রোডমার্চ-রোডমার্চ বিএনপির, শোডাউন জামায়াতের by শামির

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চট্টগ্রাম অভিমুখী রোডমার্চের পথসভাগুলোতে সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, 'নিজেদের অধীনে নির্বাচন করলে মস্তবড় ভুল হবে। কোনো দল এ নির্বাচনে অংশ নেবে না, দেশে অশান্তির সৃষ্টি হবে।' তিনি আওয়ামী লীগের লুণ্ঠন, খুন, গুম, গুপ্তহত্যা ও সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিবরণ দিয়ে বলেন, 'ওরা অতীতে ২১ বছর ক্ষমতায় আসতে পারেনি, এবার ৪১ বছর পরও ক্ষমতায় আসতে পারবে না।'


এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কুমিল্লায় তিনটি পথসভা করেন, তিনটি পথসভায়ই খালেদা জিয়া বলেন, রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে সব রাজনৈতিক দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির কথা বলে এসেছে। আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার করুন। না হলে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না।
এরপর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ফেনীতে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। সেখানে তিনি বলেন, 'আমরা ক্ষমতায় গেলে সত্যিকারের গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনব। উন্নয়নের রাজনীতি শুরু করব।' খালেদা জিয়া বলেন, 'চট্টগ্রাম থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এই কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সবাইকে অংশ নিতে হবে।'
দাউদকান্দি, কুমিল্লা ও ফেনীতে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যেসব মঞ্চে ভাষণ দেন সেসব ভাষণে বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ জামায়াতের অনেক নেতা।
রোডমার্চ উপলক্ষে এসব পথসভা বিএনপি নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। বিএনপির রোডমার্চে ছাত্রশিবির শোডাউন করার জন্য ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের দফায় দফায় সংঘর্ষ ঘটে। এ সময় পুলিশ, সাংবাদিকসহ দুই শতাধিক লোক আহত হয়।
ঢাকা থেকে বিএনপির রোডমার্চ শুরু হওয়ার পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবির রোড শো করার প্রস্তুতিতে নামে। গাড়িবহরে, পথসভায় ও জনসভায় তাদের সরব উপস্থিতির মাধ্যমে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করে বিএনপির রোডমার্চ কর্মসূচি মূলত যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্যই নেওয়া হয়েছে। এ জন্য জামায়াতের ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ব্যাপক শোডাউনের প্রস্তুতি নেন। বলা চলে দাউদকান্দি ব্রিজের পর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে যতই রোডমার্চ এগোতে থাকে, জামায়াতের শোডাউন ততই বাড়তে থাকে। খালেদা জিয়া এই রোডমার্চে না থাকলে যে কারোরই বুঝতে কষ্ট হতো এটি আসলে বিএনপির রোডমার্চ নয়, জামায়াতের শোডাউন। কারণ রোডমার্চে বিএনপির চেয়েও জামায়াতে ইসলামীর গাড়িবহরের সংখ্যা ছিল বেশি। অভিযোগ উঠেছে, কুমিল্লা থেকে ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত জামায়াতের ডা. আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের অন্তত অর্ধশতাধিক গাড়ির সমাবেশ ঘটান এবং তাঁর খরচেই বিএনপির রোডমার্চ হয়ে ওঠে যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার রোডমার্চ।
কুমিল্লা, ফেনীর পথসভা, জনসভা শেষে পরদিন বিএনপির রোডমার্চ আর জামায়াতের রোড শো চট্টগ্রাম অভিমুখে রওনা হয়। চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ড ময়দানে এসে রোডমার্চের পরিসমাপ্তি ঘটে। এখানে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে সরকার পতন আন্দোলনে আগামী ১২ মার্চ 'চলো চলো ঢাকা চলো' মহাসমাবেশ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়ে বলেন, লুটেরা বেইমানদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে। তিনি সরকারের প্রতি কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, 'আমরা শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করব। বাধা দিলে দায়-দায়িত্ব আপনাদের, তাই বাধা না দিয়ে ক্ষমতা ছেড়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা যাচাই করুন। দেখবেন জনপ্রিয়তা শূন্যের কোটায় গিয়ে ঠেকেছে। এত লুটপাট করলে, বিদেশিদের দালালি করলে কি মানুষের সমর্থন পাওয়া যায়?'
