানাকে পেলাম না। মেয়েকে রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রবেশ করানোর জন্য শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন যারা তাদের পথিকৃৎ তিনি। খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। সারাদিন নামাজ-রোজায় তার দিন কাটত।
রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীকে যেসব কথা বলেছিলেন, তা নিয়ে মাঝে মধ্যে ভাবি। একদিনও পরকালের কথা নয়, বরং সারাদিন বলতেন এমন সব কথা যা তার কাব্যের সঙ্গে সংশিল্গষ্ট।
মৈত্রেয়ী লিখছেন : এই গিরিতটে মেঘ-রোদ্রের খেলা চলেছে, নীলিম অরণ্যের নীলিমা ম্লান হয়নি, তা জানি। নির্মম প্রকৃতি হাসি মুখে চেয়ে আছে, জানে না তার দর্শক নেই, তবু আজ মনে করতে চাই শেষ ক্ষয় হয়নি, ভরা পাত্র শূন্য নয়_
এ জীবনের পাওয়াটিরই সীমাহীন মূল্য
মরণে হারানোটা তো নহে তাহার তুল্য।
বইটির পদে পদে বিস্ময়, পদে পদে রবীন্দ্রনাথের নতুন রচনা, যা আর কোথাও নেই। 'মঙপুতে রবীন্দ্রনাথ' নতুন রঙে উদ্ভাসিত। যারা রেজওয়ানাকে দেখেছেন মঙপুতে, তারা পাবেন আরও খানিকটা।

মুস্তাফা জামান আব্বাসী : সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব
mabbasi@dhaka.net
 

No comments

Powered by Blogger.