বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ ও নেতৃত্ব আত্মজীবনী থেকে পুনর্পাঠ by ড. হারুন-অর-রশিদ

পূর্ব প্রকাশের পর) ১৯৪৬ সালে কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার সময় শহরের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া মানুষের মধ্যে খাদ্য পৌঁছে দেয়ার জন্য দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজে চাল বোঝাই ঠেলাগাড়ি ঠেলেছেন (পৃ. ৬৬)। ১৯৪৬ সালে আবুল হাশিমের সম্পাদনায় বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক মিল্লাত বের করা হলে, বঙ্গবন্ধু রাস্তায় হকারী করে ঐ পত্রিকা বিক্রি করেছেন (পৃ. ৪০)। রাজনীতি করার খরচ মেটানোর উদ্দেশ্যে ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাতকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতার পার্ক সার্কাসে রেস্টুরেন্ট দিয়েছিলেন (পৃ. ৮২, ৮৫)। দেশ ভাগের পূর্বে সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতায় ও আবুল মনসুর আহমদের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার তিনি কিছুকাল পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি হয়েছিলেন (পৃ. ৮৮)। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ঢাকা চলে আসেন এবং ১৫০ মোগলটুলী পার্টি হাউজে এসে ওঠেন। সেখানে একটি কক্ষে তিনি অপর এক বন্ধুর সঙ্গে বেশ কয়েক বছর থাকেন। এ সম্বন্ধে বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেন, ‘...সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকা এলাম। পূর্বে দু’একবার এসেছি বেড়াতে। পথ ঘাট ভাল করে চিনি না। আত্মীয়স্বজন, যারা চাকরিজীবী, কে কোথায় আছেন, জানি না। ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে প্রথমে উঠব ঠিক করলাম। শওকত মিয়া মোগলটুলি অফিসের দেখাশোনা করে। মুসলিম লীগের পুরনো কর্মী। আমার বন্ধু। শামসুল হক সাহেব ওখানেই থাকেন... ঘোড়ার গাড়ি ঠিক করলাম, ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে পৌঁছে দিতে.... শওকত আমাকে ... তার রুমেই জায়গা দিল” (পৃ. ৮৩)।
বঙ্গবন্ধু যে ভবিষ্যতে বড় মাপের নেতা হবেন, তা কৈশরেই বুঝা যাচ্ছিল। ১৯৩৮ সালে ফজলুল হক ও সোহ্রাওয়ার্দীর গোপালগঞ্জ আগমন উপলক্ষে গঠিত ছাত্রদের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর তিনি প্রধান ছিলেন। গোপালগঞ্জের মিশন স্কুলে পড়াকালীন তিনি স্কুলের ক্যাপ্টেন, গরিব মুসলমান ছাত্রদের কল্যাণার্থে গঠিত মুসলিম সেবা সংঘ, স্থানীয় মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ ডিফেন্স কমিটির তিনি সম্পাদক হয়েছিলেন। ১৯৪৩ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের পক্ষে ফরিদপুর অঞ্চলের নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালের ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সিলেটের গণভোটেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। দেশ বিভাগের পূর্বে রাজনীতি বা সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে অধিষ্ঠিত না হলেও, নিজ কর্মদক্ষতা গুণে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি হয়ে ওঠেন এক সুপরিচিত নাম। শুধু কলকাতা নয়, এর বাইরেও জেলা শহরে। একজন ত্যাগী, কর্মঠ, ভাল কর্মী হিসেবে তাঁর সুনাম ছিল। তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেন, ‘আমাকে যে কাজ দেয়া হতো আমি নিষ্ঠার সঙ্গে সে কাজ করতাম ....ভীষণভাবে পরিশ্রম করতে পারতাম’ (পৃ. ৩৭)। বঙ্গবন্ধু নীতি ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি, রাজনৈতিক দল ও দলের ঐক্যে বিশ্বাসী ছিলেন। কেননা, নীতি ও আদর্শ বিবর্জিত কোন দল বা দলের ঐক্য টিকেও থাকে না, দেশ ও জনগণের কল্যাণে কিছু করতেও পারে না। বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনে এই বিশ্বাস নিয়েই এগিয়েছেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের প্রাক্কালে তাঁর দল ও বাইরের কতিপয় নেতা শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীনে সে সময়ে সৃষ্ট কৃষক-শ্রমিক পার্টি, মওলানা আজাহার আলীর নেতৃত্বাধীন নেজাম-ই-ইসলাম ইত্যাদি দলের সঙ্গে মুসলিম লীগ-বিরোধী ঐক্যফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব করলে, প্রথমে বঙ্গবন্ধু এর ঘোর বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘যাদের নীতি ও আদর্শ নাই তাদের সাথে ঐক্যফ্রন্ট করার অর্থ হলো কতকগুলি মরা লোককে বাঁচিয়ে তোলা’ (আত্মজীবনী, পৃ. ২৪৮)। অবশেষে সিনিয়র নেতাদের পীড়াপীড়িতে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠনে সম্মত হলেও, “(যুক্তফ্রন্ট করলে) ক্ষমতায় যাওয়া যেতে পারে, তবে জনসাধারনের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না, আর এ ক্ষমতা বেশিদিন থাকবেও না। যেখানে আদর্শের মিল নাই সেখানে ঐক্যও বেশিদিন থাকে না” (পৃ. ২৫০) মর্মে যে ভবিষ্যত বাণী করেছিলেন, ৫৪-র নির্বাচন-উত্তর তা কীভাবে সত্যি প্রমাণিত হয়েছিল, তা সবার জানা রয়েছে। এমনকি, যুক্তফ্রন্টের নেতা হিসেবে শেরে বাংলার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ অনস্থা প্রস্তাব পর্যন্ত আনতে বাধ্য হয়েছিল (পৃ. ২৮৮)।
