সাদাকালো-ঐতিহ্যবিলাসী হয়েই আমরা খুশি by আহমদ রফিক

তিমিরবিনাশী' হওয়ার আকাঙ্ক্ষা বাঙালি কবির কাব্যপঙ্ক্তিতে প্রকাশ পেলেও আমাদের শিক্ষিত মননে এর প্রভাব আকাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নয়। বিশেষ করে জাতীয় চেতনা ও ঐতিহ্যবোধের ক্ষেত্রে। তাই দিনের পর দিন ঐতিহ্যবিনাশের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পরও আমরা কথিত ঐতিহ্যমনস্ক মানুষ প্রতিবাদে সোচ্চার নই। আর নই বলে ঐতিহ্যিক নিদর্শন পুরাকীর্তি নিয়ে নির্বিবাদে ঘটছে দস্যুবৃত্তি এবং নিয়মিত। ভেবেছিলাম, 'শঙ্খনিধি হাউস' নিয়ে লেখার পর এ বিষয়ে আর লেখা নয়।


কিন্তু কাগজে প্রায়ই দেখছি পুরাকীর্তি ধ্বংসের খবর। একশ্রেণীর মানুষের লোভের কারণে বিলুপ্ত হচ্ছে দেশ ও জাতির জন্য গর্বের ঐতিহ্যসম্পদ। এসব খবর-প্রতিবেদন সংগ্রহের জন্য পরিশ্রমী, ঐতিহ্য-সচেতন সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানাতে হয়, ধন্যবাদ তাঁদের প্রশংসনীয় উদ্যোগের জন্য, সেই সঙ্গে পত্রিকাগুলোকে ধন্যবাদ তা প্রকাশের জন্য।
আমাদের দেশে মেধাবী ইতিহাসবিদ, পুরাতত্ত্ববিদের অভাব নেই। আছেন পরিবেশ-সচেতন বিশিষ্টজন এবং তাঁদের শক্তিশালী সংগঠন। যখন দেশের পুরাকীর্তি অবাধে নষ্ট হচ্ছে, 'পুড়ে ইট হচ্ছে ইতিহাস;' খোয়াই নদী দখলদারের কবলে পড়ে শেষ হচ্ছে, 'হারিয়ে যাচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অনেক নদী', তখন তাঁরা প্রতিবাদে এগিয়ে আসছেন না কেন? 'ক্ষমার অযোগ্য জাতীয় কীর্তি ধ্বংস' করার বিরুদ্ধে অন্দোলন গড়ে তুলছেন না কেন?
আপাতত উত্তরবঙ্গের গর্ব 'ভীমের জাঙ্গাল' ধ্বংসের কথা বলছি। বেশ কয়েক দিনের কাগজে প্রকাশিত খবর। আগের লেখাটিতে স্থানাভাবে এর উল্লেখ ছিল মাত্র। পাল রাজত্বকালে রাজা মহিপালের কুশাসনের বিরুদ্ধে নিম্নবর্গীয় কৈবর্ত শাসনের আবির্ভাব। রাজা দিব্যর পর ভীম_তাঁরই তৈরি দীর্ঘ বাঁধের কথা আমাদের বর্ণাশ্রম-শাসিত এলিট সমাজে প্রাপ্য মর্যাদায় উদ্ধৃত নয়। ড. নীহাররঞ্জন রায়ের 'বাঙালির ইতিহাস'-এ দু-তিন ছত্রে ভীমের কাহিনী শেষ, নেই ভীমের কীর্তি 'জাঙ্গাল' তথা বাঁধের উল্লেখ।
সুপ্রাচীন এই বাঁধ যা 'ভীমের জাঙ্গাল' নামে ইতিহাসে পরিচিত, হতে পারে বন্যা থেকে জনপদ রক্ষার জন্য তৈরি (যেমন ঢাকার বেড়িবাঁধ), যে বাঁধ ভীমের প্রজাপ্রীতির পরিচায়ক। ৩০ ফুট উঁচু এবং ৭০ ফুট চওড়া এ বাঁধ পাবনার সিরাজগঞ্জ থেকে প্রাচীন পুন্ড্রনগর বগুড়ার মধ্য দিয়ে উত্তরে দিনাজপুর পর্যন্ত চলে গেছে। গর্ব করার মতোই দীর্ঘ এই বাঁধ বা উঁচু সড়ক (অনেকটা শের শাহ্র গ্র্যান্ডট্রাংক রোডের মতো)। এমন একটি পুরাকীর্তি ব্যক্তিক অনাচারে, আমাদের অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যাবে_তা তো হতে পারে না। আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠন বা পরিবেশবাদী বহু পরিচিত সংগঠনের সংস্কৃতিমনস্ক ব্যক্তিদের প্রতি অনুরোধ, তাঁরা যেন অবিলম্বে প্রতিকারের জন্য, জাঙ্গালটির অবশিষ্ট অংশ রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন।
এমনকি অনুরোধ জানাই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের প্রতিও। অনেক সময় সচেতনতার অভাবে অনেক পুরাকীর্তি অধিগ্রহণ করা হয় না, হয় না তথ্যের অভাবে, কখনো নিতান্ত অবহেলায়। প্রমাণ পতিসরে রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়িটি ১৯৯৪ সালে অনেক দেন-দরবারের পর অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু যেগুলো সংবাদপত্রের কল্যাণে আমাদের জানার আওতায় আসে বা যেগুলোর ওপর মানুষের লোভের হাত পড়তে দেখা যায়_ব্যক্তিমালিকানাধীন হলেও সেগুলো অধিগ্রহণের পক্ষে কোনো আইনগত বাধা নেই। তা সত্ত্বেও কাগজে লেখালেখির পরও তারা কেন নিশ্চুপ, নিশ্চল তা আমাদের জানা নেই। তবে তারা এ বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেবে, বলার অপেক্ষা রাখে না_দেশের ইতিহাস-সচেতন মানুষ তা-ই চায়।
