অসম্মানের উপযুক্ত প্রতিশোধ by মোহাম্মদ নুরাল হক

শিরোনামটি চ্যানেল আইয়ের ১৭ জানুয়ারি ২০১০-এর সন্ধ্যা ৭টায় প্রচারিত খবর পাঠক সাইদুর রহমানের তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। প্রসঙ্গ চট্টগ্রামে সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ-ভারতের প্রথম টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম দিনের খেলার ফলাফল নিয়ে মন্তব্য।

মন্তব্যটি সময়োচিত ও সুচিন্তিত হয়েছে এ জন্য যে, খেলা শুরুর আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে টেস্ট ক্রিকেটের এক নম্বর দল হিসেবে সফরকারী ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক গৌতম গাম্ভির অযাচিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট দল একটি সাধারণ মানের টেস্ট দল, যারা ভারতের ২০ উইকেট তুলে নিতে পারবে না।’ বিষয়টি সবার কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ছিল আর কি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে গায়ে পড়ে এহেন অসঙ্গত, অমার্জিত ও নিম্নমানের মন্তব্য বোধ হয় এর আগে কখনও শোনা যায়নি। সে জন্য ১৭ জানুয়ারি ২০১০-এর প্রথম দিনের খেলায়ই লড়াকু বাংলাদেশ ক্রিকেট দল কর্তৃক ভারতীয় দলের আট উইকেট তুলে নিয়ে গৌতম গাম্ভিরের অহংকারের দাঁতভাঙা তথা যথোপযুক্ত জবাব প্রদানের জন্য দলের অধিনায়কসহ সব খেলোয়াড়কে অসংখ্য ধন্যবাদ ও মোবারকবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ চ্যানেল আই ও খবর পাঠক সাইদুর রহমানকেও।
‘অহংকার পতনের মূল’। অতীতের চির পরিচিত শিশুশিক্ষা বইয়ের সেই চিরসুন্দর কথাগুলোই আবার এসে গেল। আর অনাদিকাল ধরে আসতেই থাকবে। কারণ সত্য সত্যই আর মিথ্যা মিথ্যাই। এ পৃথিবীতে দিন-রাত ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট ও অনস্বীকার্য। এর ব্যত্যয় কখনই হওয়ার নয়। এক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের সমঝোতারও কোনো অবকাশ নেই। কোরআনের সেই চির সত্য বাণী, যেখানে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে, ‘ওয়া কস্ফুল জ্বাআল হাকস্ফকু ওয়া যাহাকস্ফাল বাত্বিল; ইন্নাল বাত্বিলা কানা যাহুকস্ফা (সুরা : ১৭, বনী-ইস্রাইল, আয়াত : ৮১)। অর্থাত্, ‘বলুন, সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত। মিথ্যা দূরীভূত হবেই।’ এর ব্যতিক্রম অতীতে কখনও হয়নি, বর্তমানে হচ্ছে না এবং ভবিষ্যতেও হবে না।
আসলে পার্থিব কর্মপরিধিতে কী রাজনীতি, কী অর্থনীতি, কী সমাজনীতি, কী ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, কী খেলাধুলা ও মানুষের অন্য যেকোনো বিষয়ে কোথাও কী অহংকারের কোনো স্থান আছে? মানুষ তার কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বেঁচে থাকে, পরিচিতি লাভ করে। মানুষের মনে দাগ কাটে। তা অহংকারের ভিত্তিতে নয়, গালভরা বুলির ফুলঝুড়িতে নয়। অহংকার-দাম্ভিকতার মাধ্যমেও নয়। কথিত ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে কখনও সূর্য অস্ত যায় না। সেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এখন কোথায়? বিশ্ববিখ্যাত জাহাজ টাইটানিক অপ্রতিরোধ্য বলা হয়েছিল। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠে প্রথম যাত্রাতেই কী মর্মান্তিকভাবে জাহাজটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমুদ্রের বুকে। ষাট-সত্তর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকান-ফরাসিদের দম্ভপূর্ণ আস্ফাালনের পরিণতি আজ বিশ্বজুড়ে সবার কাছে সুস্পষ্ট। কিন্তু এ বিষয়গুলো থেকে আমরা কি কখনও শিক্ষা গ্রহণ করেছি বা করছি? একবাক্যে উত্তর সুস্পষ্টভাবে, না-আ-আ।
