চ্যালেঞ্জের মুখে পোলট্রি শিল্প by আলতাব হোসেন

শীতের শুরুতেই পোলট্রি সেক্টরে দেখা দিয়েছে বার্ড ফ্লু। গত এক সপ্তাহে বগুড়া, ফরিদপুর, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও ঢাকার আশপাশের প্রায় দেড়শ' খামার বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছে। চলতি মাসেই বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হয়ে তিন লাখ মুরগি মারা গেছে। জানুয়ারি থেকে শীতের তীব্রতা বাড়লে বার্ড ফ্লু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা খামারিদের। পোলট্রি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতের অতিথি পাখির মাধ্যমে দেশে বার্ড ফ্লু ছড়াচ্ছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ


মন্ত্রণালয়ের হিসাবে চলতি বছরের ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত ২৩ লাখ ৮৭ হাজার মুরগি নিধন করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের মহাসচিব খোন্দকার মহসিন সমকালকে বলেন, তাদের অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে বার্ড ফ্লু ও পোলট্রি খাবারের উচ্চমূল্যের কারণে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ সময় বার্ড ফ্লুতে মুরগি মারা গেছে ৫০ লাখের বেশি। এ কারণে খামারিদের ক্ষতি হয়েছে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি। খামার বন্ধ হওয়ার কারণে গত ১১ মাসে পাঁচ লাখ মানুষ নতুন করে বেকার হয়েছে বলেও জানান তিনি। সাভারে বাংলাদেশ বিমানের হ্যাচারিতে ২০০৭ সালের ২২ মার্চ প্রথম এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস (বার্ড ফ্লু) ধরা পড়ে।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন ও সরকারি হিসাবে শীতের এ সময়ে পিকনিক, স্কুল-কলেজের বার্ষিক অনুষ্ঠান ও অন্যান্য উৎসবের কারণে মুরগি এবং ডিমের চাহিদা থাকে বেশি। চলতি সপ্তাহে ২২ লাখ কেজি মুরগির মাংসের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন হয়েছে ১৫ থেকে ১৬ লাখ কেজি। ঘাটতি ছয় লাখ কেজি। বছরের অন্যান্য সময়ে মুরগির চাহিদা হচ্ছে ১৯ লাখ কেজি। সারাদেশে প্রতিদিন ডিমের চাহিদা ২ কোটি ৬০ লাখ। এর মধ্যে ঢাকার চাহিদা এক কোটি ৩০ লাখ। চলতি সপ্তাহে ডিম উৎপাদন হয়েছে গড়ে এক কোটি ১০ লাখ। ফলে ডিমের ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে প্রতিদিন ৫০ লাখ। বার্ড ফ্লুর কারণে ঘাটতি আরও বাড়ছে বলে মনে করেন খামারিরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে দেশে প্রোটিনের ঘাটতি চরম পর্যায়ে পেঁৗছতে পারে।
বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের হিসাবে, বার্ড ফ্লুতে চলতি সপ্তাহে বগুড়ার গাবতলীর সেতু পোলট্রিতে সাড়ে ৩শ' মুরগি নিধন করা হয়েছে। একই এলাকার প্রকৌশলী রোকনের পোলট্রি খামারে সাড়ে ১৩ হাজার, টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের স্বপন পোলট্রিতে ৮ হাজার মুরগি নিধন করতে হয়। এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বহু খামারেই।
ক্ষুদ্র খামারিরা অভিযোগ করেন, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বার্ড ফ্লু বন্ধে ১৪২ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প টিকিয়ে রাখতে এ বিষয়টি সরকারের নজরে আনছে না। ফলে বার্ড ফ্লু মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। দেশের হাজার হাজার খামার বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হলেও স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতর তা তালিকাভুক্ত করছে না। কাপাসিয়ার ক্ষুদ্র খামারি তুষা পোলট্রি ফার্মের মালিক আমিরুল ইসলাম জানান, বার্ড ফ্লুর নতুন ভাইরাস এবার আক্রমণ শুরু করেছে। তিনি সরকারকে ভাইরাসটি শনাক্ত করার দাবি জানিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। পোলট্রি বিশেষজ্ঞরা জানান, একটি খামার থেকে আরেকটি খামারের দূরত্ব এক-দুই কিলোমিটার হওয়ার কথা থাকলেও তা কেউ মানছে না। এক খামার থেকে অন্য খামারের দূরত্ব কম হওয়ায় বার্ড ফ্লু সহজে ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে বার্ড ফ্লুর প্রকোপ কমে আসবে। তবে এ তথ্যের সঙ্গে দ্বিমত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, তাপমাত্রা ৬২ সেলসিয়াসের উপরে থাকলে বার্ড ফ্লুর ভাইরাস ধ্বংস হয়। কিন্তু বাংলাদেশে তাপমাত্রা ৪২ সেলসিয়াসের উপরে খুব একটা ওঠে না। ফলে বার্ড ফ্লুর প্রকোপ সহজে কমবে বলে