পার্বত্য শান্তিচুক্তি আমরা অবশ্যই বাস্তবায়ন করব

পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, এ চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। নিশ্চয়ই এটা আমরা করব। শেখ হাসিনা ২০০১ সাল পরবর্তী বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের সব অত্যাচার-নির্যাতনের বিচারের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হবে। এদের বিচারও বাংলার মাটিতেই হবে। এ বিচার না হলে দেশে শান্তি ফিরে


আসবে না। প্রধানমন্ত্রী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সহিংসতার উল্লেখ করে বলেন, বিরোধী দল দেশে আবারও সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করতে চায়। খালেদা জিয়া ও তার দুই ছেলের দুর্নীতি ও যুদ্ধাপরাধের বিচার বাধাগ্রস্ত করাই এর উদ্দেশ্য বলে আবারও অভিযোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার গণভবনে বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে এসব কথা বলেন। গতকালের
এ বৈঠকের মধ্য দিয়েই শেখ হাসিনার সঙ্গে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ধারাবাহিক বৈঠক ও মতবিনিময়ের কর্মসূচি শুরু হলো। পর্যায়ক্রমে সব জেলার তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গেই বৈঠক করবেন তিনি।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০০১ পরবর্তী অত্যাচার-নির্যাতনের ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ইতিমধ্যে ওই কমিশনের তদন্ত রিপোর্টের আংশিক বেরিয়েছে। এ রিপোর্টে দেখা গেছে, বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা ওই সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের ওপর কী বীভৎস অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে। হত্যা করেছে, চোখ তুলে নিয়েছে, মেয়েদের ধর্ষণ করেছে, লুটপাট-অগি্নসংযোগ করেছে।
তিনি বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা যেভাবে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছিল ২০০১-এর অক্টোবরে ক্ষমতায় এসে বিএনপিও তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়েছে। ঠিক একই কায়দায় তারাও মানুষের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে পার্বত্য শান্তিচুক্তি প্রণয়নের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে বিএনপি সেনাবাহিনী দিয়ে পার্বত্যাঞ্চলের সংঘাত অবসানের প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ ওই অঞ্চলের সমস্যাকে রাজনৈতিক হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে সেনাবাহিনী দিয়ে নয়, রাজনৈতিকভাবেই এর সমাধানের প্রচেষ্টা নেয়। যে কোনও সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের মাধ্যমে শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমরা বিশ্বাসী। এ জন্যই আমরা পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছিলাম।
তিনি বলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে ৬২ হাজার শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা হয়। পাশাপাশি ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর এ চুক্তি আর বাস্তবায়ন করেনি। সেখানে শান্তি ফিরে আসুক, সেটাও তারা চায় না। ?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারও ক্ষমতায় এসে শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আমরা একটি কমিটি করে দিয়েছি। এ চুক্তির পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে অবশ্যই আমরা পদক্ষেপ নেব। তবে এখন আবারও সেখানে অশান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। কেউ কেউ সেখানে নানা ধরনের খেলা খেলারও চেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থেকে ওই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সহযোগিতার জন্য সেখানকার অধিবাসীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, হঠাৎ করে সেদিন দেখলাম বোমাবাজি। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা ডেকেছিল বিকেল ৩টায়। আর ভোর ৫টা-সাড়ে ৫টার মধ্যে রাস্তায় লোক নামিয়েছে মানুষ হত্যা, বোমাবাজি, সন্ত্রাস আর বাসে আগুন দিয়ে মানুষকে পুড়িয়ে মারার উদ্দেশ্যে।
তিনি বলেন, এই বোমাবাজি, হত্যা, ভাঙচুর ও জ্বালাও-পোড়াও কার স্বার্থে? অতীতে ক্ষমতায় থেকে তারা দুর্নীতি-লুটপাট করেছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কালো টাকা সাদা করেছেন, এতিমদের নামে বিদেশ থেকে টাকা এনে খেয়ে ফেলেছেন। তার ছেলেরা দুর্নীতি ও লুটপাট করে অর্থ আত্মসাৎ করেছে, বিদেশে টাকা পাচার করে ধরা খেয়েছে। বিদেশের আদালতেও এর প্রমাণ হয়েছে। এফবিআই সদস্যরাও এ দেশে এসে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন বিএনপি নেত্রীর ছেলেরা ঘুষ ও দুর্নীতি করেছে। তারা ক্ষমতায়ই আসে কেবল দুর্নীতি-লুটপাট করে নিজেদের আখের গোছাতে আর মানুষকে শোষণ করে বিলাসী জীবন যাপন করতে।
এ প্রসঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরুর উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এগুলোর বিচার কেন হবে না? এর বিচার না হলে বাংলাদেশ দুর্নীতিমুক্ত কীভাবে হবে? চুরি করবে, টাকা পাচারও করবে আর তার বিচার করতে গেলেই বোমাবাজি ও মানুষ হত্যা করবে_ এটা কেমন কথা?
তিনি বলেন, যাদের জন্ম দেশের বাইরে, বিভিন্ন জায়গায়_ তাদের দেশের এ উন্নয়ন ভালো লাগছে না। এ কারণেই এত সন্ত্রাস, বোমাবাজি ও হুমকি-ধমকি। বিএনপি নেত্রীকে বলতে চাই, এসব ঘটিয়ে আর হুমকি-ধমকি দিয়ে কাজ হবে না।
বিএনপি-জামায়াত জোটের পাঁচ বছরের দুঃশাসনের উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা দেশকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদের দেশে পরিণত করেছিল। মানুষ শান্তিতে ছিল না। আর আমরা ক্ষমতায় এসে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দূর করেছি। এখন মানুষ শান্তিতে আছে।
দলকে সুসংগঠিত ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীরাই অনেক বৈরী পরিবেশের মধ্যেও আন্দোলন-সংগ্রাম করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। পঁচাত্তর ও ২০০১ পরবর্তী অত্যাচার-নির্যাতন সত্ত্বেও তারাই দল ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধরে রেখেছে। যার কারণেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমরা ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করতে পেরেছি।
দলকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা তুলে ধরে তিনি বলেন, তৃণমূল সম্মেলন, সদস্য সংগ্রহ অভিযান এগুলোর মাধ্যমে দলকে গড়ে তোলা হবে। জেলা কমিটির মাধ্যমে উপজেলা, উপজেলার মাধ্যমে ইউনিয়ন এবং ইউনিয়নের মাধ্যমে ওয়ার্ডগুলোতে একটি করে কমিটি করে দেওয়া হবে। এসব কমিটির মাধ্যমেই সদস্য সংগ্রহ অভিযান জোরদার করাসহ তৃণমূলের সম্মেলন ও দল গোছানো হবে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে বান্দরবানের তৃণমূল নেতাদের মধ্যে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। দলের চট্টগ্রাম বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের পরিচালনায় এ বৈঠকে বান্দরবান জেলা কমিটি ছাড়াও এর সব উপজেলা, থানা, পৌর ও শহর কমিটির নেতারা, দলীয় সাংসদ এবং উপজেলা ও পৌর মেয়ররা অংশ নেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তাদের মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন।
এ সময় দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কাজী জাফর উল্লাহ, পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, পার্বত্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, দলের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, ফজিলাতুন্নেছা ইন্দিরা, এ কে এম রহমতউল্লাহ, মৃণাল কান্তি দাস প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

No comments

Powered by Blogger.