শ্রদ্ধাঞ্জলি-শুদ্ধতম এক রাজনীতিক

বাংলাদেশের প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত এবং রাজশাহীর সুখ্যাত আইনজীবী আতাউর রহমান ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। ছোট বয়সে বুঝতে পারিনি, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাঁর কাজের বলয় দেখে বারবার আমরা আশ্চর্যান্বিত হয়েছি। এই বরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আমরা চাচা বলে সম্বোধন করতাম। তাঁকে চাচা বলতাম, কারণ ১৯৬৭ সালের জুন মাসে যখন আমি রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে (তৎকালীন আইয়ুব ক্যাডেট কলেজ) সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম, তখন আমার সহপাঠী ছিল আতাউর রহমানের বড় ছেলে সাদিকুর রহমান।


সেই সময় থেকেই আমার শিশুমনে গভীর দাগ কাটে আতাউর রহমানের মহত্ব, চিন্তার ব্যাপকতা, হূদয়ের বিশালতা, অন্য মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং কোনো কিছুই নিজের মনে না করে মানুষের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা।
আমার এখনো মনে আছে, আতাউর রহমানের বাসায় সারা দিন চুলা জ্বলত এবং রান্না হতো। রান্না মানে পোলাও, কোরমা একদম ভূরিভোজ যাকে বলে। কলেজের একঘেয়েমি খাওয়ার বিপরীতে সেই ভূরিভোজ আমাদের জন্য এক আকর্ষণ ছিল। এ ছাড়া সেই সময় রাজশাহীতে যে কয়েকটি ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি ছিল, এর একটির মালিক ছিলেন আতাউর রহমান। সেই গাড়িতে ঠাসাঠাসি করে বসে আমরা ঘুরে বেড়াতাম। মফস্বল থেকে আসা আমাদের মতো বালকদের জন্য এ ছিল এক আনন্দময় ব্যাপার, যেন বিশাল কিছু অর্জন। হারিয়ে যাওয়া শৈশব-কৈশোর আর সেই সুখস্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িয়ে আছেন আতাউর রহমান। আমরা দেখতাম, নানা শ্রেণী-বর্ণ-ধর্ম, বিশেষত নিম্নবর্গের মানুষ আতাউর রহমান চাচার বসার ঘরে বসে আছেন আর চাচা গভীর মমতায় তাঁদের সমস্যা, দাবি-দাওয়া, অভিযোগ শুনছেন। কাউকে তিনি বিমুখ করতেন না। কেউ হয়তো সমস্যার কথা বলে কাঁদছেন, তিনি পকেট থেকে টাকা বের করে দিয়ে দিচ্ছেন। কখনো গুনেও দেখেননি কত টাকা দিচ্ছেন। আমরা সাদিককে প্রায়ই ঠাট্টা করে বলতাম—চাচা এত টাকা দেন, আমাদের কিছু টাকা দিলে তো আমরা রাজশাহীর মিষ্টান্ন ভান্ডারে গিয়ে পেট পুরে মিষ্টি খেতে পারতাম। আমরা মুখ ফুটে কিছু আবদার করেছি বা খেতে চেয়েছি আর বাসা থেকে ঠিক বের হয়ে আসার আগমুহূর্তে দেখতাম, টেবিলের ওপর রান্না করা অথবা মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে আনা মিষ্টি থরে থরে সাজানো আছে আমাদের জন্য।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে যখন প্রতিটি জেলায় গভর্নর মনোনয়ন দিলেন, তখন আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতা ছিলেন, কিন্তু আতাউর রহমানের রাজনৈতিক সততা, নিষ্ঠা এতটাই তীব্র ছিল এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে সর্বসাধারণের মাঝে তাঁর গ্রহণযোগ্যতার বিবেচনায় রাজশাহী জেলার গভর্নর হিসেবে বঙ্গবন্ধু বেছে নিলেন ন্যাপের আতাউর রহমানকে। বঙ্গবন্ধু কিন্তু সঠিক মানুষটিকে বেছে নিয়েছিলেন। গণমানুষের মুক্তির লক্ষ্য যেমন ছিল বঙ্গবন্ধুর চেতনায়, ঠিক তেমনি ছিল এই আতাউর রহমানের। এই অভিন্ন স্বপ্ন ও লক্ষ্য নিয়ে দুজনে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ে অবস্থান করা সত্ত্বেও এত কাছাকাছি ছিলেন। প্রাণের এই যে নৈকট্য, এর কিন্তু অন্য কোনো ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।
