ভাইস চ্যান্সেলররা এমপির পদমর্যাদা চাচ্ছেন, কিন্তু কেন? by আবু এন এম ওয়াহিদ

৯৭৮ সাল। লেখাপড়া শেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে মাত্র যোগ দিয়েছি। তখন আলবেরুনি হলের প্রভোস্ট ছিলেন তৎকালীন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রধান বর্তমানে প্রয়াত ড. আজিজুল হক। তাঁর উৎসাহে এবং বাড়তি মাত্র ২০০ টাকা মাসিক অ্যালাউন্স ও ফ্রি অ্যাপার্টমেন্টের আশায় আমি সেই হলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাউস টিউটরের কাজ নিই।


তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। হলের কোনো এক কাজে একদিন বিকেলে আজিজ স্যার ভিসির বাসায় যাচ্ছেন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। আমাকে পথে পেয়ে তাঁর সঙ্গে যেতে বললেন। স্যার আমাকে এত বেশি স্নেহ করতেন যে তাঁর কোনো কথায়ই আমি কখনো না বলতে পারতাম না। কয়েক মিনিট হেঁটেই আমরা দুজন পেঁৗছে গেলাম গন্তব্যে। ভিসির বাড়িতে উঠে কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে তারপর গিয়ে বসলাম নিচতলার এক বিরাট বৈঠকখানায়। তখন সদ্যসমাপ্ত নতুন ভিসির বাড়ি। বিশাল প্রাসাদসম বাসা। নতুন ফার্নিচার ও ডেকোরেশন পিস দিয়ে সাজানো-গোছানো। চারদিক ঝকঝক-তকতক করছে। প্রথমবারের মতো ভিসির বাড়ি দেখে অবাক হয়ে বলেছিলাম, 'আমরা গরিব দেশের মানুষ। এত শান-শওকতের দরকার কী?' আমার কথা শুনে আজিজ স্যার বলেছিলেন, 'এখানে দেশ-বিদেশের কত নামিদামি লোক আসবে। এটা ঠিকই আছে। ভিসির বাড়ি এ রকমই হওয়া উচিত। আর তুমি হয়তো জান না, 'বিইং এ ভাইস চ্যান্সেলর ইজ মোর প্রেস্টিজিয়াস দ্যান টু বিকাম এ ক্যাবিনেট মিনিস্টার অব দ্য প্রেসিডেন্ট।'
সেদিন খবরের কাগজে ছোট্ট দুটি সংবাদ দেখে আজিজ স্যারের সেই কথাটি মনে পড়ে গেল। খবরগুলো সবার নজরে পড়তে পারে আবার নাও পারে। কারণ কোনো কাগজই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সেগুলো ছাপেনি। প্রথম খবর হলো, সরকার সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। দ্বিতীয়টি সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর সংসদ সদস্যদের র‌্যাঙ্ক অ্যান্ড স্ট্যাটাস বা পদমর্যাদা চাচ্ছেন।
প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে, নাকি চেয়ারম্যানের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দিয়েছে, তা আমাদের জানা নেই। জানার প্রয়োজনও নেই। আমার প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান একজন সাবেক অধ্যাপক, ভাইস চ্যান্সেলর এবং শিক্ষাবিদ। কমিশন চেয়ারম্যানের প্রধান দায়িত্ব হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক বাজেট পর্যালোচনা, বাজেট বরাদ্দ এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজকর্মে যুতসই পরামর্শ এবং সহযোগিতা দেওয়া। তিনি মন্ত্রী না প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা পেলেন, তাতে কি তাঁর কাজের পরিধি, ব্যাপ্তি বা গুণাগুণে কোনো ব্যত্যয় হবে? নাকি তাঁর কাজে তিনি কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পাবেন? নাকি তাঁর বেতন-ভাতা বৃদ্ধি পাবে? এর যদি কোনোটিই না হয়ে থাকে, তাহলে শুধু শুধু প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা নিয়ে আত্মতৃপ্তি পাওয়া অন্যের পক্ষে যা-ই হোক না কেন, একজন সম্মানিত সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ও শিক্ষাবিদের জন্য মোটেও গৌরবের কিছু নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের মর্যাদা সরকার সরকারিভাবে কী ঠিক করল, সেটা বড় কথা নয়, বরং তার চেয়ে বড় কথা, দেশের জনগণ, ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষিত সমাজ তাঁকে কিভাবে দেখে। আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের মর্যাদা জনগণের কাছে একজন উপমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কেন, একজন মন্ত্রীর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁর প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদা সরকারের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে থাকলে আমি বিষয়টিকে বিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করি না। আর না চেয়ে থাকলে এটি নিতান্তই একটি তুচ্ছ বা ট্রিভিয়্যাল বিষয়। এতে তাঁর প্রকৃত মর্যাদার সামান্যতমও কমবেশি হওয়ার কথা নয়।
