মানসিক চাপ সইতে না পেরে ওরা অমানুষ হয়ে যায় by ড. মাহবুবা কানিজ কেয়া

মানুষের মধ্যে অমানবিক গুণাবলির জন্ম হয় সামাজিক অবক্ষয় থেকে। সামাজিক অবক্ষয় আসে ব্যক্তির আচরণের প্রভাবেও। এই যে একজন স্বামী তার স্ত্রীকে কেটে চার টুকরো করে ফেলল, ডাকাতদল ডাকাতি করে স্বর্ণালংকার ও অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি মাত্র আট মাস বয়সের একটি বাচ্চাকেও জিম্মি করে নিয়ে গেল, কয়েকদিন আগে ঢাকা


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা তাঁর স্বামীর হাতে নৃশংসভাবে চোখ হারালেন- এমনি আরো কত ঘটনা যে ঘটে চলেছে দেশে, এর কারণ কী? অপরাধীদের সংখ্যা কেন বাড়ছে? এমন প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে আমাদের মনে হবে দেশে যখন অপরাধের বিচার না হয় তখন অপরাধ করতে ইচ্ছুক হয় মানুষ। আবার মানুষ বেড়ে ওঠার কালে যদি সে আচরণগত প্রতিকূল পরিবেশে দিনাতিপাত করে তাহলে এর প্রভাব তার ব্যক্তি আচরণেও প্রতিফলিত হয়। বিশেষ করে শৈশবে যদি কোনো মানুষ নির্যাতন ভোগ করে কিংবা বয়ঃসন্ধিকালে সে যদি নিকটজন কিংবা কাছাকাছি কাউকে নির্যাতন হতে দেখে এর বিরূপ প্রভাবও তার মধ্যে পড়ে। এই পরিবেশে বড় হওয়া কোনো মানুষ পরিণত বয়সে আগ্রাসী আচরণ করতে পারে।
মানুষের মধ্যে আরেকটি প্রবণতাও কাজ করে। তা হলো, মানুষ ক্ষমতা প্রদর্শন করে মজা পায়। নিজে ক্ষমতাশালী- এটা প্রমাণের জন্য তার নজর পড়ে দুর্বলের দিকে। আবার হতাশা থেকেও মানুষের মধ্যে নেতিবাচক অনেক কিছুর জন্ম হতে পারে। হতাশা থেকে মুক্তির জন্যও মানুষ অন্যকে অত্যাচার করতে চায়। যদিও হতাশা থেকে মুক্তির জন্য নির্যাতন করা মোটেও সঠিক পদ্ধতি নয়।
একজন স্বামী তার স্ত্রীকে কেটে চার টুকরো করে ফেলল। শুধু তাই নয়, সেই টুকরো থেকে কিছু ফ্রিজেও রেখে দিল এবং কিছু অংশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি রওনা হলো। দিব্যি সে গ্রামের পথে যেতে থাকল; ঠিক যেভাবে একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ শহর থেকে গ্রামে যায়। মানুষ এতটা নির্মম হতে পারে নানা কারণে। চরম হতাশা, মানসিক বিপর্যয়, চরম হীন্মমন্যতা থেকে মানুষের মধ্যে এমন অমানবিক গুণাবলির জন্ম হতে পারে। মানুষের মধ্যে শৈশব থেকে এই আচরণের জন্ম হতে পারে। এটা হয়তো তার মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সুযোগ পেলেই তা প্রকাশ পায়। কার্যকর হয়। শৈশবে মা-বাবা এবং পরিবেশ যদি এমন হয়, যদি তারা শিশুকে অন্যের সঙ্গে অসম্ভব তুলনা করতে থাকে- যেমন তোমার প্রতিবেশী কিংবা তোমার সহপাঠী এ কাজটি সুন্দরভাবে করতে পারে, তুমি কেন পার না! তোমার বন্ধুটি এত টাকার মালিক হলো, তুমি কেন পারলে না! এমন কথা কোনো ব্যক্তিকে ক্রমাগত বলা হলে তার মধ্যে এক ধরনের হীন্মমন্যতার জন্ম হয়। যা তাকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনাগুলো যেসব কারণে ঘটছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ১. অপরাধের বিচার না হওয়া কিংবা অহেতুক বিলম্বিত হওয়া থেকে ব্যক্তির আচরণ কলুষিত হওয়া; ২. শৈশবে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা অর্জন- তা নিজে নির্যাতিত হওয়া কিংবা কাউকে নির্যাতিত হতে দেখাও হতে পারে; ৩. নারীর প্রতি অধঃস্তন দৃষ্টিভঙ্গি; ৪. ক্ষমতাহীন কিংবা দুর্বলের প্রতি অত্যাচারের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা; ৫. চরম হীন্মমন্যতা, হতাশা ও বিষণ্নতা থেকে এমন হতে পারে; ৬. ব্যক্তিত্বের অসংগতি থাকলে এমন অসুস্থতা হতে পারে। মানসিক চাপ সইতে না পেরে মানুষ অমানুষ হয়ে যেতে পারে। গ্রন্থনা : মোস্তফা হোসেইন

No comments

Powered by Blogger.