হুমায়ূন আহমেদ : হৃদয়জোড়া হাহাকার by সালেহ চৌধুরী

হৃদয়জোড়া হাহাকার কাকে বলে? আমার কাছে আজ তা একটি নাম- হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূনের প্রশ্ন ছিল- মানুষকে কেন এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হয়? আমি ভাবছি, যাঁর এত কিছু করার ইচ্ছে আর সামর্থ্য ছিল, তাঁকে কেন এমনভাবে এ রকম অসময়ে চলে যেতে হলো! জানি, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ক্ষমতা কারো নেই। নেই দেশময় ছড়িয়ে থাকা আমাদের মতো লাখ লাখ মানুষের আর্ত হাহাকারের কোনো নিদান।
হুমায়ূন আহমেদ ও আমার বয়সের ব্যবধান পুরো এক যুগ। আমরা কিন্তু ছিলাম ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হুমায়ূন আমাকে 'নানাজি' ডেকে বয়সের মর্যাদা দিলেও প্রথম পরিচয়ের পরই আমি তাঁকে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখে আসছিলাম। আমার অর্জন নেহাত বয়সের করুণা, তাঁর পাওয়া সবই অতুলনীয় সৃষ্টিক্ষমতার বলে। যে ক্ষমতার সঙ্গে মিশে ছিল দরদ আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা। হুমায়ূন কাউকে ছোট করে দেখতে জানতেন না।
হুমায়ূন সাহিত্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্যও তা-ই। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে অনেক নষ্ট মানুষের দেখা পাওয়া যায়। খুন পর্যন্ত কোনো মাত্রার অপকর্মেই তাদের আটকায় না। হাসতে হাসতে কারো চোখ উপড়ে নেওয়া কিংবা দাঁত খুঁটতে খুঁটতে কাউকে হত্যার পরিকল্পনা ওরা অনায়াসে করে নেয়। এসব চরিত্রও এমন মমতার সঙ্গে আঁকা যে ওদের কাজকে ঘৃণা করলেও ওদের ঘৃণা করতে কোথায় যেন বাধে।
মানবচরিত্র কখনো অবিমিশ্র হয় না। আলো-আঁধার নিয়েই জীবনের খেলা। আর এই আলো-আঁধারির সার্থক রূপকার হুমায়ূন আহমেদ। জীবন জেনে তার সত্য আর সৌন্দর্যকে উদ্ঘাটিত করাই যেন ছিল তাঁর ব্রত। বিদ্বজনেরা একেই সফল সৃষ্টির নিয়ামক গণ্য করে থাকেন। হুমায়ূন-সাহিত্যের জনপ্রিয়তার রহস্য এতেই নিহিত।
মধ্যবিত্তের আনন্দ-বেদনা মাখা আটপৌরে জীবন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, সমাজবিবর্তন, সমসাময়িক ইতিহাস থেকে পুরনো আমলের কথা এবং কল্পবিজ্ঞানের ওপর ভর করে অনাগত ভবিষ্যতের ছবি- কত কিছুই উঠে এসেছে তাঁর রচনায়। কখনো তা ছুঁয়ে গেছে পরাবাস্তবের সীমা। সব ধরনের লেখায়ই তিনি ছিলেন সমান সাবলীল। ভাষা প্রয়োগেও সমান কুশলী। সাধারণত কথ্য বাংলায়ই তিনি লিখতেন। তাতেও জুড়ে দিতেন এই বাংলার মাটির সুর ও গন্ধ। প্রয়োজনে কিন্তু অন্যধারা অবলম্বনেও ছিল না তাঁর দ্বিধা। যেমন 'বাদশা নামদার'-কে পুরনো আমেজ দিতে গিয়ে এই একটি লেখায় সাধুভাষা প্রয়োগ করেছেন। আর তাও এমন স্বচ্ছন্দে যে খুব মনোযোগী না হলে তা ধরাই পড়ে না। অধ্যাপক আহমদ শরীফ 'নন্দিত নরকে'-তে 'একজন সৃষ্টিশীল শিল্পীর', 'একজন কুশলী স্রষ্টার পাকা হাত' প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বলেছিলেন 'জীবনের প্রাত্যহিকতার ও তুচ্ছতার মধ্যেই যে ভিন্নমুখী প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির জটাজটিল জীবনকাব্য তার