আজ বাংলাদেশের টালমাটাল রাজনৈতিক অঙ্গনেও লক্ষণীয় দম্ভপূর্ণ অভিব্যক্তি হলো ভোটের হারের ওপর ভর করে যেকোনো চুক্তি-সমঝোতা করা হালাল তথা যুক্তিযুক্ত। ভেবে অবাক হই যে, একবিংশ শতাব্দীতেও বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীদের এ এক অদ্ভুত রকমের ভ্রমাত্মক ধারণা (ঋধষষধপু)। এর আগেও আমার অনেক লেখায় আমি বাংলাদেশের নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রাজনৈতিক সচেতনতাসহ সক্রিয়ভাবে ভোট প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করেছি। আবারও পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি নিয়ে হলেও উল্লেখ করতে বাধ্য হচ্ছি যে, বাংলাদেশের ৯০ থেকে ৯৫ ভাগ হতদরিদ্র নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ শুধু পেটের দায় উপশমের আশা নিয়ে একবার এ দল আরেকবার ও দলকে ভোট দেয় এবং সবরকমের অন্যায়-অবিচার ও দুর্নীতি-দুঃশাসন থেকে আশু মুক্তি লাভের আশায়।
এহেন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতি-নির্ধারণ, বেশুমার চেতনায় সকাল-বিকাল অবগাহন ও দেশি-বিদেশি রং-বেরংয়ের বাহারি চুক্তি-সমঝোতার বিষয়াবলী দৈনন্দিন পেটের দায়গ্রস্ত নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের তাত্ক্ষণিক চিন্তাভাবনার অনেক অনেক বাইরে। সঙ্গত কারণেই আমাদের নেতা-নেত্রীদের চুক্তি-সমঝোতার দায়ভার বাংলাদেশের অপামর জনতা তথা ভোটারদের ওপর চাপানোর বিষয়টি যেকোনো মানদণ্ডে অবিবেচনাপ্রসূত, ব্যক্তি, গোষ্ঠী তথা দলীয় স্বার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং সামগ্রিক বিশ্লেষণে অনৈতিকও বটে।
মানব জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ইতিহাস থেকে আমরা কখনই শিক্ষাগ্রহণ করছি না ও অতীতেও সেভাবে করিনি। আর তাই একের পর এক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটেই চলেছে দেশ থেকে বিদেশে আর বিদেশ থেকে দূর-দূরান্তে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধুনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক তথা সমাজজীবনে দিনের পর দিন এহেন অবস্থা প্রকট আকার ধারণ করেই চলেছে।
আজকাল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ঘিরে সঠিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডসমূহ অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে বের করতে হয় বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে। অন্যদিকে চোখ খুললেই খালি চোখে অবলোকন করতে হয় ঢাকাকেন্দ্রিক চোখ ধাঁধানো অহংকারের পাহাড়ের পর পাহাড়ের স্তূপীকৃত মরীচিকা। আর রাজধানীর কেন্দ্রবিন্দু থেকে শুধুই দম্ভপূর্ণ উল্লম্ফন-আস্ফাালন। তা না হলে বাংলাদেশের ত্রাতারূপী বেশুমার নেতা-নেত্রী কর্তৃক দারিদ্র্য বিমোচনের বিজয় পতাকা হাতে নিয়ে জীবন বাজি রেখে দৌড়াদৌড়ির পরও কেন স্বল্প আয়ের মানুষগুলো দিন দিন দারিদ্র্যসীমার নিচ থেকে নিচেই তলিয়ে যাচ্ছে? কেন দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হয়ে পথে-প্রান্তরে ভিক্ষার হাত আমাদের সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বিরক্তির উদ্রেক করছে? গ্রামভিত্তিক কৃষি প্রধান বাংলাদেশের মানুষ কেন দলবেঁধে গ্রাম থেকে শহরে ভিড় জমাচ্ছে তো জমাচ্ছেই?
