লন্ডনে মেয়র নির্বাচন by এনায়েত সারোয়ার

আসন্ন লন্ডন মেয়র নির্বাচন, যেকোনো নির্বাচনের মতোই একটি প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান বা উৎসব হলেও ইংল্যান্ডের রাজনীতি কিংবা প্রশাসনে এর গুরুত্ব অনেক। এবারের মেয়রেল নির্বাচন বর্তমান বিশৃঙ্খল রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে প্রভাব ফেলবে, যা হতে পারে আমাদের জন্য আনন্দের কিংবা কষ্টের।


কোয়ালিশন বা কন-ডেম সরকার সাধারণ মানুষের প্রাথমিক চাহিদা পূরণে সঠিক নীতিমালা প্রণয়নে সম্পূর্ণ ব্যর্থ না হলেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের বারবার ইউটার্ন তো তাই প্রমাণ করে। অন্যদিকে লেবার দলের বর্তমান কার্যক্রম দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ ভোটারদের তাদের প্রতি আগ্রহী করতে বলা যায় অনেকটা ব্যর্থ। এ ক্ষেত্রে ব্রাডফোর্ডের উপনির্বাচনে লেবারের ভরাডুবি এবং জর্জ গ্যালওয়ের বিজয়কে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তৃতীয় শক্তি লিবারেল ডেমোক্রেট, রক্ষণশীল দলের ভেতর থেকে থেকে 'আইডেন্টিটি 'ক্রাইসিস' নামক অসুখে ভুগছে। নিজেদের আদর্শ-উদ্দেশ্যের অনুশীলনই হবে তাদের জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মেয়রেল নির্বাচনের ফলাফল আমাদের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনে ফেল করা রজনীতিককে একই দলের হয়ে আবার অংশগ্রহণ করতে খুব একটা দেখা না গেলেও 'কেন লিভিংস্টনের' বেলায় দেখা যাচ্ছে এর ব্যতিক্রম। এর কারণ হয়তো বর্তমান পদের জন্য তাঁর অপরিহার্য উপযুক্ততা। যদি 'কেন' বিজয়ী হন, তাহলে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা, ট্রেন-বাস ইত্যাদির ভাড়া ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে হয়তো থাকবে। দেনা-পাওনার হিসাবে সাধারণ মানুষের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা হবে বেশি। অন্যদিকে 'কেন' বিজয়ী হলে লেবার দল উপকৃত হবে সবচেয়ে বেশি। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাজেট কাটের ফলে সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটবে ভোটের মাধ্যমে। এদিক দিয়ে কোয়ালিশন বা কন-ডেম সরকারের ক্ষতি হবে অপরিসীম কারণ এ ভোটের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে সরকারের প্রতি মানুষের অনীহা। সারা দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই অনীহার প্রতিফলন ঘটবে, যা আগামী সাধারণ নির্বাচনের জন্য শুভ বার্তা বয়ে আনতে পারে। লেবার পার্টির কর্মীদের অতীতের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে মাঠে নামতে হবে। ভোটারদের একটি বিরাট অংশ হলো মহিলা। অথচ এতদিন মাইনরিটি অধ্যুষিত এলাকায় এই অংশকে সম্পূর্ণরূপে অবহেলা করে পরিবারের কর্তাব্যক্তিকে টার্গেট করে নির্বাচনী প্রচারণা করা হয়ে থাকে। কাকে ভোট দেওয়া যায় সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পরিবারের মা-বোনদের নয়- এ দর্শন আজ সর্বক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব পাড়ায় পাড়ায় বাবা বা দাদাদের নিয়ে সভা করে যদি মনে করা যায় নির্বাচনে জেতা হয়ে গেল, তাহলে তা হবে মারাত্মক ভুল- যা হয়েছে ব্রাডফোর্ড উপনির্বাচনে। বেথনালগ্রিন/বো নির্বাচনী এলাকায় 'জর্জ গ্যালওয়ের' কাছে 'ওনা কিং'-এর পরাজয়ের পেছনে কিন্তু কাজ করেছে যুবসমাজ। অতএব লেবার দলের কর্মী ভাইবোনদের টেকনিক পরিবর্তনে ফলাফল ভালো হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। নির্বাচিত হওয়ার আগের 'বরিস' আর বর্তমান 'বরিস' এক নন। লন্ডন শহরে চোখ মেলে তাকালেই আপনার চোখে পড়বে 'বরিস'কে। টেলিভিশন প্রেজেন্টার 'বরিস জনসন', যে রাজনীতিতে এত পাকা খেলোয়াড় হবেন, তা হয়তো সবার জানা ছিল না। 