ইতিহাসের দ্বারস্থ হলে আমরা দেখতে পাব, পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশের মুসলিম পরিবার থেকে আসা যে কয়েকজন হাতেগোনা রাজনৈতিক কর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গণতান্ত্রিক বাম ধারার রাজনীতির সূত্রপাত করেন তার মধ্যে আতাউর রহমান ছিলেন একেবারে প্রথম সারির একজন। ১৯৪৭ সালে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন, এই সংগঠনের নীতি-নির্ধারণের মূল কাজগুলো যাঁরা করেছেন সংগঠকের ভূমিকায়, দার্শনিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, তিনি হচ্ছেন আতাউর রহমান। ভাষার লড়াই, যুক্তফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন—সবকিছুতেই আতাউর রহমানের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা আমাকে এখনো বিস্মিত করে। তিনি কেবল একজন নির্ভেজাল মানুষ ছিলেন না, তাঁর আসল পরিচয় দূরকল্পী শুদ্ধতম রাজনীতিবিদ। এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় সরদার ফজলুল করিমের একটি মূল্যায়ন উল্লেখ করার তাগিদ বোধ করছি, ‘তিনি ছিলেন অনেক আন্দোলনের অনুঘটক।’
অনেকেই বলেন, সমাজতন্ত্র সেকেলে ধারণা, তার মৃত্যু হয়েছে, সমাজতন্ত্রের পতন হয়েছে বিশ্ব থেকে। আমি কিন্তু ভিন্নমত পোষণ করি। সমাজতন্ত্র যদি একটি মতবাদ হিসেবে দেখা হয়, যে মতবাদটি একটি বিশেষ প্রকারে ও ছাঁচে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রবর্তনের চেষ্টা হয়েছিল, সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়তো ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু সমাজতন্ত্রকে যদি একটি দর্শন হিসেবে দেখি, যে দর্শন মানুষের সত্যিকারের মুক্তির কথা বলে, যেখানে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ বিলোপ করে মুক্তির পথ বাতলে দেয়, যেখানে একজন মানুষ প্রকৃত অর্থেই স্বাধীনভাবে বাঁচতে ও বসবাস করার একটি সমাজ নির্মাণ করতে পারে, সেই দর্শন হিসেবে সমাজতন্ত্রের কিন্তু কখনো মৃত্যু হতে পারে না। আমাদের দেশে এখন রাজনীতি হয়ে গেছে কলুষিত, রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়িয়েছেন কালোটাকার মালিকেরা।
কোথায় এখন পাব একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি নিঃস্বার্থভাবে সমগ্র জীবন দিয়েছেন দেশের মানুষের জন্য। কোথায় পাব আতাউর রহমানকে, যিনি নিঃস্বার্থভাবে শেষ কপর্দকটুকু দলের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। সমাজে বৈষম্য, দারিদ্র্য যখন আছে, সেহেতু সমাজতন্ত্রের মৃত্যু হয়নি। মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু কখনো হয় না। সমাজতন্ত্র যদি একটি স্বপ্নও হয়ে থাকে, তবে তাকে লালন করে সামনে পথ চলতে হবে।
আতাউর রহমান তাঁর জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছেন তাঁর দর্শনের জন্য এবং তাঁর দর্শনটি হলো সমাজতন্ত্র। তিনি মনে করতেন, একমাত্র সমাজতন্ত্রই হলো সেই পথ, যার মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মুক্তি আসতে পারে। এটি ছাড়া আর অন্য কোনো আর্থসামাজিক কাঠামোতে মানুষের মুক্তি সম্ভব নয়। আর বিশ্বাস নিয়েই তিনি এই পৃথিবী থেকে ১৯৮০ সালের ১২ জানুয়ারি বিদায় নিয়েছেন।
অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান
চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ

No comments

Powered by Blogger.