রোডমার্চ শেষে চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ড মাঠে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা ছাড়া মঞ্চে বক্তব্য দেন ও উপস্থিত থাকেন জামায়াতের চট্টগ্রাম নগর আমির মাওলানা শামসুল ইসলাম এমপি, জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার, নুরুল ইসলাম বুলবুলসহ অনেকে।
রোডমার্চ ও চট্টগ্রাম পলোগ্রাউন্ড মাঠের জনসভায় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। ধারণা করা হয়, বর্তমান সরকারের আমলে এটি ছিল জামায়াত শিবিরের সবচেয়ে বড় শোডাউন। জামায়াত-শিবির শুধু বড় ধরনের শোডাউন করেই ক্ষান্ত হয়নি, মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারা যে ধরনের বক্তব্য দেয় তাকেও অনেকে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বলে আখ্যা দেন।
জনসভায় জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ বলেন, আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্ট দল। তাদের জুলুম-নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে চারদলীয় জোট ও সমমনা দলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন, প্রতিবেশী দেশকে খুশি রাখতে আওয়ামী লীগ সরকার নদী, সড়ক সব দিয়ে দিচ্ছে। ক্ষমতার জন্য তারা দেশকে কোরবানি করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, শেখ মুজিব যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিয়েছেন, কিন্তু বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের নামে জামায়াত নেতাদের আটক করছে।
জনসভায় সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী ফারহাত কাদের চৌধুরী বলেন, 'আমরা সহানুভূতির জন্য আসিনি, আপনাদের সঙ্গে সাহস জোগানোর জন্য এসেছি।' তিনি আরো বলেন, '৩৬ বছর ঘর থেকে বের হইনি। শেখ হাসিনার নির্যাতনে বাধ্য হয়ে এসেছি।'
পুরো বিষয়টি লক্ষণীয় যে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে যে সময়ে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রসিকিউশনের অভিযোগনামার ওপর ট্রাইব্যুনালের আদেশ দেওয়ার কথা, সে সময়ই কুমিল্লা, ফেনী, ও চট্টগ্রামে শোডাউন করার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ নেয় জামায়াত-শিবির। বিএনপির রোডমার্চ ও পথসভা-জনসভা ও মহাসমাবেশকে তারা পুরোপুরি দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা চালায়। রোডমার্চে জামায়াতে ইসলামী তাদের বিচারাধীন নেতাদের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত হওয়া ও অভিযোগের শুনানির দিন অনিবার্য হওয়ায় তারা মরিয়া হয়ে উঠেছে। এ জন্য তারা বিএনপি, বিশেষ করে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর আধিপত্য বিস্তার করে দলীয় নেতাদের মুক্ত করানোর চেষ্টায় নেমেছে। তারা বিএনপি তথা চারদলীয় জোটকে এ প্রশ্নে সহিংস রাজনীতির দিকে ঠেলে দিতে চায়। এ চেষ্টা তারা অল্প কিছুদিন আগে রাজধানীতেও করার প্রয়াস চালায়।
বিএনপির রোডমার্চ উপলক্ষে জামায়াত যে সুযোগ নিতে চেয়েছিল তার পুরোটা তারা নিতে পারেনি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রত্যুৎপন্নমতিতায়। খালেদা জিয়া পলোগ্রাউন্ড মাঠে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির বিষয়ে কোনো কথা বলেননি; যদিও জামায়াত মনে-প্রাণে চাইছিল খালেদা জিয়া এ বিষয়ে কিছু বলুন। খালেদা জিয়া এসব বিষয় না বলাতে এখন বলা যায়, আগামী ১২ মার্চ ঢাকা চলো কর্মসূচি অনেকটাই সার্থক হবে।

No comments

Powered by Blogger.