ভারতনীতি: সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন খালেদা জিয়া

এনডিটিভির রিপোর্টঃ ভারত নীতি নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং  শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। হাসিনা ভারতকে বন্ধুসুলভ হিসেবে দেখেন। খালেদা জিয়া তার প্রাথমিক বছরগুলোতে মোটামুটি সতর্ক। কখনো কখনো বিরোধী অবস্থান বজায় রাখেন। সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ভারতের সঙ্গে স্থলপথ সংযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি তার বিরোধিতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা হিসেবে ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দুইবার এই বিরোধিতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ভারতের জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশী ভূখণ্ড ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। তিনি ভারতের ট্রাকগুলোর বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহারকে ‘দাসত্বের’ সমতুল্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চুক্তির নবায়নের বিরোধিতা করেন। অনেকেই এই চুক্তিকে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তবে তিনি বলেন, তার দেশকে এই চুক্তি করতে ‘বাধ্য করা হয়েছে’। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ৮০ বছর বয়সে হৃদরোগ ও ফুসফুস সংক্রান্ত সংক্রমণ, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ছিলেন। তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় দেশের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের জন্য। গত তিন দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, এই দুই নারী প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।

এনডিটিভি আরও লিখেছে, বিএনপিকে ‘বাংলাদেশের স্বার্থের রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খালেদা তার নীতিগুলোকে ‘ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা’ হিসেবে সাজিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ঢাকায় এক সভায়, যখন হাসিনা প্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা বিরোধী দলনেতা ছিলেন, তখন তিনি ভারতের জন্য শুল্কমুক্ত সংযোগ প্রদানের কারণে হাসিনাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে ভারতের রাজ্য বানানোর চেষ্টা প্রতিরোধ করব।’ তবে খালেদার লক্ষ্য কেবল সংযোগের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা ছিল না, বরং তার দেশের জন্য বাস্তব লাভ নিশ্চিত করা ছিল। ২০১৪ সালে ঢাকার একটি পত্রিকা তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে যে, সংযোগ অনুমতি অবশ্যই তিস্তা জল চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন। ১৯৭৫ থেকে কার্যকর এই চুক্তি। গঙ্গা থেকে হুগলির দিকে পানি প্রবাহের জন্য ব্যবহৃত হয় এই চুক্তি। সমালোচনায় তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশকে গঙ্গার পানি থেকে বঞ্চিত করছে। ২০০৭ সালে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তারা বাঁধ খুলে দিয়ে দেশের বন্যা পরিস্থিতি খারাপ করেছে। সংযোগ ও অবকাঠামোর বাইরে প্রতিকূল অবস্থান ছিল তার কৌশলগত নীতির অংশ। ২০০২ সালে তিনি চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করেন এবং ভারতের প্রতি উদাসীনতা দেখান। চীনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ঢাকার প্রধান সরবরাহকারী হয় ট্যাঙ্ক, ফ্রিগেট এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সরাসরি কৌশলগত। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি এবং দিল্লি কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করে, বিএনপি সরকারের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি সংগঠন আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ আনে ভারত। খালেদার ভারতবিরোধী অবস্থান ছিল বাস্তবমুখী। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯২ সালের তিন বিঘা করিডোর লিজের কথা বলা যায়।  এর ফলে ঢাকাকে দহগ্রাম-আঙরপোতা এলাকায় স্থায়ী অ্যাক্সেস দেয়, যা ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে ২০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি এবং নতুন মাদক তস্কর বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরও তার বাস্তবমুখী নীতি প্রমাণ করে। ২০১২ সালের দিল্লি সফরের পর ভারত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় সফরে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
যাইহোক, চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০১৬-২০২৪ সালের মধ্যে তার ভারতবিরোধী ভাষণ, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা, খালেদার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বিএনপি সমান ও সম্মানজনক সম্পর্কের জন্য ইঙ্গিত দেয়। যখন তার স্বাস্থ্য অবনতি হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী টুইটে লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর জেনে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তার মৃত্যুর পর তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি ২০১৫ সালে ঢাকায় তার সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাৎ স্মরণ করি।’

mzamin

No comments

Powered by Blogger.