এবার আসি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরদের চাহিদার কথায়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস চ্যান্সেলররা এমপির পদমর্যাদা চাচ্ছেন। শিক্ষাবিদদের আদর্শিক ও মানসিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের চাহিদা যেমন বুঝিনি, তেমনি ভাইস চ্যান্সেলরদের চাহিদার তাৎপর্যও কোনোমতেই আমার মাথায় ঢুকছে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এখানে শুধু জ্ঞানদান ও জ্ঞানচর্চাই হয় না। এখানে ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষাবিদরা অনবরত সৃজনশীল চিন্তাভাবনা করেন। গবেষণা করেন। নতুন নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করেন। জ্ঞান সৃষ্টি করেন। নতুন জ্ঞানের জন্ম দেন। আমাদের প্রয়াত শিক্ষক প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. মালিক খসরু চৌধুরী একবার বলেছিলেন, 'এ ইউনিভার্সিটি ইজ নট মেন্ট ফর অ্যাভারেজ পিপলস, ইট্্স ফর স্কলারস অনলি।' একজন ভাইস চ্যান্সেলর হলেন ইউনিভার্সিটির গাইড, ফিলোসফার, ফ্রেন্ড এবং লিডার। তাঁকে কেন্দ্র করে তাঁরই নেতৃত্বে আবর্তিত হয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ড। তিনি হলেন সৃষ্টিশীল মানুষের নেতা। মানুষ সৃষ্টির কারিগরদের সুপারভাইজার। তাঁর ধ্যান-ধারণা, চিন্তাভাবনা, কাজকর্ম জ্ঞানের সর্বক্ষেত্রে প্রসারিত এবং বিস্তৃত।
পক্ষান্তরে একজন সংসদ সদস্য বা এমপির কর্মক্ষেত্র ভিন্ন। তিনি দেশের আইনপ্রণেতা, তাঁর নির্বাচনী এলাকার লোকজনের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগে যথাসময়ে পেঁৗছে দেন। তিনি সরকারি কাজকর্ম, উন্নয়ন কর্মতৎপরতা ইত্যাদির দেখভাল করেন। তিনি দেশের আইন প্রণয়ন এবং তাঁর নিজস্ব এলাকার জনস্বার্থ রক্ষায় একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর একটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সর্বময় কর্তা। তিনি সৃজনশীল জগতের একজন দিকপাল। আমার মাথায় আসে না, একজন ভাইস চ্যান্সেলর কেন একজন সংসদ সদস্যের পদমর্র্যাদার দাবিদার হতে যাবেন, আর সরকারই বা কেন সেটা শুনতে যাবে? তবে একটা উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক হতে পারে। ১০-১২ বছর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ভাইস চ্যান্সেলর স্বপদে ইস্তফা দিয়ে আওয়ামী লীগের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। বর্তমানে তিনি ফুলটাইম রাজনীতিবিদ। একজন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা। যেসব ভাইস চ্যান্সেলর এখন এমপির মর্যাদা চাচ্ছেন, তাঁদের কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ, একটু ধৈর্য ধরে সেই পদত্যাগী ভাইস চ্যান্সেলরের পথ অনুসরণ করলে তাঁরা ভবিষ্যতে এমপির চেয়ে তিন ধাপ বেশি মর্যাদা পেতে পারেন। আর যেসব ভাইস চ্যান্সেলর পদমর্যাদার ধার ধারেন না, তাঁদের বলব, নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট দূর করুন, নারী নির্যাতন বন্ধ করুন, আর্থিক অপচয় ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেবেন না, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠা করুন, দলীয় বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিন, উচ্ছৃঙ্খল ছাত্ররাজনীতির রাশ টেনে ধরুন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মধ্যে সৌজন্যবোধ ফিরিয়ে আনুন, ক্যাম্পাসে সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখুন, সৃজনশীল প্রতিষ্ঠানের দেখভাল করে সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব দিয়ে সামনে হাঁটুন, মর্যাদা আপনার পিছে পিছে দৌড়ে আসবে।

লেখক : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেট ইউনিভার্সিটি ও এডিটর, জার্নাল অব ডেভেলপিং এরিয়াজ, awahid@tnstate.edu

No comments

Powered by Blogger.