মাধুর্য, তার মহিমা, তার গ্লানি, তার দুর্বলতা, তার বঞ্চনা ও বিড়ম্বনা, তার শূন্যতার যন্ত্রণা ও আনন্দিত স্বপ্ন নিয়ে কলেবরে ও বৈচিত্র্যে স্ফীত হতে থাকে, এত অল্প বয়সেও লেখক তাঁর চিন্তাচেতনায় তা ধরতে পেরেছেন দেখে মুগ্ধ ও বিস্মিত।' প্রাজ্ঞ অধ্যাপক চিহ্নিত এই গুণাবলি তাঁর পরবর্তী সৃষ্টিগুলোয় আরো বিকশিত হয়েছে মাত্র। আর তাঁরই সুবাদে তিনি কেবল দেশেই পাঠকবর্গের অতুলনীয় শ্রদ্ধা ও প্রীতিই অর্জন করেননি, বিদেশেও গুণীজনের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর রচনা এরই মাঝে ভারত, রাশিয়া এবং জাপানে অনূদিত হতে শুরু করেছে।
লেখালেখির পাশাপাশি নাটকে-চলচ্চিত্রে-গানে এবং অংকনশিল্পেও রেখেছেন অজস্র অবদান। হুমায়ূন যেন আমাদের দুহাত ভরে দিতেই এসেছিলেন। তাঁর দেওয়ার পালা ফুরানোর আগেই তিনি চলে গেলেন। তাঁর এই প্রস্থান যেন আসর জমে ওঠার মুখে মূল গায়েনের উঠে যাওয়া। তাঁর বিদায়ের বেদনা তাই এমন দুর্বিষহ।
এলোমেলো ভাবনায় এ মুহূর্তে কত কথাই এসে ভিড় জমাচ্ছে। তার কিছু কিছু পাঠকদের কাছেও আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। হুমায়ূনের বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদও ছিলেন একজন খেয়ালি মানুষ। তাঁর অসংখ্য খেয়ালের একটি ছিল সন্তানদের নাম পাল্টানো। এতে একটা কাকতালীয় ব্যাপারও ঘটে গিয়েছিল। হুমায়ূনের জন্মের পর প্রথম তিনি নাম রাখেন 'শামসুর রহমান' এবং ডাকনাম 'বাচ্চু'। আমাদের প্রিয় কবি শামসুর রাহমানের ডাক নাম ছিল 'বাচ্চু'। এই মিল কাকতালীয়। শামসুর রাহমান তখনো এমন খ্যাতিমান হননি যে তাঁর নাম শুনে এ নাম রাখা হবে। কাকতালীয় হলেও এই নামকরণে কেমন যেন একটা ইঙ্গিত জড়িয়ে আছে। গত মাসে হুমায়ূন যখন কুড়ি দিনের জন্য দেশে এসেছিলেন, তখন তাঁর মধ্যে একটা বড় পরিবর্তন লক্ষ করেছিলাম। শত কাজে ব্যস্ত হুমায়ূন একটা নির্ধারিত সময়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া ছাড়া ঢালাও মেলামেশা পছন্দ করতেন না। তাঁর তেমন সময়ই ছিল না। সাক্ষাৎকার দেওয়া আর দীর্ঘ সময় ধরে ফটোসেশন চালিয়ে যাওয়াও ছিল তাঁর না-পছন্দ। এবার তার ব্যতিক্রম দেখলাম। দেখলাম, যে এসে যা-ই বলছে শুনছেন, ক্যামেরা ধরে প্রশ্নের পালা চালিয়ে গেলে একটানা জবাব দিতে যাচ্ছেন, উঠুন-ছাঁটুন-মুখ ফেরান বলে নির্দেশ দিলে ক্লান্ত মানুষটি অক্লান্তভাবে তা-ই করে চলেছেন। অনেক সময় আমি মানা করেছি। কেননা জানতাম, বেশি কথা বলা কিংবা ঢালাও মেলামেশায় চিকিৎসকদের মানা আছে। হুমায়ূন কিন্তু কোনো কথায় কান দেননি। বিরক্ত হয়ে নিজেই তাড়াতাড়ি তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিয়েছি।
আজ যখন তিনি নেই, ভাবতে গিয়ে মনে হচ্ছে যে দেশ ও মানুষের প্রতি ছিল তাঁর বুকভরা ভালোবাসা। তাদের কাছ থেকে বিদায় নেবেন বলেই সবার সঙ্গে মিশে, সব আবদার মেনে গেলেন এভাবে? তাঁকে ঘিরে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি আর আসবেন না। স্মৃতিই তাই আজ আমাদের শেষ আশ্রয়। এ স্মৃতি প্রেরণাদায়ী- এটুকুই সান্ত্বনা।

লেখক : সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.