'হুমায়ূন নুহাশপল্লীর কথাই বলে গেছেন' by শরীফুল আলম সুমন

বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে দেশবরেণ্য কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বলেছেন, 'নুহাশপল্লী ছাড়া অন্য কোথাও গেলে ও ভয় পায়। ওকে কষ্ট দেবেন না। ওর আত্মা নুহাশপল্লীতে পড়ে আছে। ও প্রতিদিন নুহাশপল্লীর ভিডিও দেখত। আমি আমার বাচ্চাদের বাবাকে দূরে কোথাও রাখতে চাই না।


নুহাশপল্লীর মাটির প্রতিটি ইঞ্চির ঘাস তার চেনা। আপনারা দয়া করে তাকে সেখানেই দাফনের ব্যবস্থা করুন।'
দেশে ফিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন শাওন। তাঁর কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। কান্নাজড়িত গলায় দাফনের বিষয়ে মতামত জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, 'ওর শেষ ইচ্ছা ছিল নুহাশপল্লীতেই যেন ওকে দাফন করা হয়। অপারেশনের আগের রাতে সে আমাকে বলেছিল, আমার যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমাকে নিয়ে সবাই টানাটানি করবে। কুসুম (শাওন), তুমি আমাকে নুহাশপল্লীতে নিয়ে যেও। আমাকে টানাটানি করতে দিও না।'
শাওন শোকে এতটাই বিহ্বল ছিলেন যে, উঠে দাঁড়ানোর শক্তি ছিল না তাঁর। তাই বিমান থেকেই হুইল চেয়ারে তাঁকে নামানো হয়। কাঁদতে কাঁদতে দুই হাত জোড় করে তিনি বারবার একই অনুরোধ করেন, যেন নুহাশপল্লীতেই চিরদিনের মতো হুমায়ূন আহমেদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়। তিনি আবারও বলেন, 'অন্য কোথাও দাফন করা হলে আমার সন্তানদের বাবার আত্মা কষ্ট পাবে।'
এ সময় পররাষ্ট্রসচিব মিজারুল কায়েস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ তাঁকে সান্ত্বনা দেন এবং বলেন, তাঁর কথামতোই সবকিছু করা হবে। কাঁদতে কাঁদতে আরো দুর্বল হয়ে গেলে তাঁর মা তহুরা আলী এমপি এবং বোন সেঁজুতি দ্রুত সেখান থেকে শাওনকে নিয়ে যান। মায়ের কান্না আর লোকজনের ভিড় দেখে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে তাঁদের ছোট ছেলে নিনিত।
দেশবাসী অপেক্ষায় ছিল হুমায়ূন আহমেদ চিকিৎসা শেষে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরবেন মা-মাটির দেশে। আগামী বইমেলায় আবারও তারা পাবে নতুন নতুন বই। হুমায়ূন আহমেদ দেশে ফিরেছেন ঠিকই কিন্তু কফিনে বন্দি হয়ে। তিনি পাঠককে দিতে পারবেন না আর নতুন নতুন বই, নাটক বা সিনেমা। দেশ হারাল এক নন্দিত কথাসাহিত্যিককে।
গতকাল সকাল ৮টা ৫৪ মিনিটে ইকে-৫৮২ নম্বর ফ্লাইটে এমিরেটস এয়ারলাইনসের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের জেএফকে বিমানবন্দর থেকে দুবাই হয়ে হুমায়ূন আহমেদের কফিন নিয়ে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছে। আগে থেকেই ফুলে সজ্জিত অবস্থায় ছিল জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের লাশবাহী ফ্রিজার ঢাকা মেট্রো-শ ১১-১৩৮০ নম্বরের ভ্যানটি।
সকাল ৯টা ১০ মিনিটে সুসজ্জিত একদল পুলিশ সদস্য কাঁধে করে বিমান থেকে তাঁর কফিন ফ্রিজার ভ্যানে তোলেন। এ সময় কফিনের এক পাশে কাঁধ দেন হুমায়ূনের ছেলে নুহাশ, যাঁর পরনে ছিল বাবার সৃষ্ট চরিত্র হিমুর সেই হলুদ পাঞ্জাবি। এ সময় দুই মেয়ে শীলা ও নোভা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে তাঁরা তিনজনই মিডিয়ার সামনে কোনো কথা বলেননি। সকাল সোয়া ৯টায় লেখকের মরদেহ নিয়ে ফ্রিজার ভ্যানটি ভিভিআইপি টার্মিনাল দিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশে বিমানবন্দর ত্যাগ করে।
একই বিমানে আসেন তাঁর স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন, তাঁদের দুই ছেলে নিষাদ ও নিনিত, শাওনের মা তহুরা আলী এমপি, বোন সেঁজুতি এম আফরোজ এবং পারিবারিক বন্ধু প্রকাশক মাজহারুল ইসলাম। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে লেখকের মরদেহ গ্রহণ করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, হুমায়ূনের ভাই মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও তাঁর স্ত্রী, ছোট ভাই আহসান হাবীব এবং তাঁদের দুই বোন।
সার্বিক পরিস্থিতি তদারক এবং লেখকের মরদেহ পরবর্তী গন্তব্যে নিয়ে যাওয়ার পথ নির্বিঘ্ন করতে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন তাঁর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিল এবং প্রধানমন্ত্রীর এপিএস সাইফুজ্জামান শিখর। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগর, শাইখ সিরাজ, গাজীপুরের সংসদ সদস্য জাহিদ আহসান রাসেল, বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের স্ত্রী মিলি রহমানসহ অন্যান্য নাট্যব্যক্তিত্ব।
এর আগে সকাল থেকেই বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জের ভেতর সাংবাদিকরা ভিড় করতে থাকেন। সকাল সাড়ে ৭টা থেকেই আসতে থাকেন হুমায়ূন আহমেদের পরিবারের সদস্যরা।
'জীবিত থাকতে তারা কোথায় ছিল'
হুমায়ূন আহমেদকে কোথায় দাফন করা হবে, তা নিয়ে বৈঠক ডাকার কথা উল্লেখ করে মেহের আফরোজ শাওন সাংবাদিকদের বলেন, 'জীবিত অবস্থায় যারা হুমায়ূন আহমেদের পাশে দাঁড়ায়নি, পারিবারিক মিটিং করেনি, তাদের অধিকার নেই এখন মিটিং করার। আমার একমাত্র চাওয়া হচ্ছে, তাঁর শেষ চাওয়া সবাই যেন পূরণ করে। সেটা করতেই হবে।'
শাওন বলেন, 'হুমায়ূন জীবিত থাকতে কেউ পারিবারিক মিটিংয়ের কথা বলেনি। কোথায় তাঁর চিকিৎসা হবে, কোন হাসপাতালে করলে ভালো হবে- সে বিষয়ে আলোচনা করতে আসেনি কেউ।' নুহাশপল্লী ট্রাস্ট করে দিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও হুমায়ূন আহমেদ এটি কারো নামে দিয়ে যাননি বলে দাবি করেন শাওন।

No comments

Powered by Blogger.