১৯৬২ সালে সোহ্রাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কতিপয় বিরোধী দল নিয়ে আইয়ুববিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ, ন্যাশনাল ডিমোক্রেটিক ফ্রন্ট বা এন. ডি. এফ গঠিত হলে, ওপরে উল্লিখিত একই নীতি ও আদর্শের কারণে বঙ্গবন্ধু ঐ জোট থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগের অপেক্ষা করছিলেন। ১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর সোহ্রাওয়ার্দীর মৃত্যুর এক মাস বিশ দিন পর (২৫ জানুয়ারি ১৯৬৪) ধানম-ির নিজ ভবনে সভা ডেকে এন.ডি.এফ থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন।
বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, নীতি ও আদর্শের প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ শক্তিশালী রাজনৈতিক দল ছাড়া বাঙালীর জাতীয় মুক্তি অর্জন সম্ভব নয়। ’৬০-এর দশকে বাঙালীর মুক্তিসনদ, ‘আমাদের বাঁচার দাবি ৬-দফা’ কর্মসূচি ঘোষণা করে (৫-৬ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬) অবিশ্বাস্য গতিতে আওয়ামী লীগকে বাঙালীর জাতীয় মুক্তির মঞ্চে পরিণত করতে সক্ষম হন, যে দলের নেতৃত্বে পরবর্তীতে আমরা আমাদের স্বাধীনতা লাভ করি।
সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, অসীম আত্মবিশ্বাস, গভীর দেশপ্রেম ও ত্যাগের মানসিকতার পাশাপাশি মানুষের ভালবাসা বঙ্গবন্ধুকে স্বীয় স্থানে পৌঁছে দেয়। এখানে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে হয়, যা তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ঘটনাটি ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময়। বঙ্গবন্ধু ঐ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে মুসলিম লীগের প্রভাবশালী ও বহু অর্থের মালিক ওয়াহিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ও জয়ী হন। বঙ্গবন্ধু নিজে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেন, “...খুবই গরিব এক বৃদ্ধ মহিলা কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, শুনেছে এই পথে আমি যাব, আমাকে দেখে আমার হাত ধরে বলল, ‘বাবা আমার এই কুঁড়ে ঘরে তোমায় একটু যেতে হবে।’ আমি তার হাত ধরেই তার বাড়িতে যাই ...আমাকে একটা পাটি বিছিয়ে বসতে দিয়ে এক বাটি দুধ, একটা পান ও চার আনা পয়সা এনে আমার সামনে ধরে বলল, ‘খাও বাবা, আর পয়সা কয়টা তুমি নেও, আমার তো কিছুই নাই।’ আমার চোখে পানি এলো... সেই পয়সার সাথে আরও কিছু টাকা তার হাতে দিয়ে বললাম... টাকা সে নিল না, আমার মাথায় মুখে হাত দিয়ে বলল, ‘গরিবের দোয়া তোমার জন্য আছে বাবা।’ নীরবে আমার চক্ষু দিয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়েছিল... সেই দিনই আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, ‘মানুষেরে ধোঁকা আমি দিতে পারব না।’ ... আমি ... জানতাম না, এ দেশের লোক আমাকে কত ভালবাসে। আমার মনের একটা বিরাট পরিবর্তন এই সময় হয়েছিল” (পৃ. ২৫৫-২৫৬)।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক মহান আদর্শবান নেতা। বাঙালীর জাতীয় মুক্তি ও গণমানুষের কল্যাণে তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। অসাম্প্রদায়িকতা ছিল তাঁর নিশ্বাসে-বিশ্বাসে। তিনি সবসময় জনগণ ও সাংগঠনিক শক্তিতে আস্থাশীল ছিলেন। তাঁর দৃঢ়, প্রাজ্ঞ, গণভিত্তিক ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের কারণে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। বঙ্গবন্ধু মুজিব চিরঞ্জীব। বঙ্গবন্ধুর সদ্য প্রকাশিত আত্মজীবনী অসমাপ্ত হলেও আমাদের জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের নানা ঘটনা এতে বর্ণিত হয়েছে। তাই স্বাধীনতার সত্যিকার ইতিহাস ও আমাদের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের ভূমিকা জানার ক্ষেত্রে এটি একটি অতি মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পাঠক-গবেষকদের নিকট যুগে যুগে সমাদৃত হবে এমন প্রত্যাশা করা যায় সহজেই।
(সমাপ্ত)

লেখক : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সাবেক প্রো-উপাচার্য, ঢাবি

No comments

Powered by Blogger.