বই আলোচনা-যন্ত্র সময়ের গল্প

পেণ্ডুুলামের সঙ্গে দুলে ওঠে শিশুর দোলনা। শিশুর দোলনা থেকে সময়ের সাগর, ফ্যান্টাসি রাজ্যের অদ্ভুত সব রাইডার্স। মানুষ ওঠে, মানুষ নামে। সময় সংকেত দেয়, দোলক দুলতে থাকে। দোলন ছড়িয়ে যায় জিন্স। টি-শার্টের ভেতরে। ব্যান্ডের তালে, উন্মুক্ত কনসার্টে। দুলে ওঠে ফেইসবুক, নিশাচর মানব-মানবী। এই যে মানুষ, তার ভেতরগত ভাঙন প্রক্রিয়া, মনের বিবিধ গতিপ্রকৃতি অনেক বেশি জটিল। চরম দ্বান্দ্বিক তার আচরণ। রাষ্ট্র, সমাজ, সমাজ অন্তর্গত


মানুষের এই আচরণগত বিশ্লেষণ কি পুরনো ভাষাশৈলী বা আঙ্গিকে প্রকাশ সম্ভব? এমন ভাবনা একজন গল্পকারের বেলায়ও যখন অস্বভাব সংগত নয়, তখন সমাজগত অস্থির হয় শিল্পকলা তত বিমূর্ত হয়ে ওঠে_এমন শিল্পতত্ত্ব তার শিল্পমনকে উজিয়ে নির্মাণ করতে চায় একটি স্বতন্ত্র ভাবনার জগৎ।
নভেরার ১০টি গল্পে মোড়া 'পেণ্ডুলাম ও শিশুর দোলনায়' সেই ভাবনার স্ফুরণ। এই স্ফুরণ প্রয়াসে আমরা দেখি তাঁর অধিকাংশ গল্পে সরল রৈখিক গল্প বলার রীতির সঙ্গে বিরূপাচারের চিহ্ন। কাহিনীর জায়গায় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বয়ান। ভাষাশৈলীতে এমন ব্যঞ্জনা যা যুক্তিকে উপেক্ষা করে, ব্যাখ্যাকে দূরে ঠেলে দেয়। কিন্তু বিমূর্ততারও রয়েছে এক অশরীরি শরীর। কেমন কেই শরীরি রূপ কাঠামো? এ বিষয়ে নভেরার ধারণা কি? এই তত্ত্ব তালাশে যাওয়া যায় তাঁর দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্প 'নাইটমেয়ার' এবং 'ভার্জিনিয়া! ভার্জিনিয়া!'তে। দুটি গল্পেরই অবলম্বন প্রচল অস্থির যন্ত্র সময়। 'ভার্জিনিয়া! ভার্জিনিয়া!'য় লালাভ পপি এবং ওয়াল্ডেন পন্ড এসেছে প্রতীকরূপে যার অনুপুঙ্খ বর্ণনা গল্পের প্লটকে এগিয়ে নেয় সামনের দিকে। গল্পের প্রধান চরিত্র শিবব্রত, যে কামকাতরতায় আচ্ছন্ন_যে সময় অতিক্রম করে ইন্টারনেট আর ফেইসবুকের সামনে। ফেইসবুকের রঙিন পর্দায় তার কাছে ধরা দেয় সমাজের অন্য এক রূপাবয়ব। গল্পের ভাষাশৈলীর ধরনটি দেখা যায় আমাদের সমকালীন কোনো কেনো তরুণ গল্পকারের গল্পে। এই মুহূর্তে হামিদ কায়সারের নাম মনে পড়ছে, কিন্তু এই গল্পটিতে আমাদের কাছে ধরা পড়ে পশ্চিমী ফ্যান্টাসি, উদ্ভটত্বের প্রভাব। যদিও আমাদের চিন্তন সক্রিয়তা ক্ষণিক কাজ করে ফ্রয়েডিও তত্ত্বে, যখন দেখি গল্পকারের ভাষায়, 'সন্ধ্যায় উন্মত্ত হাতির মতো পথে নামে শিবব্রত, হাঁটতে হাঁটতে নীলক্ষেতের মোড়ে এসে উপস্থিত হয়, লাইট পোস্টের নিচে কমলা রঙের শাড়ি পরা কমলা টিপের এক মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাছে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের কবিতার স্বাদ নিয়ই তুষ্ট থাকতে হয়। একই কথা বলা যায় তাঁর 'নাইটমেয়ার' গল্পের ব্যাপারে। প্রাত্যহিক ঘটনাবলিকে একটি ইলিউশনের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। যদিও আঙ্গিকের দিক থেকে এটা নিরীক্ষাধর্মী এবং এর মধ্যে নিহিত গল্পকারের প্রচলিত ফর্ম থেকে ভিন্নতা সৃষ্টির অভিপ্রায়।
এই দুটি গল্পকে বাদ দিলে বাকি গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি গভীর যোগসূত্র। অর্থাৎ প্রতিটি গল্পে রয়েছে একটি নারীর গল্প, যা প্রধান চরিত্ররূপে আবির্ভূত। প্রথম গল্প 'বেহালার একান্বিকা'য় সারানা। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের মুখেই বিয়ে সংসার এবং যথারীতি শিক্ষালয় গণ্ডীর যবনিকাপাত। সর্বোচ্চ সনদ দিয়ে কি হবে? রান্নাঘরে ঢোক, বাজার করো, গোছগাছ করো, মেয়েকে রেডি করে কলেজে পাঠাও। মাঝেমধ্যে পার্টিতে গিয়ে স্বামীর সমীহকে বাড়িয়ে দাও, ডলস হাউসের নোরা কিন্তু কখনো দরজায় শব্দ করার চিন্তা করো না। সারানা দরজার শব্দ না তুলেই মনকে আলতামোহর কিংবা লাবনের নামে মনকে চাপিয়ে দিয়ে সময়ে-অসময়ে বেরিয়ে পড়ে। লাবনের ক্যামেরায় ধরা পড়ে 'ক্রেনস আর ফ্লাইং'। কিন্তু আলতামোহর? নদীর কূলে দেখা যায় না তাকে। স্রোতের সঙ্গে ভেসে ভেসে কতক্ষণে চলে গেছে আরেক পৃথিবীতে। কিন্তু এ কিসের ইঙ্গিত? নারী স্বাধীনতার চূড়ান্ত মন্তব্য? অন্যদিকে লাবন? চমৎকার দ্বান্দ্বিক উপস্থাপনা। যে ভাষাশৈলী এবং আঙ্গিকে নিরীক্ষমাণ নভেরা, সেই বিচারে সর্বাধিক সফল গল্প তার এটি।
গল্পটির দুটি বিষয় আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। একটি সজলের মা এবং জেল গেটে পাহারাদারনির আচরণ আমাদের প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, তাহলে কি নারী নিজেও পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধিত্ব করছে? এবং পরেরটি দ্বিজয়িতার বিছানার বমি উদগীরণ, যার সঙ্গে বিষাক্ত অনুভূতি মিশে থাকার বিষয়টি প্রতীকায়িত করা হয়েছে। কিন্তু আমার মনে হয়, যে ফর্মটি তাঁর শুরুর দিকের রচনায় লক্ষণীয়, সেই ধারাটি তার শেষ গল্পে এসে মিলিয়ে যেতে চায়।
পেন্ডুলাম ও শিশুর দোলনা_নভেরা হোসেন। প্রকাশক : শুদ্ধস্বর। প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান। মূল্য : ১৫০ টাকা।

No comments

Powered by Blogger.