তদুপরি নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠদের সাক্ষীগোপাল বানিয়ে একের পর এক যেসব চুক্তি-সমঝোতা করা হচ্ছে, যুগের পর যুগ ধরে তাতে সেই নির্জীব মানুষগুলোর কি কোনো লাভ হয়েছে বা হচ্ছে? আজ সময়ের ডাকে ও কালের বিবর্তনে এসব প্রশ্নের উত্তর তো সবজান্তা-সর্বজ্ঞানী নীতি-নির্ধারকদের ও সর্বদ্রষ্টা-সর্বজ্ঞাত চুক্তি-সমঝোতাকারীদেরই দিতে হবে? তা সময়ের ব্যবধানে আজ হোক অথবা কাল। নিশ্চিতভাবে এই হতে হবে আমাদের নিয়তি। এই হতে হবে আমাদের ভবিষ্যতের নিশ্চিত জবাবদিহিতা। আর অতীতের ধারাবাহিকতায় মনে রাখা প্রয়োজন যে, প্রকৃতির নিয়মে নিয়তির জবাবদিহিতা বড়ই নির্মম।
শুরু করেছিলাম বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট খেলা দিয়ে। যদিও ভারতের সঙ্গে খেলায় বাংলাদেশ জেতেনি। তবুও পুরো প্রতিদ্বন্দ্বিতা পর্যালোচনায় বিষয়টি একেবারেই হেলাফেলার ছিল না। যেমনটি খেলার শুরুতেই গৌতম গাম্ভিরের তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছিল। আসলে কখনও কখনও মহাশক্তিধর ভারতীয় দলকে দম বন্ধ করে প্রহর গুনতেও হয়েছে। এর সঙ্গে আলোচ্য লেখায় বাকি বক্তব্যটুকুও হয়ত বা ফেলনা নয়। স্মরণ রাখতে হবে, একটি জাতির সামগ্রিক মনোবল কিন্তু প্রতিফলিত হয় জাতীয় সমুদয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই। খেলাধুলা জাতীয় জীবনের একটি বিরাট অংশ। এ ক্ষেত্রে শুধু ক্রিকেট-ফুটবল অথবা রাজনীতি-সমাজনীতি বলে কোনো বিশেষায়িত বিষয় নেই। যেখানে সামগ্রিক ফলাফলের কোনোরকম আকাশ-পাতাল ফারাক প্রত্যক্ষ করা যাবে। অর্থাত্ যে জাতির সামগ্রিক মনোবল যত উঁচু, জীবনের সব রকমের কর্মক্ষেত্রে সে জাতির কৃতিত্বও তত বেশি।
আজ সময়ের প্রয়োজনে আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে যে, অসম্মানের জবাব অসম্মান দিয়ে নয়। অন্যায়ের জবাব অন্যায় দিয়ে নয়। অনিষ্টের জবাব অনিষ্ট দিয়ে নয়। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সঠিক, সহজ ও সত্ পথে চলতে হবে আমাদের সবাইকে দ্বিধাহীন মনোভাব নিয়ে। আর সবাইকে আহ্বান করতে হবে সেই পথে—সত্যের পথে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের মাধ্যমে।
কোরআনের চির সত্য বাণীও তাই-ই। যেখানে বলা হয়েছে, ‘উ ্ উ’ ইলা ছাবিলিরাব্বিকা বিল্ হিক্মাতি ওয়াল্ মাওই’ জোতিল্ হাছনাতি ওয়া জ্বাদিল্হুম্ বিল্লাতি হিয়া আহ্ছানু ; ইন্না রাব্বাকা হুওয়া আ’লামু বিমান্ দ্বোল্লা আন্ ছাবিলিহী ওয়া হুওয়া আ’লামু বিল্মু্হ্তাদীন। ওয়া ইন্ আ’ক্বাব্তুম্ ফাআ’কস্ফিবু বিমিছিল মা উ’ক্বিব্তুম্ বিহ্ী ; ওয়া লায়িন্ ছবার্তুম্ লাহুওয়া খাইরুল্লিছ্ ছোবিরীনা (সূরা : আন্-নাহল, আয়াত : ১২৫ ও ১২৬)।’ অর্থাত্, ‘আপনার রবের পথের প্রতি আহ্বান করুন হেকমত ও সত্ উপদেশ শুনিয়ে এবং তাদের সঙ্গে বিতর্ক করুন পছন্দসই পন্থায়। আপনার রব বিপথগামীদের চেনেন এবং তিনিই ভালো জানেন তাদের, যারা সঠিক পথে আছে। তোমরা প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাইলে ওই পরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করবে, যে পরিমাণ কষ্ট পেয়েছো। আর যদি সবর (ধৈর্য ধারণ) করো, তবে তা সবরকারীদের (ধৈর্যধারণকারীদের) জন্য উত্তম।’ আল্লাহ (সু. তা.) আমাদের সবাইকে সত্য ও সঠিক পথে চলার হেদায়েত দান করুন —আমীন!
লেখক : পেনশনার
haquenoor@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.