অরুণ জেকস-মিসরের অসমাপ্ত বিপ্লব

ভেম্বরের ১৯ তারিখ বিকেল থেকেই কায়রোর মোহাম্মদ মাহমুদ স্ট্রিটে যুদ্ধ-যুদ্ধ আবহ তৈরি হয়েছিল। গত কয়েকদিনে সংবাদ মাধ্যমে এই জায়গার ঘটনাগুলো ব্যাপকতর প্রচার পাওয়ার কারণে জায়গাটা সবার দৃষ্টিতে এসে পড়ে। গোটা স্কোয়ারেই ততক্ষণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লোকজন নিরাপত্তা বলয় তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিল। তাহরির স্কোয়ারের বিশাল এলাকাজুড়ে আন্দোলনকারীদের সমাবেশ দেখে সেখানে সহিংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, এটাই


ছিল স্বাভাবিক। অসমাপ্ত বিপ্লব সম্পন্নকারীদের দিকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি পড়েছিল কঠোরভাবে।
সেখানে যেভাবে যুদ্ধংদেহী অবস্থা বিরাজ করছিল, বিশেষ করে বর্তমান প্রশাসনের নিরাপত্তা রক্ষাকারীদেরও যেভাবে সেখানে উপস্থিত হতে দেখা গেছে, তাতে ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে অনুমান করা যায়। কিন্তু আশ্চর্যই বলতে হবে, সেই অনুযায়ী নৃশংসতা কিন্তু সেখানে ঘটেনি। ঘটনাপরম্পরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কোনো কোনো বিশ্লেষক রাস্তাটি যাঁর নামে করা, সেই মোহাম্মদ মাহমুদ-এর প্রসঙ্গও টেনেছেন। তাঁদের কথা, মাহমুদ বিখ্যাত সেই প্রতিনিধিদলের সদস্য, যিনি চার সদস্যের একজন হিসেবে প্যারিসে ১৯১৯ সালে শান্তি আলোচনায় যোগদান করেছিলেন। তাঁরা সেখানে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে মিসরের স্বাধীনতার ব্যাপারে যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে স্বাধীনতা লাভের এই আকাঙ্ক্ষা কিন্তু ব্রিটিশদের কাছে ভালো ঠেকেনি। তারা চিন্তা করে, এই চার বিপ্লবীকে যদি না থামানো যায়, তাহলে ক্ষতি হবে ব্রিটিশদের। তাই ১৯১৯ সালের ৮ মার্চ চারজনকেই বন্দি করে মাল্টায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয়। পরের দিনই শত শত ছাত্র কায়রোর রাস্তায় রাস্তায় প্রতিবাদী মিছিলে ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তাহকালের মধ্যেই দেখা গেল, এই আন্দোলন শত শত শহর-গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। এই আন্দোলনের ব্যাপ্তি ছিল এতই বেশি যে মিসরের গ্রামগুলোও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে।
জানুয়ারিতে শুরু হওয়া বিপ্লবের যে ধারা, তা বিশ্লেষণ করেছেন বিশ্বের সেরা বিশ্লেষকরা। তাঁদের দৃষ্টিতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের মিসরও ফুটে উঠেছে। গত ১০ মাসের ঘটনা থেকে মনে হতে পারে, মিসর যেন ১৯৬১ সালের তুরস্কের মতো হয়ে যাচ্ছে। যেমন ১৯৬৮ সালে হয়েছিল ফ্রান্সে এবং ইরানে হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। অথবা ১৯৮৯ সালে যা হয়েছিল পোল্যান্ডে।
নজরে আসে আরেকটি দিক। মিসরের যে সেনাশাসকরা আছেন, তাঁরা কিন্তু মোবারকের শাসনসৃষ্ট। শুধু তাই নয়, তাঁদের ঔপনিবেশিক শাসকদের ধারাবাহিকতা রক্ষাকারী বলেও গণ্য করা যায়। ১৮৮২ সালে ব্রিটিশ শাসনে চলে যাওয়ার পর থেকে মিসরে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা কিন্তু বদলায়নি শতভাগ। ১৯১৯ সালে যেমন সাধারণ মানুষের ইচ্ছাকে দমন করা হয়েছিল, এবারও যেন সেই ছবিরই দ্বিতীয় অধ্যায় প্রদর্শিত হলো।
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন যেমন দেখতে দেখতে সারা মিসরে ছড়িয়ে পড়েছিল, হালের আন্দোলনটা তেমনি একে একে কায়রো ছাড়িয়ে গোটা মিসরে ছড়িয়ে পড়েছে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে তাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে এখনকার আন্দোলনের যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ১৯১৯ সালের আন্দোলনের ফসল কিন্তু ১৯২২ সালের চূড়ান্ত পরিণতি; অর্থাৎ তাদের স্বাধীনতা লাভের বিষয়টি নিশ্চিত হয় সেই আন্দোলনের সূত্র ধরে। প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের শেষ আমলটাও ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। কিন্তু আন্দোলনের সীমানা চিহ্নিত হয়ে যায় তখনই। পরিণতির বিষয়েও তাদের মধ্যে স্পষ্টত উচ্চাশা ছিল। আর গণতন্ত্রকামীদের মধ্যে এই উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল সেখানকার সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কেন্দ্র করেই। মিসরের জাতীয়তাবাদী শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজে লাগানোর সাফল্যও সেখানকার আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। আর সেনাশাসকরা যা করেছেন, তাকে গণতান্ত্রিক দেশের জন্য গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা যায় না। তাঁরা যেন তাদের পূর্বসূরিদের পথেই হেঁটেছেন। কিন্তু তাঁরা পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহসী হননি। কিংবা বলা চলে, তাঁদের এ ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সংহতিরও পরিচয় পাওয়া গেছে। মোহাম্মদ মাহমুদের সেই পুরনো উক্তিই যেন ২০১১ সালে এসে আবারও উচ্চারিত হলো। বলা হলো, মিসরে যে বিপ্লব শুরু হয়েছে, তা চলতে থাকবে। আর যদি তার উল্টো কেউ ভেবে থাকেন, তা ভাবতে পারেন। কিন্তু তাঁর পর্যবেক্ষণ তাই।

লেখক : মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করছেন, একই সঙ্গে তিনি একজন ইতিহাসপ্রণেতাও।
আল জাজিরা নেটওয়ার্ক থেকে ভাষান্তর মোস্তফা হোসেইন

No comments

Powered by Blogger.