দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে ঘৃণার রাজনীতি জনগণের দৃষ্টি ঘোরানোর কৌশল

দক্ষিণ এশিয়ায় সামপ্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক সহিংসতা ও মানবিক বিপর্যয় আইন শাসনের ভাঙনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে (যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়) এক হিন্দু ব্যক্তিকে মুসলিম জনতার গণপিটুনিতে মৃত্যু, ভারতে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র এক নেতার বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বার্ষিক বড়দিনের অনুষ্ঠানে হামলা, জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে এক অন্ধ নারীকে লাঞ্ছিত করা, কিংবা নেপালে মোবাইল চুরির মিথ্যা অভিযোগে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনাগুলো তারই উদাহরণ।

দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক স্বার্থে যখন নেতারা নিপীড়ন ও প্রতিশোধের চক্রকে ব্যবহার করেন, তখনই এ ধরনের ঘটনার জন্ম হয়। সংখ্যালঘু সমপ্রদায়, শরণার্থী, অভিবাসী কিংবা প্রতিবেশী দেশকে ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করে অনুসারীদের উস্কে দেয়া হয়। উদ্দেশ্য একটাই- অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে জনগণের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দেয়া।

নিউ ইয়র্ক-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলি এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন।

‘এ ক্রস সাউথ এশিয়া, লিডারস আর প্রমোটিং হেইট টু ডিসট্র্যাক্ট সিটিজেনস ফ্রম ইকোনমিক ইনসিকিউরিটি’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে মিনাক্ষী গাঙ্গুলি লিখেছেন, ঘৃণার এই রাজনীতি অনেক সময় দেশের সীমানার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে হিন্দুর ওপর হামলার অভিযোগে ভারতের বহু নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করেন, আবার ভারতে মুসলমানদের ওপর হামলার প্রতিবাদে সরব হন বাংলাদেশিরা। এমনকি খেলাধুলার অঙ্গনও এর বাইরে থাকেনি। জাতীয়তার কারণে বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারকে আইপিএল থেকে বাদ দিতে ভারতের ক্রিকেট বোর্ডের নির্দেশের পর বাংলাদেশ সরকার জানায়, ভারতে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে তাদের জাতীয় দল নিরাপদ নাও থাকতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্কের কারণে ক্রিকেট ও সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলে জম্মু ও কাশ্মীরে হিন্দু পর্যটকদের ওপর হামলার জেরে পরিস্থিতি ভয়াবহভাবে সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়। দুই দেশের জনগণের ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

অনলাইন ঘৃণা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে অ্যালগরিদমকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপব্যবহার করে রাজনৈতিক মতাদর্শীরা যে অসন্তোষ উস্কে দিচ্ছেন তা এখন স্পষ্ট। আইন মানা, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা করা কিংবা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করাকে তারা ‘অপ্রয়োজনীয় তোষণ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। এসব কৌশল ব্যর্থ হলে তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ বেছে নেন, আগেই ভেঙে ফেলেন সেই প্রতিষ্ঠানগুলো, যেগুলো তাদের লাগাম টানতে পারতো।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে সামপ্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিভাজনের ফলে অর্থনৈতিক স্থবিরতায় জর্জরিত জনগণের ক্ষোভে ক্ষমতাসীন নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। আবার ভারত, পাকিস্তান কিংবা মালদ্বীপের মতো দেশে শঙ্কিত শাসকরা বিক্ষোভ দমনে কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছেন।

ঘৃণা ছড়িয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা না করে নেতারা চাইলে অধিকার রক্ষা করে বাস্তব উন্নয়নের কঠিন পথ বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা তা করতে অনিচ্ছুক।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের দমননীতির পর সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে একটি ছোট আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তবে সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে দায়িত্ব নেয়া অন্তর্বর্তী সরকারও দ্রুত দিশা হারায়, জনতার প্রতিশোধমূলক দাবিতে তারা অচল হয়ে পড়ে। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেয়ায় বাংলাদেশিরা আবারো পছন্দের নেতা নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। যা আগের তিনটি নির্বাচনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি।

তরুণদের বিক্ষোভ: নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে সেপ্টেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ৭৬ জন নিহত হন। প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেন, ‘জেন-জি’ আন্দোলনকারীদের পছন্দে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু পরিবর্তন না আসায় হতাশ আন্দোলনকারীরা আবার রাজপথে নেমেছেন। তাদের আশঙ্কা, আসন্ন নির্বাচনে সেই পুরনো দুর্নীতিগ্রস্ত নেতারাই ক্ষমতায় ফিরবেন।
শ্রীলঙ্কায় ২০২২ সালে গণ-অভ্যুত্থানে গোটাবাইয়া রাজাপাকসের সরকার উৎখাতের পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে প্রেসিডেন্ট হন অনুঢ়া কুমারা দিশানায়েকে। তিনি দুর্নীতি দমন, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি দিলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, তার সরকার এখনো কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রয়োগ করছে, যা মূলত সংখ্যালঘু তামিল ও মুসলমানদের লক্ষ্য করে ব্যবহৃত হয়। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন, নজরদারি, ভয়ভীতি ও মানবাধিকারকর্মীদের দমন অব্যাহত রয়েছে।

ভারতে দুই মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার পরও বিজেপি ভোটের রাজনীতিতে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে আরও উস্কে দিচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারে নেতাদের ঘৃণামূলক বক্তব্যের পর সমর্থকরা মুসলমান হত্যা, খ্রিষ্টান বিদ্রূপ, শিখ ও দলিতদের নিপীড়নে জড়িয়ে পড়লেও সরকার তা নিয়ন্ত্রণে অনাগ্রহী। বিক্ষোভ দমনে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপপ্রয়োগ ও আদালতের আদেশ অমান্য করে সম্পত্তি ভাঙচুরও ঘটছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঘৃণা ছড়ানো, পক্ষপাতদুষ্ট বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার স্থগিত রাখলে সহিংসতা আরও বাড়বে। শেষ পর্যন্ত জনরোষ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে কোনো শাসককে প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। নেতাদের উচিত বিভাজন নয়, বরং সাম্য প্রতিষ্ঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষা করা। মানুষের জীবনে বাস্তব উন্নতিই বিভাজন নয়।

mzamin