আরেক খবরে প্রকাশ, বঙ্গীয় পুরাকীর্তির অন্যতম প্রধান বগুড়ার মহাস্থানগড়ের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত, চুরি হয়ে যাচ্ছে_বলা উচিত ডাকাতি হয়ে যাচ্ছে সেখানকার কিছু কিছু নিদর্শন। এবং তা খুব একটা গোপনে নয়, যে জন্য ডাকাতি শব্দটাই সঠিক। আমাদের জানা নেই, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এ বিষয়ে কী ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে, এমনকি কোনো কোনো উন্নয়নশীল দেশেও ঐতিহ্য রক্ষা এবং পুরাকীর্তি সংরক্ষণের দিকে যথেষ্ট মনোযোগ। সেসব জাতীয় সম্পদ হিসেবে মর্যাদার অধিকারী বলেই সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের প্রত্নতত্ত্ব দপ্তর, বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ত্ব-পুরাতত্ত্ব বিভাগের কল্যাণে নতুন নতুন পুরাকীর্তির প্রকাশ ঘটছে। উয়ারি-বটেশ্বরের কাজ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই তো কয়েক দিন আগে কাগজে পড়েছি, ঢাকায় সুলতানি আমলের শিলালিপির সন্ধান মিলেছে। শিলালিপিটি স্বনামখ্যাত শাসক আলাউদ্দিন হোসেন শাহর আমলের। এ জন্য আমরা ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির সদস্যদের অভিনন্দন জানাই এবং দাবি রাখি, যাতে তাঁরা দেশের পুরাকীর্তি সংরক্ষণের কাজেও অনুরূপ সচেতনতা ও তৎপরতার পরিচয় রাখেন।
কারণ আমরা জানি, এ দেশের পুরাভূমি অঞ্চলে এখনো বহু পুরাকীর্তি ধ্বংসের অপেক্ষায়, যেমন অনেক কিছু আবিষ্কারের অপেক্ষায়। যেমন_একটি খবরে দেখছি, 'ধ্বংসের পথে রামুর পুরাকীর্তি'। গোটা বাংলাদেশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ এবং বাদবাকি অঞ্চলের প্রাচীন ভূমিতে পুরাকীর্তির অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। এদিক থেকে বৌদ্ধ সংস্কৃতির নিদর্শন সংখ্যায় অনেক। যেমন উত্তরবঙ্গে, তেমনি পূর্ববঙ্গে।
কঙ্বাজারের রামু উপজেলার প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন সম্পর্কে প্রতিবেদক সুনীল বড়ুয়া লিখছেন : 'বৌদ্ধবিহারের শহর হিসেবে খ্যাত রামুতে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধবিহার এবং লামাপাড়া ক্যাংসহ (বৌদ্ধবিহার) বেশ কয়েকটি পুরাকীর্তি।... একমাত্র রামুতেই আছে রেঙ্গুনি কারুকাজে তৈরি ২৭টি প্রাচীন ক্যাং (বৌদ্ধবিহার)। কিন্তু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, উপযুক্ত পরিচর্যা ও সংস্কারের অভাবে অমূল্য এসব প্রত্নতাত্তি্বক নির্দশন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।... 'এসব বিহার থেকে চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি, পিতলের ঘণ্টাসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।... যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখানকার দুটি বিহার বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং আরো ১০টি বিহার ধ্বংসের পথে।... এসব নিদর্শন দেখতে রামুতে সারা বছরই থাকে পর্যটকদের ভিড়।' দীর্ঘ এ প্রতিবেদনে উলি্লখিত হয়েছে স্থানীয় বৌদ্ধ ঐক্য কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সভাপতি বঙ্কিম বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়ার হতাশাব্যঞ্জক বক্তব্য।
বৌদ্ধবিহার ছাড়াও রামুতে রয়েছে দেশের বৃহত্তম নারিকেল বাগান, হিমছড়ি ঝরনা, শাহ সুজা সড়কসহ আকর্ষণীয় স্থান, যা পর্যটনকেন্দ্ররূপে বিবেচিত হতে পারে। রামুর 'বাংকুট বনাশ্রম' বৌদ্ধবিহার নাকি বৌদ্ধযুগের সবচেয়ে প্রাচীন পুরাকীর্তি। শুধু রামু নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ের স্থাপত্যকীর্তির সব সংরক্ষিত নয়। এগুলো সংরক্ষণের জন্য দরকার ঐতিহ্য-সচেতনতা, যা দেশপ্রীতিরই অংশ।