'বরিস বাইক' কত পপুলার তা পরিমাপ করা হয়তো কঠিন হতে পারে, তবে এ বাইক বরিস জনসনের এখন অসাধারণ পপুলারিটি। ভেন্ডি বাস উঠিয়ে দিয়ে ট্র্যাডিশনাল বাসের পুনঃপ্রবর্তন সাধারণ মানুষের বাহ্বা কুড়িয়েছে অনেক। হিথরো বিমানবন্দরের ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্য বরিসের নতুন বিমানবন্দর প্রস্তাবও কম জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। অতএব, এবার পেরিফ্যারাল এলাকার ভোটই কেবল তাঁর কেপিট্যাল নয়, বরং ইনার এলাকার ভোটও পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। কোনো কোনো বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বরিসের দ্বিমত ভোটারদের তাঁর দিকে আগ্রহী করতেও সহায়তা করেছে এবং করছে। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে 'কেন লিভিংস্টন' যথেষ্ট যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হলেও সাম্প্রতিক ট্যাক্স-সংক্রান্ত নেতিবাচক সমালোচনা তাঁকে পিছিয়ে দিয়েছে অনেক। এ ক্ষেত্রে ট্যাক্স প্রদানের ব্যাপারে কিন্তু 'বরিস' এক ধাপ এগিয়ে। তিনি তার সব আয়ের উৎস এবং ট্যাক্স রিটার্নের স্বচ্ছতা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছেন। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে বরিসের জনপ্রিয়তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি। প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটা অনেকটা ভীতির কারণও হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থেকেও না থাকার মতো অবস্থা, যুদ্ধবিগ্রহে প্রথম সারিতে অবস্থান, কঠোর ইমিগ্রেশন নীতি, সর্বোপরি পাবলিক সার্ভিসে নির্বিচারে চাকরি নিধন, ইনেফিসিয়েন্ট এনএইচএস, পেনশন সমস্যা ইত্যাদি সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং কোষাধ্যক্ষ- কে জনগণের কাছ থেকে কিছুটা সরিয়ে নেওয়ার কারণে বরিস জনসন কনজারভেটিভ দলের নেতৃত্বে আসার সম্ভাবনাকেও বিজ্ঞজনেরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না। কাজেই বরিস ডেভিড ক্যামেরুনের জন্য একদিকে যেমন আনন্দের অন্যদিকে তেমনি কষ্টেরও কারণ হতে পারেন। পার্টি নেতৃত্ব কিন্তু ডেভিড ক্যামেরুনের পর জর্জ ওসবর্ণেরই পাওয়ার কথা। ফাইন্যান্স ম্যানেজমেন্টে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে গণ-অসন্তুষ্টি কিন্তু কেবল ওসবর্নের ওপরই নয়, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ডেভিড ক্যামেরুনের ওপরও বর্তায়। অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে কৃচ্ছ্রসাধন খুবই প্রয়োজন। লেবার বলুন আর রক্ষণশীল বলুন, যে কেউই ক্ষমতায় থাকুন না কেন কৃচ্ছ্রসাধন পদক্ষেপ বা ওসটারিটি মেজার তাদের নিতেই হবে। লন্ডন মেয়রেল নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন সম্ভাবনা বিচারে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার যে, আসন্ন লন্ডন মেয়রেল নির্বাচন উভয় দলের জন্যই খুব গুরুত্ববহ। এখন দেখা যাক জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

লেখক : লন্ডনপ্রবাসী, esarwar@yahoo.co.uk

No comments

Powered by Blogger.