মনে হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও বার্ড ফ্লুর চরম অবস্থা চলছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে ২০০৯ সালের জুনে দেশে খামারের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১৪ হাজার ৭৬৩টি। ২০১০ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৮ হাজার ৩২২টিতে। আর ২০১১ সালের ২০ মার্চ পর্যন্ত টিকে থাকার সংখ্যা ছিল ৭২ হাজার ১৬৫টি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বার্ড ফ্লুর কারণে আরও ৮ হাজার খামার বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের হিসাবে, গত বছরও এ শিল্পে ৫৫ থেকে ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ছিল। এখন কমে ৪০ লাখের নিচে নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মহসিন বলেন, বার্ড ফ্লু ধরা পড়ার পর থেকে গত বছর পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ ছিল চার হাজার ৭৬১ কোটি টাকা। বর্তমানে তা আট হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। তিনি বলেন, বার্ড ফ্লুর কারণে খামারিরা বেকার হয়ে পথে বসে পড়ছেন। সাভার বা গাজীপুরের পোলট্রি খামারগুলো এখন গার্মেন্ট মেসে পরিণত হয়েছে। অথচ সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। ব্যাংকগুলো ২০০৯ সালের পর থেকে এ খাতে কোনো ঋণ দিচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, সরকারের নজরদারির অভাবে পোলট্রি খাবারের দামও আকাশচুম্বী।
খামারিরা অভিযোগ করেন, দেশে ভ্যাকসিন পরীক্ষার ল্যাব না থাকায় ভ্যাকসিনে পানি বিক্রি করেও হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে পারে একটি চক্র। তাই তারা দেশেই ভ্যাকসিন তৈরির ওপর সরকারকে জোর দিতে অনুরোধ জানান। এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু'জন শিক্ষক দেশে বার্ড ফ্লুর টিকা উৎপাদন সম্ভব বলে জানালেও সরকার টিকা উদ্ভাবনের বিষয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
ওয়ার্ল্ড পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশ শাখার সাধারণ সম্পাদক এমএ সালেক বলেন, এ সেক্টরে এসে বিনিয়োগকারীরা বারবারই হোঁচট খাচ্ছেন। আমরা বহুবার ব্যাংক সুদের হার কমানো, ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ করার অনুরোধ জানিয়েছি; কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তিনি বলেন, সরকার সহযোগিতা করলে এ খাতে আরও ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পোলট্রি বিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির আহ্বায়ক এবং ওয়ার্ল্ড সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশনের বাংলা শাখার (ওয়াপসা-বিবি) সভাপতি মশিউর রহমান বলেন, পোলট্রি খামারিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো উচিত। এ খাতের খামারিদের ২০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হুমকির মুখে বলে তিনি সমকালকে জানিয়েছেন। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব সাইদুর রহমান বাবু বলেন, শুধু মুরগি কিংবা ডিম নয়, একদিন বয়সী বাচ্চার দরপতনেও হ্যাচারি মালিকদের নাভিশ্বাস উঠেছে। তিনি বলেন, বার্ড ফ্লুর কারণে অনেক হ্যাচারি বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কাজী জায়েদুল হাসান জানান, একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে কমে বিক্রি করতে হচ্ছে এখন। নারিশ পোলট্রির পরিচালক আরেফিন খালেদ অঞ্জন বলেন, শীতের প্রভাব শুরু করেছে। দু'একটি স্থানে ইতিমধ্যেই এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে মুরগি মারা যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস খাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে অনেক খামারি সর্বস্বান্ত হয়েছেন বলে স্বীকার করেন। এ জন্য ক্ষতিপূরণসহ দ্রুত আক্রান্ত এলাকায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা যাচ্ছেন বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, বার্ড ফ্লু স্থায়ীভাবে প্রতিরোধে দেশের সাতটি আঞ্চলিক রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার চালু করা হয়েছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ে জেলা হাসপাতালগুলোতে র‌্যাপিড ডায়াগনস্টিক কিট সরবরাহ করা হয়েছে। ৩০৬টি উপজেলায় এক হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

No comments

Powered by Blogger.