অবশ্য এ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায়দায়িত্ব স্বীকার করেও একটা কথা বলতে হয় যে তাদেরও রয়েছে লোকবল ও অর্থবলের সীমাবদ্ধতা। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালকের সঙ্গে পুরাতাত্তি্বক সংরক্ষণবিষয়ক আলোচনায় কিছুদিন আগে তাদের তরফ থেকে উলি্লখিত সীমাবদ্ধ শক্তি-সামর্থ্যের কথাই উঠে এসেছিল। ক্ষেত্রবিশেষে তারা অসহায়।
সে ক্ষেত্রে আমরা স্বভাবতই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর; যাতে দেশের গৌরবগাথায় সংশ্লিষ্ট পুরাকীর্তি সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের ব্যবস্থা করা হয়। কারণ এর দুটো গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দৈশিক ও আন্তর্জাতিক।
বিদেশে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে পুরাকীর্তি আবিষ্কার এবং সেসব রক্ষণাবেক্ষণের ওপর প্রভূত গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে। কারণ এগুলো একটি দেশ ও জাতির গৌরবদীপ্ত ঐতিহ্যের মূল্যমানের প্রকাশ ঘটায়, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়ে থাকে। তাই সেই দেশ বা ভূখণ্ডের রাষ্ট্র ওইসব ঐতিহ্যের ধারক, বাহক ও পরিচর্যাকারী।
রাষ্ট্রের নির্বাহী শক্তি তার লালন ও পরিচর্যার দায়িত্ব বহন করে থাকে। আরো স্পষ্ট ভাষায়_এ দায়িত্ব সরকারের। এসব বিশ্বসংস্কৃতির অংশ। দেশীয় সংস্কৃতির প্রতিফলন তো বটেই।
চিত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ইত্যাদি নিয়ে শিল্পকলা বৃহত্তর পরিসরে সর্বজনীন চরিত্রের বলে এগুলো সীমানাচিহ্নিত নয়, এগুলো সর্বদেশের, সর্বকালের। আর সে কারণেই পৃথিবীর অপর পিঠ থেকে সংস্কৃতিপিপাসু মানুষ ছুটে আসে সভ্যতা-সংস্কৃতির বিচিত্র প্রকাশ দেখতে, উপভোগ করতে। চিত্রকলা যেমন গ্যালারিতে, স্থাপত্য-ভাস্কর্য তেমনি ঘরের বাইরে আকাশতলে। সেখানে জমে পর্যটকদের ভিড়। সাংস্কৃতিক বিনোদনের আকর্ষণে।
আর সে কারণেও অর্থাৎ বিশ্বদর্শকদের সামনে আপন সভ্যতা-সংস্কৃতির কীর্তি তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার তার নিজ ঐতিহ্যের পরিবেশন নিশ্চিত করে যথাযথ পরিচর্যায়। হোক তা চিত্র, স্থাপত্য বা ভাস্কর্য, শিলালিপি বা প্রত্নতাত্তি্বক নিদর্শন (মুদ্রা বা মৃৎশিল্প, কারু বা অন্যান্য কারুশিল্প)। সাংস্কৃতিক বিনিময়ের পাশাপাশি এ উপলক্ষে গড়ে ওঠে পর্যটনকেন্দ্র বা আকর্ষণীয় জাদুঘর। আর কে না জানে, পর্যটনকেন্দ্র যেকোনো একটি দেশের অর্থনৈতিক আয়েরও এক উৎস।
জানি না, কেন এদিকে আমাদের আগ্রহ-উৎসাহ অপেক্ষাকৃত কম। সে কারণে আমাদের বহুসংখ্যক দর্শনীয় স্থান অবহেলায় পড়ে থাকে। তাতে যত্নের যেমন অভাব, তেমনি থাকে সেখানে যাতায়াতের অব্যবস্থাপনা। এমন পুরাকীর্তিও অবহেলিত অবস্থায় আছে, যেগুলো কেউ নাছোড়বান্দা না হলে কষ্ট করে দেখতে যেতে চাইবেন না। আমাদের শেষ কথা, সরকার তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আর কতকাল সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারে হেলাফেলার মনোভাব বহন করে চলবে?
এ বিষয়ে আমাদের ঘুম ভাঙুক, আমরা যথাযথ মাত্রায় ঐহিত্য-সচেতন হই_কথাই শুধু নয়, কাজেও। তাতে আমাদের লাভ বৈ লোকসান হবে না। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে, এসব লেখালেখি বা প্রতিবেদন প্রায়ই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আসে না। নজরে এলেও তাদের তৎপর হতে দেখা যায় না_আমাদের ঐহিত্য-চেতনা এমনই যে বলতে হয়, আমরা ঐতিহ্যবিলাসী; কিন্তু ঐতিহ্যপ্রেমী নই।

লেখক : রবীন্দ্র গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি ও ভাষাসংগ্রামী

No comments

Powered by Blogger.